সুমাইয়া সুলতানা রূপা-এর একগুচ্ছ কবিতা

৫১ বার পঠিত

কথা ছিলো কথা রাখবার-১

তুমিহীন আজ রাতে, এখানে,
ঠিক এই মুহূর্তে কোজাগরী পূর্ণিমা পুড়ছে বিষাদের অনলে!
তুমি নেই বলে,
আজকের পূর্ণিমা বয়ে বেড়াচ্ছে কলঙ্ক ; যেমনটি কলঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছে হৃদয় তোমাকে ভালোবাসার অপরাধে প্রতিনিয়ত।
তবুও দেখেনি কেউ, দেখছে না কেউ, বুঝেনি কেউ,  বুঝছে না কেউ তা আমি ছাড়া,
এমনকি তুমিও না!
চোখের দৃষ্টিতেও বোঝা কঠিন এমন ভঙুর হৃদয়ের বিষ্ফোরন,
আমিই জানি, কেবলই জানি আমি; আমার বুকের ভেতরে চলছে কতটা রক্তক্ষরণ।
কারণ আমাদের দু’জনের পথ তো ফুরিয়েছেই সেই সে কবে,
আজ দু’জনই দু’পথের পথিক আবার,
যেমনটি ছিলাম আমরা অনেক বছর আগে জম্মাবার!

           অথচ এমনটি হবার কথা ছিলো না,
না এ পূর্ণিমায়, না গত পূর্ণিমায়, না এরম কোন আগামী পূর্ণিমায়,
কথা ছিলো না এমন হবার, এমনটা হবার,  এরম হবার।
কথা ছিলো না, আমরা দু’জন দু’পথের পথিক হবার,
কথা ছিলো না আমাদের একই চলার পথ শুরুর আগেই ফুরাবার ,
কথা ছিলো না,  আমি তুমিহীন একাকী থাকবার,
কথা ছিলো না।

            আজকের কিংবা আগামীর প্রতিটি পূর্ণিমায় হবার কথা ছিলো আমাদের ,
নরম চাঁদোয়ায় মাখানো মখমলে রূপোলী চাদরে গভীর আদরে ভিজবার,    ,
কথা ছিলো, এমনই জোসনায় কুসুম-কোমল হাতে জড়িয়ে দু’জনই দু’জনের পাশে থাকবার।
কথা ছিলো দু’জনের কপালে দু’জনই আলতো করে  দু’টো  চুমু এঁকে দেবার,
চুমু এঁকে দেবার কথা ছিলো, আমাদের উষ্ণ ঠোঁটে, চোখে, গালে, স্পর্শ-কোমল  গভীরতায় ;
বুকের গভীরে অস্ফুট ভালোবাসায়।
কথা ছিলো।

           কথা ছিলো, এরম প্রতিটি জোসনায় ঝুল বারান্দায় মুখোমুখি বসবার,
প্রতিটি পূর্ণিমায় আমার-তোমার শুভ দৃষ্টি হবার।
 কথা ছিলো, জানলার ফাঁক গলে আসা যুবতী জোসনার আলোয় প্লাবিত বিছানায়;
দু’জনের বুকে দু’জনই দু’জনকে জড়িয়ে থাকবার,
কথা ছিলো।
কথা ছিলো ভালোবাসবার,
পাশে থাকবার,
পাশে রাখবার,
বুকে রাখবার,
বুকের গভীরে সাঁতরে বেড়াবার।

