বিস্মৃতির পথে কিংবদন্তী কৃষক নেতা ও প্রত্নবিদ এম. এ জব্বারdu

তহমীনা খাতুন # আমরা বড় আব্বা এম.এ জব্বার। তাঁর মৃত্যুর পর তিন দশক অতিক্রান্ত হবে আগামি ২৭ জুলাই। আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁর নাম তেমনভাবে পরিচিত রাখার দায় আমরা সেভাবে পালন করতে পারিনি একথা ঠিক। তবে অবহেলা, উদাসীনতা, স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চক্রান্তে এক সময়ের সুন্দরবন অঞ্চলের বিশিষ্ট কৃষক নেতা ও প্রত্নতত্ত্ববিদ এম.এ জব্বার বিস্মৃতপ্রায়। তবে তাঁর কীর্তি বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালাটি আজও রয়েছে। সেখানে সযত্নে  রয়েছে বিপুল প্রত্নসামগ্রী।

উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট মহকুমার হাড়োয়া থানার মাঝেরআইট গ্রামের এক প্রত্যন্ত প্রান্তে সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করলেও নিজের অধ্যবসায় ও নিষ্ঠায় সমকালীন সমাজের কাছে তিনি ছিলেন নমস্য এক ব্যক্তি। এই জায়গায় তিনি নিজেকে নিয়ে যেতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নানা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই সব আন্দোলন আজ ইতিহাস। উচিলদহে পোর্ট ক্যানিং কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহে, তেভাগা আন্দোলনে, স্বাধীনতা সংগ্রামে তো বটেই স্বাধীনোত্তর ভারতে নানা গণ আন্দোলনের তিনি ছিলেন প্রথম সারির অন্যতম নেতা। তাঁর বাবা হাজের আলি মণ্ডল গান্ধিজির ডাকে লবন সত্যাগ্রহে অংশ নিয়েছিলেন।

সুন্দরবনের প্রত্যন্ত প্রান্তে লবন সত্যাগ্রহের সংবাদ আনন্দবাজার পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সংবাদে হাজের আলির ছবিও ছাপা হয়েছিল। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ জব্বার বিশ্বাস করতেন দেশ স্বাধীন করার পাশাপাশি মানুষের শোষণ পীড়ন বন্ধ করতে হলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজও করতে হবে। সমাজতন্ত্রের ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে কমিউনিস্ট পার্টিকে শক্তিশালী করতে হবে। ১৯৩৬ সালে তিনি সিপিআই-এর সদস্যপদ পেয়েছিলেন। পিছিয়ে পড়া মানুষ, বিশেষত সুন্দরবনের আদিবাসী সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিরলস পরিশ্রম করতেন। ব্রিটিশ পুলিশ ও পরবর্তীকালে স্বাধীন দেশের পুলিশ আন্দোলনের মধ্যে শাসক দলের ক্ষ‌মতা হারানোর ভূত দেখতো। তাই বারবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৯৬২ চিন ভারত আক্রমণ করলে(যদিও জব্বার সাহেব চিনকে আক্রমণকারী মনে করতেন। চিনের ভূমিকার কট্টর সমালোচক ছিলেন) ভারত রক্ষ‌া আইন (ডি.আই. আর)-এ তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

এলাকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ যাতে সুস্থ থাকে তার জন্য তাঁর সমকালীন সময়ে এলাকায় এই ভাবনার মানুষ ছিল কম। রাজনৈতিক জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত, ওঠা নামার মধ্যেও দেশের আঞ্চলিক ইতিহাস সংরক্ষ‌ণ ও চর্চার আগ্রহ থেকে শুরু করেন অঞ্চলভিত্তিক প্রচলিত রীতি, আচার, লোকাচার, লোক বিশ্বাস পীর, পীরানি নিয়ে নানা কিংবদন্তী তাঁকে আকর্ষিত করত। তিনি এই সবের মধ্যে ইতিহাসের উপাদানের সন্ধান করতেন। হাড়োয়ার পীর গোরাচাঁদ ও বেড়াচাঁপার খনা-মিহিরের ঢিপি ও চন্দ্রকেতুগড় ঘিরে রহস্যের উন্মোচন হোক এটাই ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ‌্য। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমান্তরাল ভাবে চলতে থাকল ইতিহাস গবেষণার কাজ। চন্দ্রকেতুগড় নিয়ে প্রচলিত মিথ ভেঙে ইতিহাসের সত্যতাকে খুঁজতে আরম্ভ করেন চল্লিশের দশক থেকে। অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন পুরাসামগ্রী ও প্রচলিত কাহিনীর রহস্য ভেদ করে ইতিহাসের সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর প্রয়াস। কল্প কথাকে তিনি কখনও বিশ্বাস করতেন না। বরং সেই কথার মধ্যে ইতিহাসের কোনও সূত্র লুকিয়ে রয়েছে কিনা সেটাই ছিল তাঁর ভাবনার মুখ্য বিষয়। সব সময় তিনি চাইতেন বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা। প্রথাগত শিক্ষ‌ায় শিক্ষ‌িত না থাকায় নানা ক্ষ‌েত্রে তাঁর বিশ্বাস ও মতকে বহু বিদগ্ধ জনেরা উপেক্ষ‌া করলেও পরে তা মানতে বাধ্য হয়েছেন তাঁর ব্যাখ্যা, যুক্তি ও প্রমাণের কাছে। তথাকথিত গুণীজনের একাংশ তাঁর প্রতিভায় শংকিত হয়ে নানা অপপ্রচার ও তাচ্ছিল্য দেখালেও তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে যাননি। তিনি বারবার বলতেন, ইতিহাস বড় নির্মম। একদিন ওঁদের তাচ্ছিল্যকে উপেক্ষ‌া করে সত্য উদঘাটিত হবেই। সত্যিই মেয়েবেলা থেকে কিশোরী জীবনে লক্ষ‌্য করেছি বহু পণ্ডিত মানুষ জন তাঁর কাছে মাথা নত করে ইতিহাসের পাঠ নিতেন। কত জন গবেষণার কাজে তাঁর কাছে এসে বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালা পরিদর্শন করেছেন তার তালিকা কে রেখেছে। রাখার প্রয়োজনও তিনি মনে করতেন না। নিজের ঢাক নিজে বাজানোর মানুষ তিনি ছিলেন না। তবে বহু গুণীজন তাঁকে তাঁদের পরিবারের আপনজন মনে করতেন।

জীবনের শেষ দেড় দশক তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তাঁর যা লেখালেখি ওনার মুখে শুনে আমাদের লিখতে হত। সব সময় তা না হওয়ায় তাঁর অনেক অনুসন্ধানের কথা মুখে বলতেন আর বুদ্ধিমানরা তা ব্যবহার করতেন। নূ্নতম কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করেই। শিশুবেলা থেকে তাঁর এ কাজে সঙ্গে থেকে অনেক কিছু বুঝেছিলাম যা তাঁকে বললে বিশ্বাস করতে চাইতেন না। আসলে দৃষ্টিশক্তি না থাকায় সব মানুষের ভাল মন্দ বোঝার উপায়ও ছিল না। হাড়োয়া, বেড়াচাঁপা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে সংগৃহীত নানা প্রত্নবস্তু, পুঁথি দলিল দস্তাবেজ নিয়ে চল্লিশের দশকে এক দূর্গাপুজোর সময় অতীতকে জানুন নামে একটি ছোট্ট প্রদর্শনী করেন এলাকার মানুষকে ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করতে। তারপর ধীরে ধীরে সংগ্রহ বাড়তে থাকে। আমাদের মাটির ঘরের একটি দাওয়ায় (বারান্দা) রাখা শো-কেসে প্রত্নদ্রব্য সাজানো থাকত। রাজ্য তথা দেশ-বিদেশ থেকে ঐতিহাসিক ও গবেষকরা তা দেখতে আসতেন। এরপর কলেবর বৃদ্ধি হতে লাগল। তখন নতুন একটি ঘর তৈরি করে অনেকগুলি শো-কেসে সাজানো হল সব। বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালা নামে স্থায়ী সংগ্রহশালা গড়ে উঠল। সেদিন আমাকে বলেছিলেন এই যে যা কিছু দেখছো এসবই দেশের মানুষের সম্পত্তি। এটা কোনও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সে কথা আমি আজও মনে রেখেছি তাই নয় বিশ্বাসও করি।

