আখতারুজ্জামান আজাদ

আখতারুজ্জামান আজাদ এর গল্প

৪৬৬ বার পঠিত

প্রক্সি

খাদিজা খায়েরের চোখজুড়ে বিদ্যুৎ চমকাল। ঠোঁটজুড়ে তার ইদের চাঁদের মতো চিকন হাসি। তার আপাদমস্তক বয়ে যাচ্ছে স্বস্তির স্রোত, বুকের ওপর দিয়ে নেমে গেল দেড়দশকের দেড়মণি পাথর। আসিফুল কাদেরকে এবার তিনি দেখিয়ে দিতে পারবেন, পারবেন উচিত শিক্ষা ও অনুচিত শিক্ষা দিতে। দেড়টি দশক ধরে খাদিজা আজকের দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন, ঝিম ধরে অপেক্ষায় ছিলেন ঝাল মেটানোর। ষোলো বছর আগে আসিফুল কাদেরের সাথে তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছিল। খাদিজার আজন্ম ইচ্ছে ছিল নায়িকা হওয়ার। কলেজে পড়াকালে দৈনিক পত্রিকার আনাচে-কানাচে তার এক বর্গইঞ্চি আকারের কিছু ছবিও ছাপা হয়েছিল, প্রস্তাব পেয়েছিলেন নায়িকার ছোটবোনের চরিত্রে অভিনয়েরও। চরিত্রটিতে তিনটি সংলাপ ছিল। একটি দৃশ্যে ‘ইয়া আল্লাহ, তাই নাকি’ বলে তাকে যারপরনাই বিস্মিত হতে হবে, আরেকটিতে টেলিফোনে নায়ককে ‘আপা বাসায় নেই’ বলে ঠাস করে রিসিভার রেখে দিতে হবে এবং শেষটিতে ‘কেন শুধু আমার সাথেই এমন হয়’ বলে বড়বোনকে জাপটে ধরে অঝোরে কেঁদে দিতে হবে। খাদিজার বাবা খায়রুল করিম তাড়াহুড়ো করে মেয়েকে দেড়গুণ বয়সী আসিফুল কাদেরের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে মেয়ে নাটকমুখো হতে না পারে। শ্বশুরের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বিয়ের এগারো মাসের মাথায় আসিফ খাদিজার কোলজুড়ে একটি বাচ্চাও এনে দিয়েছিলেন।

জামাই-শ্বশুর ভেবেছিলেন মা হওয়ার পর খাদিজার রূপযৌবন ধসে পড়বে, চোখ দুটো কোটরে বসে পড়বে; চোখের নিচে কালসিটে জমে যাবে, খাদিজাপ্রণালির জলরাশি কমে যাবে। বাচ্চার জন্মের পরও অবশ্য খাদিজা দমে যাননি। নায়িকার ছোটখালার চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়ে বাচ্চা বাসায় রেখে যখন তিনি শুটিংয়ে বান্দরবান যেতে চাইলেন, তখনই ঘটেছিল বিপত্তি। আসিফ খাদিজাকে ঘরে রেখে তালা মেরে বাইরে গিয়েছিলেন এবং এর পরদিনই বাচ্চা নিয়ে খাদিজা পতিগৃহ ত্যাগ করে আসিফকে তালাকনামা পাঠিয়ে দেন। বিউটি পার্লারের ব্যবসা করে সেই থেকে কেটে যাচ্ছে তার দিনকাল। মাঝে এক সহকারী পরিচালককে তিনি বিয়েও করেছিলেন। অবশ্য তার সেই সংসারটিও টেকেনি, নাটকেও আর অভিনয় করা হয়নি তার, তার আর ঠাঁই পাওয়া হয়নি মহাসড়কের বিলবোর্ডে কিংবা বঙ্গীয় তরুণসমাজের দিলবোর্ডে।

