আখতার মাহমুদের গল্প ।। জনৈক পাগলের মৃত্যু

১৫৭ বার পঠিত

বিকেলটা দারুণ সুন্দর। একদম লালচে কাঁচা হলুদ রঙা বিকেল। তবে রোদের আঁচটা বেশ কড়া। জাভেদ আগ্রাবাদ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছিল বাস বা টেম্পু যা হোক একটা কিছুর জন্যে। উদ্দেশ্য বন্ধুর বাসা। গিয়ে খানিক গল্প-সল্প করবে আর এক ফাঁকে বছর খানেক আগে দেয়া ধারটা ফেরত চাইবে। যদিও ধার ফেরত চাইলে বন্ধুটির মুখ দুঃখি দুঃখি হয়ে যায়। আর নানান ঝামেলার কথা শোনায়। তখন বিব্রত হেসে সে বলে ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, পরে কখনো…..’

টাকা ফেরত চাওয়া মুখ্য নয়, আজ যাচ্ছে স্রেফ আড্ডা দিতে। অবরোধের এমন একটা মিষ্টি বিকেল হেলায় হারানো ঠিক হবে না। পুরো সপ্তাহ জুড়ে অবরোধ চলছে। প্রথম দু-একদিন গাড়ি চলাচল কম থাকলেও তৃতীয় দিনে এসে গাড়ি চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু অবরোধকারীরা বিষয়টা পছন্দ করল না। তারা আজ দুপুরের দিকেই রাগ করে ঠুস ঠাস দু-চারটা ককটেল ফুটিয়েছে আর গোটা দশেক গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। যার ফলে ভোজবাজির মত গাড়িগুলো রাস্তা থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। কেবল থেকে থেকে দু-একটা টেম্পু আসছে-যাচ্ছে। একটা একটা টেম্পু এসে থামছে আর মানুষগুলো হুড়মুড়িয়ে লাফিয়ে উঠে পড়ছে সেটাতে। ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ শুনেও কেয়ার করছে না। সবারই কোথাও না কোথাও যাবার তাড়া। একটা পাগল দেখা গেল অযথা ঘুরঘুর করছে আর টেম্পু থামলেই তাতে মানুষের হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়া দেখলেই লাফিয়ে লাফিয়ে হাততালি দিচ্ছে। কেউ কেউ অবশ্যই রিক্সা নিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে। যদিও হরতাল-অবরোধে রিকশাওয়ালারা এক একজন হয়ে ওঠে রাজপুত্র। দশ-বিশ টাকা দরদাম করলে চরম অবজ্ঞার চোখে তাকায়।

জাভেদের আজ তাড়া নেই। আস্তে ধীরে গেলেই তার চলে। আগ্রাবাদ মোড়ে অসংখ্য মানুষের ভীড়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎই সে খেয়াল করল গাড়ির অপেক্ষায় মানুষগুলোর বেশিরভাগই একদিকে তাকিয়ে আছে। সবারই চোখের তারায় ক্ষুধা। মুখের অবস্থা দেখে মনে হতে পারে যে কোন মুহূর্তে ঠোঁটের কোণ বেয়ে লালা ঝরবে। মানুষগুলোর দৃষ্টি অনুসরণ করে কোন ফাস্টফুডের দোকান বা রেস্তোরা চোখে পড়ল না ওর। তবে আখতারুজ্জামান সেন্টারের সামনে একা দাঁড়ানো মেয়েটিকে দেখে বুঝল কেন ওভাবে তাকিয়ে আছে সবাই। মেয়েটা খুব সম্ভবত কারো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। অস্থির হয়ে ঘড়ি দেখছে আর বার বার পা ঠুকছে রাস্তায়।

এই সময় কোত্থেকে যেন পোঁ-ও-ও-ও-ও…. পোঁ-ও-ও-ও-ও সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি এসে পৌঁছল ঘটনাস্থলে। হুড়মুড়িয়ে বাকিরাও সরে এল পাগলের অবশিষ্টাংশের কাছ থেকে। তাদের মধ্যে একজন সরে এসে জাভেদের পাশেই দাঁড়াল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে লোকটা কেন যেন সরাসরি ওর চোখেই তাকাল। জাভেদ চমকে উঠল তার দৃষ্টি দেখে। লোকটার চোখের তারায় সুস্পষ্ট হতাশা, গ্লানি আর মিলিয়ে যেতে থাকা তীব্র কামনার শেষ ছাপ। লোকটাও একই রকম চমকে দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে অস্বস্তিতে সরে গেল সে সেখান থেকেও। আয়নার সামনে না দাঁড়িয়েও বুঝতে পারছে তার নিজের চোখেও একই রকম হতাশা, গ্লানি আর মিলিয়ে যেতে থাকা তীব্র কামনার জ্বলজ্বলে ক্ষুধা।