কথা ছিলো, এরম ঠিক এরম কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রিরে প্লাবিত জোসনায় তোমার বুকে আমার মাথা রাখবার,
স্পর্শ নেবার ; নিকট থেকে আরো নিকটে থেকে গাঢ় নিঃশ্বাসের প্রতিটি প্রতিশব্দ অনুভব করবার।
কথা ছিলো, ঠিক এরম ভেসে যাওয়া জোসনায় তোমার বুকে আমি আর আমার বুকে আমাদের ছোট্ট একটি ফুটফুটে শিশু পূর্ণিমার জড়িয়ে থাকবার।
কথা ছিলো ;
তুমি পাশে থাকলে এরমটাই হবার কথা ছিলো,
কথা ছিলো।
        কথা ছিলো অন্তিম নিঃশ্বাস অবধি আমার-তোমার পাশে থাকবার,
আর এরম পূর্ণিমায়, ঠিক এরম একটি কোজাগরী পূর্ণিমায় ভেসে যাওয়া জোসনায় ;
আমাদের বুক জুড়ে থাকবার কথা ছিলো ছোট্ট আরো একটি ফুটফুটে শিশু পূর্ণিমার,
যে প্রতিটি মুহূর্তে ঘরের প্রতিটি কোণ জুড়ে ছড়াবে রোশনাই!
কথা ছিলো,  কথা ছিলো,  কথা ছিলো কথা রাখবার।
অথচ কথা ছিলো না, কোন মতেই কথা ছিলো না, কথা ছিলো না আজ এভাবে, এখানে, এ মুহূর্তে আমি তুমিহীন দু’জনাতে একা বসবাস,
নীল অন্ধকার!

কথা ছিলো কথা রাখবার -২

হঠাৎ-ই এসে তুমি বলেছিলে ভালোবাসি,
ধরেছিলে হাতটা আমার ।
এলোমেলো, অগোছালো, ছন্নছাড়া, ভঙুর এই আমাকে গড়লে নতুন করে আরো একবার,
ছোঁয়েছিলে হৃদয়; হৃদয় দিয়েই যত গভীরে ছোঁয়া যায় বুকের ভেতরটার।
স্বপ্নের বেড়াজালে বন্দী করে দেখিয়েছিলে একটি কেবলই একটি ছোট্ট সংসার ; আমার-তোমার।
কেবলই ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি বলেছিলে শত-সহস্রবার;
দিয়েছিলে কথা কথা রাখবার।

স্পর্শ-বার্তায় তুলেছিলে হৃদয়ে কাঁপন,
হৃদয়ের নিকটই ছিলাম আমরা দু’জন; যতই হোক না কেন দূর আলাপন,
তারপর আচমকা চমকে গিয়ে থমকে ছিলাম নিস্তব্ধ বহুক্ষণ!
বললে যখন ভালো থেকো; এখন তবে দাও বিদায়, চিরতরে যেতে হবে, আসি –
ভুলে যাও যা ছিলো সবই; ক্ষমা করে দিও আমায় যদি বলে থাকি ভালোবাসি!
আঙুলে জড়ানো হাতটা ছেড়ে দিয়ে নিমিষেই গেলে চলে এই আমায় ফেলে মৃত্যুর দুয়ারে আবার,
ভেঙে দিলে নিজ হাতেই গড়া মিথ্যের দেয়ালে ঘেরা তোমার পাতানো মিথ্যা সংসার।
অথচ কথা ছিলো কথা রাখবার,
পাশে থাকবার,
পাশে রাখবার,
আঙুলে আঙুল জড়িয়ে রাখবার,
বুকে জড়াবার,
কথা ছিলো, কথা ছিলো, কথা ছিলো ভালোবাসবার।

বলেছিলে তুমিই একদিন প্রিয়_, খুব খুব খুব ভালোবাসি,
বাঁচবো কেবলই তোমাকেই সাথী করে প্রতিটি জম্মেই যদি সুযোগ থেকে থাকে বারবার জম্মাবার,
প্রতি জম্মেই চাইবো তোমাকেই হে প্রিয়তার চেয়েও প্রিয় ভালোবাসা আমার।
কথা ছিলো কথা রাখবার,
জড়িয়ে থাকবার,
কথা ছিলো আরো আরো আরো বেশি ভালোবাসবার।

অথচ এই জম্মেই বেমালুম ভুলে গেলে; যে কথা দিয়েছিলে বুকের গভীরে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস নেবার,
বেঁচে থাকবার।
কথা ছিলো জড়িয়ে থাকবার,
জড়িয়ে রাখবার,
বুকের গভীরে সাঁতরে বেড়াবার।
কথা ছিলো, কথা ছিলো, কথা ছিলো কথা রাখবার।
অথচ কথা ছিলো না, কোন মতেই কথা ছিলো না, কথা ছিলো না আজ এভাবে, এখানে, এ মুহূর্তে আমি- তুমিহীন দু’জনাতে একা বসবাস,
নীল অন্ধকার!