উৎফুল্ল খাদিজা খায়ের আজ মনে-মনে উদ্বাহু নাচ নাচছেন। মেয়ে নয়, মনে হচ্ছে তিনি নিজেই ‘সাগরিকা হেয়ার অয়েল কেশকুমারী’ প্রতিযোগিতায় শীর্ষ দশে ঠাঁই পেয়েছেন। আদিবা আমরিন তার মেয়ে হলেও বয়সের ব্যবধান মাত্র তো উনিশ। তার সতেরো বছরের মেয়েটি আজ সাগরিকা হেয়ার অয়েলের সেরা দশ কেশকুমারীর মধ্যে ষষ্ঠ হয়েছে। আদিবার রোল এখানে অবশ্য দুই-তিনের ভেতরেই থাকতে পারত। তৃতীয় রাউন্ডে তিনটি প্রশ্নের জবাব না পারায় তার রোল এখন ছয়। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতার নাম ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ বলায়, শেরে বাংলা কে ছিলেন— প্রশ্নের জবাবে ‘শেরে বাংলা একটি স্টেডিয়াম ছিলেন’ বলায় এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির নাম ‘খালেদা জিয়া’ বলার কারণে এখানে আদিবার প্রথম তিনে থাকা হয়নি। ক্লাস রোল কখনও ছয় না হলেও অন্তত কেশকুমারীদের মধ্যে রোল ছয় হওয়ায় মা-মেয়ে দুজনই খুশি।

মঞ্চে ঝলমল করে একে-একে উঠে আসছে কেশকুমারীরা। তাদের চোখে-মুখে গর্বের ঘনঘটা, দেহের ভাঁজে-ভাঁজে মাভৈ মাভৈ জয়ধ্বনি। আজ তাদের দশজনের দশটি নাক যেন দশখণ্ড এভারেস্ট। এক কনুই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি, অন্য কনুই একশো আশি ডিগ্রি কোণ করে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে কেশকুমারীরা। তাদেরকে এক-এক করে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে উত্তরীয় আর উল্লাসে-করতালিতে ফেটে পড়ছে চ্যানেল এক্সের মিলনায়তন। গতবারের ষষ্ঠ স্থান অধিকারিণী অর্নি অনিন্দিতা যখন আদিবাকে উত্তরীয় পরাতে উদ্যত হলো, দর্শকসারিতে বসা খাদিজা খায়ের চাপা উল্লাসে ফেটে পড়লেন এবং আসিফুল কাদেরকে উদ্দেশ করে মনে-মনে এককোটি বার ‘হুহ্’ বললেন। খাদিজা চোখ বন্ধ করে ভাবছেন— আসিফ আর তার বর্তমান বউ নিশ্চয়ই টেলিভিশনে এখন এই দৃশ্য দেখছেন আর রাগে-ক্ষোভে-ঈর্ষায় আসিফ নিশ্চয়ই জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছেন। পাশের আসনে বসা নাট্যপ্রযোজক মকবুল মতিনের টোকায় সংবিৎ ফিরে পেলেন খাদিজা। বাঁ-চোখ মঞ্চে, ডানচোখ খাদিজার দিকে স্থাপন করে মকবুল প্রায় নিঃশব্দে বললেন, ‘আপনি আদিবার মা হলে কী হবে, আপা! আপনি কিন্তু আদিবার চেয়ে ঢের সুন্দরী। দেখে মনেই হয় না মেয়ে কে আর মা কে। পাশাপাশি দাঁড় করালে যে-কেউ বলবে আপনারা আপন দুই বোন।’ খাদিজা মোমের মতো গলে-গলে সজনে ডাটার মতো ঢলে-ঢলে ‘কী যে বলেন, মকবুল ভাই’ বলে কিছু-একটা বলা শুরু করতে চাইলেও মুখের কথা টেনে নিয়ে মকবুল বললেন, ‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি, আপা— আপনি এই প্রতিযোগিতায় নাম লেখালে ঐ দশ ছেমড়ি কোনো পাত্তাই পেত না। নিঃসন্দেহে আপনিই প্রথম হতেন!’

