আসমা অধরা-এর এগুচ্ছ কবিতা

৪০ বার পঠিত

লার্ভা

বজ্রের মতো ঝাপিয়ে পড়ে কীট, খেয়ে নিচ্ছে ক্রমাগত ফেমিনিন চোখ।
বিদ্যুৎপৃষ্টের ন্যায় স্তব্ধ দৃষ্টি। সে সংখ্যাতীত শূন্যতা, যেন এক উভলিঙ্গ ঘোড়া
অহরহ টমটম করে চলছে আততায়ীর মতো। প্রজ্ঞার কাঁধ ঝরে পড়ে অশ্রুর
মতো, ঝুকে থাকে মস্তক।
এই অন্ধকূপে একটি- মাত্র একটি জানালায় ঢাকা পড়ে থাকে অসংখ্য সিল্কের
কংকাল। প্রাচীন সূর্যও চলে গেছে স্বায়ত্বশাষিত আঁধারে, আর চলার চেষ্টায়
বিভোর যুবতী এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে খোঁড়া পায়ের নুপুরের ভাঁজে।
প্রিয়জন ছেড়ে চলে যায়, রক্তের ভেতরে ঘাই মারে বিষধর শিং। অথচ কায়া
নিঃসৃত ছায়াও লোপাট দেখেনাই কুমারী, জাতিকা মীন। আহ বল্লম চৌচির
করো বুকখানি।
এখানে নন্দনকাল নাই, শৌণ্ডিক অন্ধকার ছাওয়া তর্জনী জানে কতটুকু পরিহাস
করে যায় জুতোর ডান পাটি, যদিও সে পাশেই আজীবন এক ক্রুশ আঁকা
ছিলো।

নখ ও নাগরিক কথাবলী

নাগরিক জীবন থেকে ধীরে ধীরে পেছনে চলে যাই। একবিংশের বালিঘড়ি মুছে
দেয় লু এবং যাবতীয় মরুঝড়, নির্জীব ফণা আর বিষদাঁত- দোআঁশলা মাটিতে
পড়ে থাকে খোলসের দাগ, মেটেসাপ অবয়বে।

নাবিক জন্মের আগের শতাব্দী চেনে নাই বাতিঘর, টর্চসেল আর কম্পাস। পা
ডুবে যাওয়া নাইলন কার্পেটে সিল্কের বেড়াল সামুদ্রিক পিথাগোরাসের মতো
নেড়ে যায় সার্টিনের পিছল উলেন লেজ। সেই সব ঘরের পাটাতনে কান
পাতলে আয়ুষ্কালের সমান দীর্ঘশ্বাস শোনা যেত।

বাঁশের মই বেয়ে কিছুদুর গেলেই চাঁদ, সাইমুমের ন্যায় ঘিরে থাকে মেঘ।
অপ্সরা চাদরে লেগে থাকে কিছু ব্যক্তিগত বাঁকাহাসি আর চিকচিকে
সিকোয়েন্সের কারুকাজ। স্বর্ণলতা বলে বলে কাঁদে মহীরূহ অসম পরিণয়ের
কারসাজিতে।

উড়ুক্কু মাছ আর লাউডগার মতো সাবলীল সবুজ সাপ ঠুকরে খায় কপালের
মাঝখান অবিরত, বরাবরের মতো আছড়ে পড়ে জোছনা খোলা জানালা আর
বিছানার কিয়দংশে।

কবি, ভাঙা গলায় গান গাও। গাও ইস্পাত আর মাটির কথা অথবা যে বুমেরাং
ফিরে আসার পর তার গায়ে লেগেছিল শ্বেত রক্ত! মাস্তল ছিঁড়ে গেলেও
নাবিকের ভাঁজ করা টিনের ট্রাংকের গা বেয়ে হেঁটে যায় ধুলো আর নাদ, স্মৃতি
কেবল উজ্জল হয় বসন্তের দিনে।

সভ্যতার আগের রাত্রির রঁদেভূরা জানে এ শহরের গলিতে গলিতে লোরকা ঘুরে
বেড়াত, আর ষোড়শী তার নখের নীচে পুষে রাখত কেউটের ছানাপোনা।
যাদুকর কেবল টুপির ভেতরে বসরাই গোলাপ লুকোয়, তারও আগে কিছু ব্যাক্ত
ছিল যা ব্যপৃত হয় নি জ্ঞানের অভাবে।

দ্বাদশ এবং অতঃপর

দ্বাদশ রাতে, পূর্ণ ভরাট বা ক্ষয়ের একটা গল্প ছিল।

যে প্রস্তর ক্ষয় হয়েছে কাঠঠোকরা চঞ্চু আরো ক্ষুরধার
করার কাজে, সে অধ্যায়ে কাস্তে প্রধান হতে পারেনা।