প্রেমিক কিংবা পুরুষ

তোর মিথ্যে করে বলা ভালোবাসার কাছে,
আমার নীরব কিছু অভিমান আছে।
কারণ তুই আজও প্রেমিক হতে পারিসনি,
হয়েছিস পুরুষ,
পর পুরুষ।
তোর ভালোবাসায় পবিত্রতা নেই,
আছে সাপের বিষাক্ত ছোবলের মতোন হৃদয়বিদীর্ণ করা বিষাক্ততা।
আছে প্রেম নামক নীরব ঘাতকের মতন চুম্বনের রক্তাক্ততা।
তোর চাহনীতে আছে কামের অব্যক্ত বাসনা,
তোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত হচ্ছে সর্বোচ্চ অশ্লীলতার কামনা।
তোর ওই লোভাতুর দৃষ্টিতে অপবিত্রতা,
তোর ঠোঁটে অপবিত্রতা,
তোর স্পর্শে অপবিত্রতা,
অপবিত্রতা তোর প্রত্যেক পদক্ষেপে,
অপবিত্রতা তোর রুহে।
তুই আজো ভালোবাসতে পারিসনি হৃদয়,
তোর কাছে কেবল নরম মাংসে বাঁধানো বাহ্যিক শরীর-ই প্রিয়।
তোর দেয়া মিথ্যে মলিন ভালোবাসার কাছে,
আমার অব্যক্ত কিছু অভিযোগ আছে।
কারণ তুই প্রেমিক হতে পারিসনি আজো,
হয়েছিস পুরুষ ;
কেবলই পুরুষ,
পর পুরুষ!

একদিন তুমি সত্যিই সত্য ছিলে

একদিন তুমি সত্যিই সত্য ছিলে,
ছিলে বাস্তবতায় ;
অথচ আজ এই মুহূর্তে তুমি হয়ে আছো কেবলই একটি গল্পের অংশ,
কিংবা রাত্রি জাগা দু’চার টা ব্যর্থ কবিতার রেখায় ;
অথবা হৃদয়ের আরশিতে আটকে থাকা স্থিরচিত্রের কোন রিলে।
আনমনে-ভুলবশত ব্যর্থ এপিটাফে তুমি ভেসে উঠো কখনো-সখনো,
যা ধাঁরালো ছুরির মতোন এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে ডেকে আনে হৃদয়ের ধ্বংস ;
যদিও আজ তুমি কেবলই কোন এক গল্পের অংশ,
অথবা রয়েছে কোন এক কাব্যের অন্তমিলে।
অথচ একদিন তুমি সত্যিই সত্য ছিলে!
আশ্চর্য!

এখনো ঘুমঘোরে আছো তুমি

অথচ এখনো ঘুমঘোরে আছো তুমি,
নৈশব্দের দেয়াল ভেঙে আজো ভোর ফেরেনি তোমার উঠোনে।
একজন ভিখারীনি,  দুটো ক্ষুধার্ত উদোম মানব শিশু আর একটি বাচ্চা কুকুর ;
একমুঠো অন্নের সন্ধানে,
তোমার দরজায়……!
করাঘাত এক, দুই,  তিন, চার …… এক’শো, দু’শো…..
চলছে তো চলছে …….
অথচ দরজায় ওপাশে এখনো তোমার ঘুম ভাঙেনি।
গতরাতে তুমি দেরিতে ফিরেছো,
               শরাব,
দুটো গ্লাস ;
              রমনী,
হাসির ঝংকার ;
            উন্মাদনা,
পানশালা …….. ;
গতরাতে তুমি দেরিতে ঘুমিয়েছো।
এখনো ঘুমঘোরে আছো তুমি,
অঘোরে ঘুমোচ্ছো।
আর এভাবেই প্রতিরাতে দেরিতে ফেরো তুমি . ….
দেরিতে ঘুমাও তুমি।
একজন, ভিখারীনি, দুটো উদোম শিশু, একটি বাচ্চা কুকুর,
অপেক্ষায় ….
তোমার দরজায়,
একমুঠো অন্নের সন্ধানে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com