এই কাঠফাটা ভাদ্রমাসেও খাদিজা আমূল আর্দ্র হলেন, বিগতযৌবনকে স্বাগত জানালেন, বিলক্ষণ বিদ্যুৎ খেলে গেল তার ভেতরে-বাহিরে অন্দরে-বন্দরে। সদ্য-পঁয়ত্রিশ-পেরোনো খাদিজাদের রুদ্ধদুয়ার খুলে যেতে ‘আপনাকে আপনার মেয়ের বোনের মতো লাগছে’ জাতীয় একটি বাক্যই যথেষ্ট। একবার ডাক দিয়ে দেখলেই দেখা যায় পঁয়ত্রিশোর্ধ্বা বাঙালেরা ভেতরে-ভেতরে কতটা কাঙাল। এই না-যুবতী না-প্রৌঢ়া বয়সটা অতি আপজ্জনক। এই বয়সে একটি টোকা এদেরকে বোকা করে দেয়, তিন আঙুল মাথার এক চিমটি মিথ্যে স্তুতি আর এক মুঠো আশকারা এদের চোখের মাশকারাকে জলে ভিজিয়ে লেপটে দেয়।

দশ কেশকুমারীর মাকে মঞ্চে ডাকছেন সঞ্চালক, সেদিকে খেয়ালই ছিল না খাদিজার। তার মগজের মোহনবাঁশিতে বেজে চলছে একটিমাত্র মন্ত্র— ‘আপনি আদিবার চেয়ে ঢের সুন্দরী’। আজ এই প্রথম নিজ কন্যার ওপর ঈর্ষা বোধ করছেন খাদিজা। দাঁত কটমট করতে-করতে ‘বয়স থাকলে দেখিয়ে দিতাম’ মর্মে ভেতরে-ভেতরে গজরাতে থাকেন তিনি। আচমকা পাশে তাকাতেই খাদিজা লক্ষ করলেন এক চোখ মঞ্চে আর অন্য চোখ পার্শবর্তী আরেক নারীর দিকে মকবুল নিঃশব্দে কী কী যেন বলছেন। নারীটি অষ্টম স্থান অধিকারিণী আনিকা তাবাসসুমের মা শাগুফতা শারমিন। মকবুল কী বলছেন তাকে? হয়তো শাগুফতা আনিকার চেয়ে ঢের সুন্দরী, অথবা শাগুফতা আর আনিকাকে বোনের মতো লাগে, কিংবা প্রতিযোগিতায় নাম লেখালে শাগুফতাই হতেন চ্যাম্পিয়ন।

প্রথম তিন কেশকুমারীর মা মঞ্চ ওঠাকালে সঞ্চালক দর্শকদেরকে অনুরোধ করেছিল ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ দিতে। অন্য সাত মায়ের ক্ষেত্রে ওভেশনের বালাই নেই, তাদের জন্য ‘সিটিং ওভেশন’ই সই। মঞ্চে উঠে আদিবাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে কেঁদে দিলেন খাদিজা। কতটুকু কাঁদবেন, কতটুকু কাঁদলে মতিগ্রস্ত মেকআপ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না— তা অবশ্য তার জানা ছিল। অন্য মায়েরা হাসলেও কেবল আদিবার মা-ই কেঁদেছেন, খবরটি অনলাইন পোর্টালগুলোয় ‘মঞ্চে উঠে এ কী করলেন আদিবার মা’ শিরোনামে মিনিট দশেকের মধ্যে হট কেকের মতো ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। এ মুহূর্তে খাদিজার মগজজুড়ে অবশ্য অন্য চিন্তা— আসিফ এই দৃশ্য দেখছে তো? যদি না দ্যাখে?

‘সাগরিকা হেয়ার অয়েল কেশকুমারী’ প্রতিযোগিতার জমজমাট আয়োজন সম্পন্ন হলো। মূর্ত পত্রিকায় না হলেও অন্তর্জালের বিমূর্ত পত্রিকাগুলোয় স্বল্প পরিসরে প্রকাশিত হতে লাগল আদিবা আমরিনের সাক্ষাৎকার-সমগ্র। এর মাধ্যমে জাতি জানতে লাগল আদিবার প্রিয় খাদ্যের কথা, বাদ্যের কথা; প্রিয় মাছের কথা, গাছের কথা; প্রিয় রঙের কথা, টঙের কথা। আদিবার শৈশবের মজার স্মৃতি, জীবনের প্রথম প্রীতির কথাও জাতি জেনে গেল। রাষ্ট্রপতির নাম না-জানা আদিবার রাষ্ট্রচিন্তা; জাতীয় সংগীতের রচয়িতার নাম না-জানা আদিবা জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ইশুতে কী ভাবছে, তাও জানা থেকে জাতিকে বঞ্চিত করল না অন্তর্জালের ডটকমগুলো। কোনো একটি ডটকমের বিনোদন-প্রতিবেদকের প্রেমিকাকে পার্লারে বিনে পয়সায় সাজিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে সেই ডটকমে এমনকি খাদিজা খায়েরেরও একটি সিকি-সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারের লিংকটি তিনজন ব্যক্তি শেয়ারও করেছেন; যার একজন খাদিজা নিজে, আরেকজন কন্যা আদিবা। তৃতীয় ব্যক্তিটি কে— এই চিন্তায় তিনদিন যাবৎ খাদিজার ঘুম হয়নি।

