রুদ্র আমিন-এর একগুচ্ছ কবিতা (নীরদ)

নীরদ (সময়ে ডেকো)


নীরদ, 
তুমি সময়ে ডেকো, 
নিস্তব্ধরাতের প্রশান্ত ঘুম থেকে ডেকে তোলো
কতটা হিংস্র, কতটা রক্তচোষা খাদক
তোমায় একটু একটু করে চেটেপুটে খেয়ে প্রমাণ করে দিব
কতটা তৃষ্ণার্ত ঘামের ঘ্রাণে নীরদের বুকে লুটিয়ে পড়ে দানব।

জানি সইতে পারবে না, তবুও 
অবুঝ যন্ত্রণা এবুকে ও বুকে
ভয় দেখিও না, নীরদ;

বাঘিনীর থাবায় ভয় করি না, আঁচড়ে দিবে, দাও;
আঁচড়ে যে সুখ সে তুমি বুঝবে না, 
বুঝে চুয়ে পড়া রক্তিম জলস্রোতের উষ্ণতা, নীরদ গর্জন;

চাই, 
আরও চাই তোমার আক্রমন, কামড়ে কামড়ে করে দাও ছিন্নভিন্ন, 
সুখ চাই, যতটা সুখের খরায় নীরদ তুমি হিংস্র বাঘিনী
ঠিক ততটাই যন্ত্রণায় কাতর এদৃষ্টি
প্রমাণ দিবো, যেন বলতে না পারো, সুখ নেই তোমার জলপ্রপাতে
যতগর্জে তত বর্ষে না জেনে রেখো………

নীরদ,
ঘুম থেকে উঠে চিনতে পারোনি নিজেকে, 
দর্পন দেখে শুধুই হতবাক হয়ে দেখেছো চলেছো নিজেকে
হিংস্রতা নেই, পরিবর্তনের খেলায় মেতেছে দেহমন,
নীরদ,
শীতলতায় নিথর হলে অবশেষে…….

 

নীরদ (জেনে রেখো)


নীরদ, 
জেনে রেখো,
আরেকবার শুনে নাও সত্য কথাটি
সত্য বলে কিছু নেই যা তুমি বলো
সব তোমার নিজের গড়া নাট্যমঞ্চ,
তুমি যা বললে, ভুল বললে,
আসলে মিথ্যে বলে কিছুই নেই
স্বার্থের যত রঙ্গলীলা।

নীরদ, 
তুমি তো বাস্তবতাকে স্বপ্ন বলে ভাবো
তবে কেন ডাকলে সেদিন পেখম মেলে
বললে এসো ডানার উপর ভর করে
অতঃপর, আবার তুমি নিজেই
কাটাকাটির রঙীন ঘুড়ি উড়ালে 
নাটাই ধরে টেনেও নিলে, তবে
কেন জড়ালে ছলনার মায়াতে?

নীরদ, 
ডেকে যদি কেউ দূরে ঠেলে দেয়
কতটা যন্ত্রণার ঝড় বয়ে যায় 
তুমি কি জানো, তুমি কি বুঝো?
আষাঢ়ের ভরা গাঙ
বজ্রপাতের ছোবলে শুকিয়ে যাওয়া প্রাণ
পুঁড়ে পুঁড়ে পোঁড়ানো হৃদয় অগ্নির কাষ্ঠ হয়;
নীরদ, তবে কেন
প্রলাপের ঝড় তুলে সেদিন মরুরবুকে দিলে জল;
আসলে ভালবাসা বলে কিছুই নেই
প্রমাণ করলে আরেকটিবার পৃথিবীর বুকে।

নীরদ (সময় হয়েছে)


নীরদ,
সময় এসেছে
না বলা কথা ভেঙে ফেলার
সময় হয়েছে 
অন্যেকে ভুলে নিজেকে চেনার;
সময়ের স্রোতে পৃথিবীর আলোয়
নিয়নের রঙীন জারে স্বপ্ন সাজাবার।

নীরদ
তুমি কি বলতে পারো ?
কে তোমার আপন, 
ইহকাল-পরকাল ?

নীরদ,
সময় হয়েছে
না বলা কথাগুলো বলে দেবার
আপনাকে মেলে ধরার….