রগরগে হিন্দি সিনেমার পোস্টার থেকে যেন লাফিয়ে বেরিয়ে এসেছে মেয়েটি। কেউ কেউ বলবে নারী স্বাধীনতার ভয়াবহ প্রকাশ, কেউ হয়তো বলবে বেলেল্লাপনার চুড়ান্ত, নিরাসক্ত কেউ কেউ বলতে পারে আধুনিক যুগে অমনটা হতেই পারে । জাভেদ কি বলবে জানে না। তবে এটুকু টের পাচ্ছে আর সবারই মত সে-ও মেয়েটির ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছে না। তার চোখের তারায় দুর্দান্ত লোভ খেলছে। মুখে লালা জমতে শুরু করছে। শিরশিরে লোভ তরল আগুনের মত সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।

মেয়েটির পরণে লালচে লেগিংস্, আঁটসাট টি-শার্ট। ঠোঁটগুলো রক্তলাল। চোখে থকথকে কাজল। দুধে-আলতা রঙের ত্বক সূর্যের আলোতে অদ্ভুত জেল্লা ছড়াচ্ছে। ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলছে ভারি নিতম্বের ওপর। ব্যাগের ফিতা কাঁধ-পিঠ ঘুরে গলার কাছটা হয়ে বুকের ঠিক মাঝখান দিয়ে নেমে এসেছে। তার শরীরের প্রতিটা রেখা সুস্পষ্ট। সুগঠিত বুক, কোমর, উরুর কোনটাই তার পোশাক ঢেকে রাখতে পারেনি।

জানেনা কতক্ষণ খাই খাই চোখে তাকিয়ে ছিল মেয়েটির দিকে। হঠাৎ খানিক আগে দেখা পাগলটা মেয়েটির দিকে দৌঁড়ে যাচ্ছে দেখে চমক ভাঙল তার। বিস্ময়ের সাথে দেখল পাগলটা ছুটে গিয়ে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরল মেয়েটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই। তাঁরস্বরে আ…আ… চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটি। পাগলটা সে চিৎকারে পাত্তা না দিয়ে মা! মা! বলে চিৎকার করতে লাগল। ভয়ানক রাগ হল ওর। ছুটতে শুরু করল মেয়েটিকে বাঁচাতে। আড়চোখে তাকিয়ে টের পেল সে একা নয়। আশে-পাশের সবাই ছুটছে। একটা টেম্পু এদিকেই আসছিল। ড্রাইভার একসাথে এতগুলো মানুষ ছুটছে দেখে ভড়কে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে পালাতে গিয়ে গাড়িটা উল্টে ফেলল।

ওরা সকলে মেয়েটির কাছে গিয়ে পাগলটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে উন্মাদের মত হাত চালাল। পাগলটাকে মারতে হবে, এটা ছাড়া মাথায় আর কোন চিন্তাই কাজ করছিল না। মার! মার! মার! কেউ একজন বলে উঠল- ‘কত সাহস দেখো, একটা মেয়ের গায়ে হাত দেয়! কোন পাগল এমন করবে? এটা হুশের পাগল। মার শালারে!’

মার! মার! মার! পাগলটা লুটিয়ে পড়লেও রেহাই দিল না ওরা। একের পর এক লাথি মারল। যেন সে বিনে পয়সায় পাওয়া একটা ফুটবল। এতটা রাগ আর কখনো হয়নি জাভেদের। রাগটা ক্রমেই যেন বাড়ছিল। কে একজন যেন বলে উঠল, ‘মইরা গ্যাছে মনে অয়!’

আচমকা রাগ জল হয়ে গেল। ভাল করে তাকিয়ে দেখল পাগলটাকে আর মানুষ বলে চেনা যায় না। বরং মনে হচ্ছে রক্তের পুকুরে পড়ে আছে এক তাল মাংসপিন্ড। দু-একজন এখনো মেরে চলেছে। ঘটনা বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে বুঝতে পেরে সবার অলক্ষ্যে একটু সরে এল সে। উদ্দেশ্য, নিজের গা বাঁচানো। সরে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে মেয়েটিকে খুঁজল। কোথাও নেই সে। কোনফাঁকে যেন সরে পড়েছে। এই সময় কোত্থেকে যেন পোঁ-ও-ও-ও-ও…. পোঁ-ও-ও-ও-ও সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি এসে পৌঁছল ঘটনাস্থলে। হুড়মুড়িয়ে বাকিরাও সরে এল পাগলের অবশিষ্টাংশের কাছ থেকে। তাদের মধ্যে একজন সরে এসে জাভেদের পাশেই দাঁড়াল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে লোকটা কেন যেন সরাসরি ওর চোখেই তাকাল। জাভেদ চমকে উঠল তার দৃষ্টি দেখে। লোকটার চোখের তারায় সুস্পষ্ট হতাশা, গ্লানি আর মিলিয়ে যেতে থাকা তীব্র কামনার শেষ ছাপ। লোকটাও একই রকম চমকে দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে অস্বস্তিতে সরে গেল সে সেখান থেকেও। আয়নার সামনে না দাঁড়িয়েও বুঝতে পারছে তার নিজের চোখেও একই রকম হতাশা, গ্লানি আর মিলিয়ে যেতে থাকা তীব্র কামনার জ্বলজ্বলে ক্ষুধা। যে ক্ষুধার শিকার খানিক আগেই মাংসপিন্ডে পরিণত হওয়া পাগলটি। যে কিনা মা ডেকে মেয়েটিকে ঢেকে দিতে চেয়েছিল শত চোখের কামনার আড়ালে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com