চ্যানেল এক্সের সাথে মকবুল মতিনের চুক্তি ছিল— সাগরিকা হেয়ার অয়েলের শীর্ষ তিন কেশকুমারীকে নিয়ে মকবুল একটি নাটক বানাবেন, নাটকের নাম ‘তুমি একটা রোদ’। ষষ্ঠ হওয়ায় ঐ নাটকে আদিবার ঠাঁই হলো না, এমনকি নায়িকাদের ছোটবোনের চরিত্রেও না। ছোটবোনের চরিত্রে নেওয়া হয়েছে চতুর্থ হওয়া মালিহা মিজানকে, আর পঞ্চম হওয়া সাদিয়া সাদেককে। খাদিজা-আদিবা— দুই মা-মেয়ে মিলে অক্টোপাসের মতো জাপটে ধরলেন মকবুলকে, যাতে পরিচালককে বলে ঐ নাটকে অন্তত দুটো দৃশ্যের জন্য হলেও আরেকটি নারীচরিত্র তৈরি করা হয় এবং যাতে সেই চরিত্রে আদিবাকে নেওয়া হয়। মা-মেয়ের সভয় আবদারে মকবুল ‘এটা কোনো ব্যাপারই না’ বলে একবাক্যে অভয় দিলেন।

মকবুলের অভয় পেয়ে কয়েকটি ডটকমের প্রতিবেদককে বাড়িতে ডাকলেন খাদিজা খায়ের। মন্ডা-মিঠাই খাওয়ালেন তাদেরকে, দুপুরে খাওয়ালেন বাসমতি চালের ধবধবে শাদা ভাতের সাথে টকটকে লাল মোরগের রান, দিলেন তাদের পরিবারের নারী সদস্যবর্গকে বিনে পয়সায় পার্লারে সাজিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। সেদিন সন্ধে থেকেই ডটকমগুলো ছেয়ে গেল আদিবা আমরিনের মুখচ্ছবিতে। খবরের শিরোনামগুলো ছিল যথেষ্ট লোমহর্ষক। উত্তর-দক্ষিণ ডটকম ‘মঞ্চ কাঁপিয়ে এবার ছোটপর্দা কাঁপাতে আসছেন আদিবা’ শিরোনাম দিয়ে জুড়ে দিলো ওর উত্তরীয়-পরা একটি ছবি, ঢালিউড ডটকম ‘কেশকুমারী আদিবা এবার নাটকে’ শিরোনাম দিয়ে জুড়ে দিলো ওর বৃষ্টিভেজা একটি স্বচ্ছ-নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মানের ছবি, আর ‘জমবে এবার মকবুল-আদিবা রসায়ন’ শিরোনাম দিয়ে দুজনের একটি কোলাজ সেঁটে দিলো সিনেনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। আর মা-মেয়ে মিলে প্রত্যেকটি খবরের লিংক ও ইমেজ শেয়ার করতে লাগলেন স্ব-স্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে।