তারপরও দ্বাদশ চাঁদ যতখানি ভাসে বা ভাসায়

প্রাচীন ত্রিফলার সাথে যতোটুকু নিদ্রাষৌধী ভারী
করে রাখে পল্লব, তার সাথে বেসামাল বিসদৃশ ইনসমনিয়াক।

দ্বাদশ রাতে জন্ম নেয়া কিছু অশুভ অক্ষাংশ জুড়ে পোড়ায় মীথ।

নরুনের ডগায় তুলে নেয়া অপবিত্র জল ফোঁটা ফোঁটা
ঝরে পড়ে ধর্মগ্রন্থের পৃষ্ঠা জুড়ে, ধাবমান ঈস্রাফীল এবং বাঁশী।

দ্বাদশের গল্পে যোগ হতে পারে আরও কিছু অতিপ্রাকৃত বর্ণনা…

নহলি সেতার

এ নগরের হীমঝরা বৃক্ষেরা জানে, প্রণয়াতুর অগনিত রাত অপেক্ষায় থাকার
পর- কোমল অথচ কঠিন ভাবে ‘নহলি’-বলে ডাকতেই, গলে গেল এক নহলা
তামাটে সেতার।

উজাড় যমুনার মতো,
বিসমিল্লাহ খাঁ’র সানাইয়ের মতো,
প্রাচীন সমূদ্রে ঝড়ের মতো- বেজেই যাচ্ছে তারও অধিক কতকিছু।

পাইনের মৃদু সুগন্ধ হতে, শ্বাসের ভেতর বয়ে গেলে দুরন্ত দেবধেনু বাতাস,
কদাচিত্‍ দৈবিক মুসকানেরা কিছু হীরের দ্যুতি বয়ে আনে!

নন্দিত নাদ শেখে স্পর্শের কিছু আকুলতা, ভরাট কন্ঠ জানে ডেকে নেয়া স্বর,
যতখানি শীতল উত্তরীয় বেয়ে নেমে আসে হীম, কিংবা একটি একরোখা
বসন্তপ্রবণ দিন।

এসো নাদ!
আরো ডাকো নিগূঢ়,
ডাকো কৃপাহীন নিদাঘের ন্যায়
ডাকো নিরূপিত সংজ্ঞায়।

এক নহলি তৃষ্ণায়, ঝংকারে বেজে যাবার আকুতি। ব্রক্ষ্মাস্ত্রের মতো ছুঁড়ে দাও
কন্ঠবীণা, এসো বজ্র আর বিদ্যুতের অসুরীয় কায়দায়।

ন্যস্ত নক্ষত্রেশ

ভরভরন্ত চাঁদ ফেটে পড়ে আদিগন্তের ধবল পালে আরো আভা জুড়ে দিয়ে।
এখানে মৃৎ‍-পাত্রে টইটুম্বুর জোছনা, কিছুটা জাঁকালো করে দ্যায় দৃষ্টি আর
মস্তিষ্কঘোর। হীমজড়ানো বাতাসে পান্ডুর হওয়া গালে স্নেহ বোলায় মদির
মালতীর আঘ্রাণ। কেবল দৌড়ে চলা চাঁদ উঁকি দ্যায়, কখনো জানালায়- কখনো
বারান্দার ঝুলে থাকা অর্কিডের ফাঁকে।
অথচ কথা ছিল; এমন কোন ক্ষণ-কালেই মৃগয়ায় ভরে উঠবে আমাদের সমস্ত
দুর্মদ পানপাত্র, দ্রাক্ষালতায় দুলতে থাকা চাঁদে। ঠিক যতখানি প্রেমসক্ত ছিলো
নেফারতিতিয় অন্দরমহল কিংবা পারস্য রাজনীর বাঈজী’দের নুপুরের নিক্কনে,
ততখানি প্রেমেই ধ্বংস হবে নবীন কপোতাক্ষ প্রেমিক এমনি জোছনা জালে,
শশীকলায়।
এসময় খুব কাছাকাছি দ্রাঘিমায় থাকে যে সুহৃদ, সে হয়তো আগাথা ক্রিষ্টি
অথবা দস্তয়োভস্কি’তে নিমগ্ন করে রাখে আঁখি, পিছলে যায় তাই এমন
চন্দ্রালোক। অথচ বেথেলহেমের প্রাচীন আস্তাবলের আভ্যন্তরীয় হ্রেষা অথবা
নালের শব্দে ঘুমোতে পারিনা বলেই, আরো দ্বন্দমুখর হয়ে ওঠে
প্রাগৈতিহাসিকতা।
এ রাত কেবল ছায়ামাধবের, যার প্রচ্ছন্ন কিন্তু স্পষ্ট অবয়ব ক্রমেই প্রকট হতে
থাকে বাতায়ন গলে আসা অধিভৌতিক আলোয়, আর শীর্ণ আঙ্গুলের ফাঁকে
জ্বলে যাওয়া বস্তুটি ছড়ায় পবিত্র লোবানীজ খুশবু।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com