এম.এ জব্বার বিশ্বাস করতেন নালন্দা মহাবিহারের সমসাময়িক যে বালান্দা মহাবিহার গড়ে উঠেছিল তা এই তল্লাটেই। হাড়োয়ার একটি মৌজার নাম তাই খাসবালান্দা। বালাণ্ডা ইংরেজদের উচ্চারণ। আসলে হবে বালান্দা। পরবর্তী সময় ওই তল্লাটে গ্রাম পঞ্চায়েতের নামকরণ হয় খাসবালান্দা গ্রাম পঞ্চায়েত। ওই খাস বালান্দাতেই একটি মসজিদ আছে আগে সবাই মসিদকাদা বলে জানলেও জব্বার সাহেব দিল্লিতে লালকেল্লা দেখে খাসবালান্দার মসিদকাদার রং লাল বলে নাম দিলেন লাল মসজিদ। সেই নামেই আজও এলাকায় প্রচলিত ও পরিচিত। লাল মসজিদের গায়ে অলংকৃত পদ্ম দেখে যদি কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করতে চায় তো তাদের মত মুর্খ আর হবে। কারণ জব্বার সাহেবের বক্তব্য ওটি একদা বৌদ্ধ বিহার ছিল। পরে বৌদ্ধরা মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর ওইটি মসজিদে পরিণত হয়, যা বহুজন দ্বারা স্বীকৃত। এটাকে রক্ষ‌ার জন্য তিনি প্রশাসনিকস্তরে আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও সরকারের অনীহায় আজ তা বিলুপ্তির পথে। তাঁর কথায় নালান্দা মহাবিহারের ছাত্র হিউ-য়েন-সাঙ ৬৭১ খৃষ্টাব্দে চিনা ভ্রমণ বৃত্তান্তে গাঙ্গেয় উপত্যকায়(সমতট)-ওই সময় দেড় হাজারের অধিক সংঘারাম, বৌদ্ধ বিহার ও চৈত্য ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক বিবর্তনে এই সমস্ত বৌদ্ধ ধর্মচর্চা কেন্দ্রগুলি বিলুপ্ত হলেও আজও তার নিদর্শনগুলি নিশ্চিহ্ন হয়নি। তিনি বিশ্বাস করতেন ইতিহাসের কাল ও ঘটনাবলী সম্পর্কে সত্যের অনুসন্ধান-ই ইতিহাস গবেষকদের লক্ষ‌্য হওয়া উচিত। ১৯৩৮ সাল থেকে বাংলা তথা ভারত পরিক্রমার মধ্যে লব্ধ জ্ঞান থেকে ১৯৪৮সাল থেকে তিলে তিলে গড়ে ওঠা সংগ্রহ নিয়েই তৈরি হয় বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালা।

চন্দ্রকেতুগড়, খনা-মিহির ও লালমসজিদ নিয়ে তিনি বারবার বিভিন্ন জায়গায় দরবার করেছেন। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন সিপিআই সাংসদ রেণু চক্রবর্তীকে দিয়ে লোকসভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হলে কেন্দ্রীয় সরকারের নাম মাত্র অনুদানে খনা মিহিরের ঢিপি খনন কার্য চালানো হয়। খনন কার্যের নেতৃত্ব দেন প্রত্নতত্ত্ববিদ কুঞ্জবিহারী গোস্বামী। রেণু চক্রবর্তী এই বিষয়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষ‌ামন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় আর্কেলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া পরবর্তীতে এই দুটি স্থানকে সংরক্ষ‌িত বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরীক্ষ‌ামূলক খননের পর ছয় দশক কেটে গিয়েছে।  তেমন কোনও উদ্যোগ সরকারী পর্যায়ে কেউ নেননি। সম্প্রতি বারাসত লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ডাঃ কাকলি ঘোষ দস্তিদার চন্দ্রকেতুগড়ে সংগ্রহশালা গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই কাজ তদারকি করার জন্য প্রশাসনিকস্তরে ২১ জনের একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। চন্দ্রেকতুগড়ের পাশাপাশি বালান্দা মহাবিহারের সপক্ষ‌ে প্রাপ্ত পুরাসামগ্রী সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত হওয়ার জন্য তিনি প্রাথমিকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালার পরিচালন সমিতি চায় চন্দ্রকেতুগড়ে সরকারি উদ্যোগে সংগ্রহশালা গড়ে উঠুক তবে হাড়োয়ায় জব্বার সাহেবের সাধের বালান্দা প্রত্ন সংগ্রহশালাটি সাইট মিউজিয়ম হিসেবে সরকার স্বীকৃতি প্রদান করুক। তাহলে চন্দ্রকেতুগড়কে কেন্দ্র করে ১০ কিলোমিটার পরিধি জুড়ে একটি পর্যটন সার্কিট গড়ে উঠতে পারে। চন্দ্রকেতুগড়, লালমসজিদ, পীর গোরাচাঁদের মাজার, ধান্যকুড়িয়ার গাইন, বল্লভ, সাউদের বাগান বাড়ি, ড. শহীদুল্লার বসতবাটি, কবি সাহাদাত হোসেনের বসতবাটি, কচুয়া ও চাকলায় লোকনাথ মন্দির, রায়কোলার মসজিদ ঘুরে দেখতে উইক এন্ড ট্যুর হিসেবে চন্দ্রকেতুগড় পর্যটকদের আকর্ষণ কাড়বে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
১৫৮ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com