জাফর পাঠান-এর একগুচ্ছ কবিতা

দলদাস

শুনো ধরাবাসী, আর কতকাল দেখে শান্ত রই
নিত্য অপরাধ করে ওরা বলে- অপরাধী নই
নিজের জন্যই অপরের জন্য- মুখে ফোটে খই
দলের কথা বলে দেশের দেয় পাঁকা ধানে মই
দলের স্বার্থে ভিনদেশী আনুগত্যে স্বাক্ষর সই,
এদেরকে অনুসরণ করে- কেমনে ভালো রই !
আমি দলদাস নই- মানুষের পক্ষে কথা কই।

দল যদি- দলের জন্য করে- খুনের পর খুন
ভিন্নাদর্শকে মারতে- ওরা যদি ভরে শুধু তূণ
তবে যে-ই গা’কনা কেন- এই ভ্রষ্ট দলের গুণ
তুই ঘৃণ্য দলদাস মাত্র- আমি বলি- তুই শুন্
তোর ব্যক্তিত্ব নৈতিকতায় নিশ্চিত ধরেছে ঘুন,
তোরা তবে নিজ পরকালের ধ্বংসের বীজ বুন
সাক্ষি ঊষা-গোধূলীর দিন রাতের শশী-অরুণ।

ভ্রষ্ট দলদাসেরা শুন্, যা বলি কান পেতে শুন্।

মজুরের মজুরি

সৃষ্টির প্রারম্ভে যুগে যুগে- তোমরা ছিলে যেমন
সভ্য-শিক্ষিত দাবীর যুগে এখনো আছ তেমন।
এখনও শোষণ- পেষণ- চলছে সমানতালে
সেই কাল আর এই কাল ভালো নেই কোনকালে।

অমানুষিক শ্রমে- তোমরা গায়ের ঘাম ঝরাও
নিত্য-নতুন এনে সমাজ থেকে পুরনো সরাও।
হাট-ঘাট-মাঠ, আকাশচুম্বি অট্টালিকাও দাও
হারভাঙ্গা পরিশ্রমেও তার কি প্রাপ্যটুকু পাও!

আজও অবহেলিত-শোষিত-পীড়িত- র্নিযাতিত
ভাগ্য চাকা কেন রয় অচল- এখনো অবিদিত।
কি নির্মম পরিহাস, যারা ঘুরায় ধরণীর চাকা
অভাবের অমানিশায় তারাই পড়ে থাকে ঢাকা।

কিসের আবার মে দিবস-সেমিনার, কিসের কি
যত যা হয়েছে আজ অবধি- সবই লাগে মেকি।

উদাসী মন

কি এক রহস্যকে ঘিরে – উদাসী মন আমার
খুঁজে বিজন আবাসনে – সুরেলা সুর ধামার,
হতে চায় কখনো-মেঘে ঢাকা বিশাল আকাশ
কখনো হতে চায় – শ্যামল প্রকৃতির বাতাস।

ইচ্ছার ঘোরে ঘুরে কখনো- কল্প ভেলায় চড়ে
কখনো মাতাল হাওয়ায় – মাতন ঝরে পড়ে,
মস্ত অর্ণবে ঘুরে ফিরে এ-বেলা ফিরেনা নীড়ে
ভাবের সাথে ভাব করে ঘুরে শূন্যতাকে ঘিরে।

কখনো সে উধাও হয় – উদাসের হাত ধরে
অথচ জানেনা নিজেও- আছে কত দূরান্তরে,
মৃম্ময় দেহকে ধরে- আমি থাকি আমায় ঘিরে
আর প্রহর গুণে যাই- কখন উদাস ফিরে।

আমার ঢেউ খেলা মনের তীরে-ভঙ্গুর নীড়ে।

মননের কবিতা

মননের কবিতা লিখতে গিয়ে দেখি
বহুবার- মনের করেছি কাটাকাটি,
জীবনে মনে টুকেছি- যত শব্দমালা
মনের খাতা উল্টে করেছি ঘাটাঘাটি।

ভাব গহীনের ঐ শস্য শ্যামলা মাটি
হিল্লোলিত তটিনীর- তট ধরে হাঁটি,
দুটি চরণ পাবো বলে- ধরেছি বাটি
পাই যদি কবিতা খাইদ ছাড়া খাঁটি।

মনকে জ্বালিয়ে চেয়েছি নিজে জ্বলতে
প্রতিটি অস্তিত্বের সাথে কথা বলতে,
পারি যদি- কাঙ্খিত কবিতাটি ধরতে
দুঃখ থাকতোনা বাঁচতে আর মরতে।

হারালেও আমি- হারাবেনা কাব্য সত্তা
মুত্যুঞ্জয়ী কবিতার- হবো এক আত্মা।

কে দায়ী

জানিনা বাগানে এখন- ফুটেনা কেন ফুল
গায়না কেন সুরেলা গান- পাখি বুলবুল,
কোথায় হারিয়ে গেছে- বন থেকে বনফুল
মৌমাছি পায়না মৌটুসি যাতে ফোটাবে হুল।

ঋতুরা বৈচিত্র নিয়ে আসেনা মিটাতে মন
দোলেনা এখন আর- পুঞ্জ পুঞ্জ কাশবন,
নেই কিষাণ-কিষাণির- মনোভোলা বাধন
নেই আউল-বাউলের সেই- গীত সাধন।

খোলামনে হাসি নেই হাসে যেন কাষ্ঠহাসি
প্রতিবেশীরা হয়েছে আজ- দূর পরবাসী,
জোছনা মুছে পূর্ণিমা হয়ে যায় অমানিশি
মনের সাথে মন মিলিয়ে নাই মিলামিশি।

চাঁদ তারা গগনের কাছে- প্রশ্ন যদি রাখি
কাঁদে অঝরে কাঁদে গুমট স্রোতস্বিনী আঁখি,
আলোকে সুধাই যদি- নিভায় সমস্ত আলো
বলে, মনে প্রতিবাদী বিপ্লবী মশাল জ্বালো।

তুমি মৌবন-ভরা যৌবন

ঋতুতে তুমি গ্রীষ্ম, তাপ তপ্তে ভয়ংকর অদম্য
রূপে-যৌবনে-গুণে তবু তোমাকে জানাই প্রনম্য।

রুক্ষতা শুষ্কতায় যখন ভরে যায়, বসুধার প্রান্তর
তুমি আনো শ্যামল সবুজ রূপ- করো জন্মান্তর।

রসালো- মধুফুলের উপহারে, ভরে দাও ধরাতল
মেদুর মোহিত মৌ মৌ গন্ধে, করো মধুর মাতল।

আকাঙ্খার মোহনায় হুল ফুটিয়ে আমি হই মৌটুসি
টসটসে মধুমাখা তনে, তুমি যুবতী- তুমি উর্বশী।

তোমার নবরূপে- অপরূপে, মোহে করো মোহন
তুমি ঋতুর শৌর্য-বীর্য, তুমি যৌবন তুমি মৌবন।

বসন্তের পুষ্প শোভিত বাসর ঘরে করেছো মৈথুন
গ্রীষ্মে তুমি চিরহরিৎ কান্তি, ভরা যৌবনের আগুন।

হে গ্রীষ্ম, তোমার পেলব পল্লবে বহে কামুক পবন
আমি হই মৌয়াল, তুমি মৌবন-তুমি ভরা যৌবন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
৫৮ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com