সাইদুল ইসলাম-এর একগুচ্ছ কবিতা

মানি না এ ভূখন্ডের চৌ সীমানা

উড়ন্ত পাখিরা ধূসর পালক ঝরায়
ছুঁতে চায় মুক্ত নীল সীমানা
আকাশের খাঁচায় বন্দি পাখিরা
ফিরে যেতে চায় আদিম বাসভূমে।

পৃথিবীর সীমান্ত খুলে দাও
উপলে ফেলো লোহার প্রাচীর
অনন্ত এ রোদের কণার মতো খেলতে চাই
কালের সবুজ শস্য ক্ষেতে।

শিকলে ভারে নুয়ে পড়ে ডানা
নুয়ে পড়ে না প্রানের স্বাপ্নগুলো,
মায়ানমার হতে প্যালেস্তাইন
আমি মানি না এ ভূখন্ডের চৌ সীমানা?

সাংগু এখন বয়বৃদ্ধ নদী

মৃত সাংগু এখনো সমুদ্র খুঁজে হাতরায়
স্রোতের আড়ালে স্বচ্ছ নুড়িগুলো
অন্ধ বালিকার মতো মৃত্তিকা দ্যাখে।
পাহাড়ের চোখে আর কোন জল নেই
তাই ভিষণ খড়ায় পুড়ছে সাংগু
পালকে স্রোতের চিহ্ন মুছে ফেলে পানকৌড়ি।
জলের আয়নায় আকাশ এখন আর মুখ লুকোয় না।
বার্ধক্যে পা রাখা রমনীর মতো ক্রমে শুকায় ঋতুস্রাব,
এখন তার যৌবন শেষ, সে যে কোন বয়বৃদ্ধ নদী।

২৪/০৩/১৭
বান্দরবন।

ধ্বংসের জন্য তোমায় সৃষ্টি করি

অষ্টমির বাতায়নে যে অনাহারি নিশিন্দা সোদাগন্ধ দিতে নামে মৃত্তিকার বাসনে
আমি আবিস্কার করেছি তার অন্তরিক্ষে আমাদের।
 বেহায়া রাত উলঙ্গ করে খুলেনেয় কলাফুলের পাপড়ি কে।
তুমি আর আমি কামনার নাব্যতায় ভাসি, যেমন ভাসে জল আর লাজুক জোস্না।

আদিম প্রতিমার মতো ভেতরের খোলস টা শক্ত ইতিহাস হয়ে বাঁচতে চায়,
যেমন বাঁচে মৃত শামুকের কামুক ভাবনায়, অযত্নে লালন করা বধির স্বপ্নগুলো।
আমরা যতো দৃঢ়চিত্তে বসন্তগুলোকে কাছে টানি ততোটা লাঙলের ফলায় চিরে দুঃখগুলো চাষ করে ঈশ্বর।
খসেপড়ে আমাদের কলারাজ্যে গড়েতোলা পুরানা তাজমহলের ইটগুলো।
 ধ্বংস হবে একদিন জেনেও সৃষ্টি করি তোমাকে, তোমাকে হারাতে হবে বলেই অাজন্ম প্রচীন পিরামিডের মতো চিত্রকলা করে বুকের দেয়ালে লটকে রেখেছি।
যাতে স্মৃতির কোনো ধূলো ঢেকে না যায় অস্তিত্বের বিবর্তনে।

অরণ্য হত্যার উৎসব

আলোর পঞ্চপিন্ডের প্রতিফলন কী নক্ষত্র?
সব নক্ষত্রগুলো জোনাকীর সদ্যজাত ।
বিবর্তনে একদিন সব নক্ষত্রগুলো আমাদের প্রতিবেশী হবে।

আর কতো বসত নির্মানের নামে বসুধাকে টুকরা করবো,
কতো আর নদীগুলেকে বাঁধদিয়ে সাগরের বুক খালি করবো ?

সভ্যতা আসে চিরহরিৎ বসন্ত চুষে
হারায় বন গজায় অট্টলিকা।
একদিন মানুষের প্রয়োজনে যে অক্সিজেন
আজ সেই মানুষ হত্যাকরে অটবী।

সভ্যতার নাম যদি হয় অরণ্য হত্যার উৎসব
এই উৎসব একদিন মানব হত্যার উৎসব হবে।

ছায়াগুলোকে খামার করে পুষি

আমার আবার কি ছিলো ?
আমি যেমন এসেছি, এখন তেমনি আছি
ছায়াগুলো প্রতিদিন তার চরণ রেখে আবার ফিরে যায়।
শুধু আমি পরে থাকি স্মৃতির বেলাভূমিতে।

সে আসে মেঘের মতো
মৃত্তিকায় প্রতিচ্ছবি রেখে, অতঃপর হারিয়ে যায়।
ওরা সবাই আসে হারিয়ে যেতে
এর পরে আমি জ্বলন্ত যন্ত্রনার নিথর পাথর হই
চেখের ভাস্কর্যে এঁকেনেই স্মৃতির দেয়াল।

আমি তোমাদের কেউ নই,
তোমরা আমার ক্ষণিকের পথ ধূলা
পথ শেষে নতুন গন্তব্য,
তবু বাঁচি তবু রচি, অপেক্ষায় থাকি নতুন কোন ধূলোর স্নানে সিক্ত হব বলে।

সবাই চলে যেতে আসে,
 কায়ার ভেতরে লৌহ নোঙর ফেলে
আবার শিকল ছেঁড়ার শঙ্খ বাজে।
পৃথিবীর এই অন্ধকার আর বিচ্ছেদের গন্ধ মাখা বায়ু
খুব চিরো চেনা।
আমাকে কাছের আসার মোহ নিতান্ত দেউলিয়া করে দেয়,
আমি জন্মান্ধের মতো বুকের ভেতরে ছায়াগুলোকে খামার করে পুষি।

যে মুক্তচিন্তা কবিতা

সভ্য যুগে নির্যাতনে যে ভ্রুনের জন্ম হয়,
সেই মসৃন জরায়ুতে চিন্তারা কবিতায় রূপ নেয়।
পার্থক্য করে সত্য ও মিথ্যার
টেনে খুলে দেয় ঈশ্বরদের মুখোশ।

কবিতা মানুষের কথা
যে চিন্তায় রক্তের কথা বলে না,
অধিকারের কথা বলে না
সে যতোই মুক্ত কথা হোক
তা কবিতা হতে পারে না।

পৃথিবীর অশুভ বর্বরতার খোলসে
যে চিন্তা প্রকাশ পায় না
যে চিন্তা মুক্তির আগে মৃত্যু ঘটে
সেই হারানো চিন্তাই কবিতা।

যে মুক্ত চিন্তার গলাটিপে হত্যা করা হয়
যে চিন্তায় ঈশ্বরের অস্তিত্বে আঘাত লাগে
যে চিন্তা অত্যাচারির মসনাদ নাড়ায়
সেই মুক্তচিন্তা ই কবিতা।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২১০ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com