নীরদ,
সময় হয়েছে
প্রাপ্তির খেতাব নেবার-দেবার
জানি কেউ বলবে স্বার্থপর
কেউ-বা বলবে সুশীল,ধূর্তবর
আসলে পৃথিবীর বুকে কেউ কারো নয়
আলোকিত কর্মহীন
সবাই সবার সমান।

নীরদ (জানালার ওপাশে-০১)

যেখানে সুখের নামে অসুখ মৌচাকে ঢিল হয়ে হুল ফুটায় শহরের সমস্ত পাড়ায়
সেখানে কতবার যাওয়া যায় নিজের যন্ত্রণা কাঁধে নিয়ে ভালোবাসার দাবিতে
সেদিনের কেরোসিনের কাঁচের ঢাকনাওয়ালা হেরিকেন আজ অচল প্রায়, তেমনি
হারিয়ে ফেলা প্রেয়সীর ডাকাডাকি আজ আকাঙ্খার বজ্রপাত সৃষ্টি করে না হৃদয়ে;

যদি খুব প্রয়োজন হয় তোমার তবে এসো, ক্ষণিকের সুখ না হয় অল্পস্বল্প সুখ
ভাগবাটয়ারা করে নিব দু’জন, দু’জনাতে; একটু একটু করে নয় পেয়ালা ভরে দেবো
যতটুকু জড়িয়ে সৌরশক্তির অবস্থান অটুট রাখতে পারো তোমার যন্ত্রণার অসুখে।

মৌচাকে ঢিল দেবার কি প্রয়োজন বলো ? স্বেচ্ছায় জলের বদল হলে নাকি ধর্ষণ হয় না
কেউ কেউ বলে দেহের তরঙ্গ সৃষ্টিতে দু-একটু ঘোলাজলে বৌঠা ভেজাতেই হয়
তুমি চাইলেই সব হয়, শুধু আমি কেনো, আমরা, তেঁতুল, বিলম্বো তোমার
চোখের ইশারার অপেক্ষায় বসে থাকে সকাল-দুপুর, সন্ধ্যা-রাত,
কিন্তু আমার চাওয়ার কোনো মূল্য নেই, যতটা তুমি চাইলেই পাওয়া যায়।

নীরদ,
এতোটাদিন পর কেন ডাকছো তৃষ্ণার্ত পথিক বেশে !
চূড়ান্ত সান্ত্বনা নিয়ে ভুলে যেতে চেয়েছিলে পুরানো আকাশ
মনে পড়ে কি তোমার ?
থাক, অস্পষ্ট কথা আর বলতে চাই না
এখন নিজেই নিজের নগ্নতা পরখ করি জানালার ওপাশে।

নীরদ (জানালার ওপাশে-০২)

তোমাকে কোনো কিছুর জন্য দোষ দেবার নেই
তোমার অবস্থা এমন ছিল না জানি, সব মেনে নিয়েছিলাম সেদিন
যখন বুঝেতে পেরেছি সময় হয়েছে, কিছু বলতে গেলাম, থামিয়ে দিলে
কষ্ট হলো, খুব কষ্ট, কষ্ট তো হতোই সেকথায় দু’জনারই।

জানাতে পারলাম আমার টিকেট হয়ে গেছে, তবুও
মনের বিরুদ্ধে ভাবলাম, তোমাকে জানানো উচিত
আবারও থামিয়ে দিলে, অতঃপর; অবশেষে
মৃতদেহটাকে ছোট্ট একটা শব ঘরে সাজিয়ে নিলাম।

নীরদ,
দেখতে খুব ভাল লাগছে, ঘরটা খুব চুনকাম করা হয়েছে
মাথার উপর ছাঁদের রডগুলো আলগাতেই বেশ বন্ধনী মনে হলো
বুঝতে বুঝতে বাছতে বাছতে আজ এতোটুকুই পাওয়া
কেউ দেখে গেল, কেউ দাঁড়িয়ে ছিল, কেউ দূরেই রয়ে গেলো
আবার কেউ কেউ মনের ভেতর ভৎসনার সূরা পাঠ করে গেলো
তোমার, আমার মতোন কেউ কেউ দেখতে পেলো, নীল-কালো চোখ
গোলাপী ঠোঁট, বরফ জমানো হিমালয় পেলো কেউ নাকে…
নীরদ, আলো হারালে সবাই অন্ধ হয়ে চোখে দেখে।

সূর্য অস্তের দিকে যাচ্ছিল, ঘরটা একটা স্নিগ্ধ আলোয় ভরে গেলো
একটু একটু গুনগুন শব্দে হারিয়ে গেলো পুরোটা সময়
শেষ ইচ্ছেটি হয়তো এমনি ছিলো, তোমার আলোতে আলোকিত হবে ঘর
নীরদ, সেই এলে তবে, না-বলা কথাগুলো হারিয়ে ফেলে। 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
৮২ বার পঠিত

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com