আদিবা নাটক করতে যাচ্ছে, আদিবা নায়িকা হতে যাচ্ছে— এ খবর রাষ্ট্র হলো রাষ্ট্রময়, ছড়িয়ে পড়ল জগৎময়। সম্প্রচারের দিন শুভাকাঙ্ক্ষীদেরকে একসাথে নিয়ে নাটকটি দেখার ঘোষণাও দিয়ে দিলেন খাদিজা খায়ের। বন্ধুমহলে তারকাখ্যাতি উপভোগ করতে লাগল আদিবা। নাটকটা একবার প্রচারিত হয়ে গেলে আদিবাকে আর কে পাবে— এ জাতীয় আলাপও বান্ধবীরা শুরু করে দিলো। বান্ধবীরা ‘আমাদেরকে মনে রাখবি কি না’ গোছের প্রশ্নবাণেও বিদ্ধ করতে লাগল আদিবাকে। তারা এ আবদারও করতে লাগল যে, শো-বিজে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়ার পর পরিচালক-প্রযোজকদেরকে বলে দিয়ে আদিবা যেন ওদেরকেও নাটকের নায়িকা বানিয়ে দেয়।

দিন যায়, রাত যায়। হপ্তা যায়, মাস যায়। আদিবার নাটকের খবর টাইমলাইন থেকে অদৃশ্য হয়, উত্তেজনার পারদ স্তিমিত হয়। খোঁজ মেলে না মকবুল মতিনের, খবর পাওয়া যায় না শুটিংয়ের তারিখের। খাদিজা কল করলে মকবুল বিরস বদনে জানাব-জানাব বলে কল কেটে দেন, আদিবা কল করলে সরস স্বরে মিহি সুরে ‘আসো না একদিন অফিসে’ বলে গল্প জুড়ে দেন। শেষ না হয়েও গল্প শেষ হয়, শুটিংয়ের তারিখের জন্য আদিবার অনাদি অপেক্ষা শেষ হয় না।

অবশেষে একদিন অপেক্ষার পালা শেষ হলো। শুটিংয়ের তারিখ ঘোষিত হলো। আগামী সপ্তাহে আদিবার অংশের দৃশ্যধারণ। রাতের দৃশ্য, ধারণ হবে উত্তরার একটি অ্যাপার্টমেন্টে। রাতে সেখানে নাকি থাকতেও হবে। আনন্দে আদিবা আবার আটখানা হয়, খাদিজা হন দশখানা। ফের তাদের ফেসবুকপাতা ভরে যায় শুটিংয়ের খবরাখবরে। শুটিংয়ের আগের দিন সকালে আদিবার কাছে মকবুলের কল আসে। মুহূর্তে মিইয়ে যায় আদিবার আমূল আগ্রহ। আদিবার আদিগন্ত ছেয়ে যায় ধূসর ধোঁয়ায়। খাদিজা আসেন আদিবার ঘরে।

— এই পিংক শাড়িটা পরে কাল তোর শুটিংয়ে যাব। কেমন হবে রে, আদি?
: এপিক হবে।
— আর সাথে এই লাল ব্লাউজটা। টিপও পরব লাল।
: এপিক হবে।
— কীসব এপিক-এপিক করছিস! হয়েছেটা কী তোর? কাল তোর শুট, আর তোর চেহারা এখন বাংলা পাঁচ কেন?
: আমার চেহারা কেন পাঁচ, তা কি তুমি আঁচ করতে পারছ, মা?
— কীভাবে কী! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সব খুলে বল না রে, আদি!
: এই তো বুঝে গেছ, মা! তুমি যেটা এইমাত্র করতে বললে, মকবুলও সেটা করতে বলেছে। সেও চায় আমি সব খুলে বলি!

চোখের কোণা চিনচিন করে ওঠে খাদিজার, মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে তার। তার শরীরের সব কটা ধমনী পরস্পরের সাথে প্যাঁচ লাগিয়ে শর্ট সার্কিট ঘটিয়ে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। জগৎ জেনে গেছে তার মেয়ের শুটিং কাল। এই নাটকে কাজ না করা হলে তার ইজ্জত থাকবে না। মিইয়ে যাবে তার দেড়যুগের জেদও। পাথরচিত্ত খাদিজা মুহূর্তে সামলে নিলেন নিজেকে।

— তো, কী করতে চাস এখন?
: জানি না। আমি এসবের কিছুই জানি না, মা।
— জানতে তোকে হবেই।
: তোমারও কিছু কথা জানতে হবে, মা। তোমারও জানতে হবে কেন আমি ষষ্ঠ হয়েছি, মালিহা-সাদিয়ার চেয়ে ভালো নেচে-গেয়েও কেন আমি প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় হতে পারিনি।
— এতদিন বলিসনি কেন এ কথা?
: বললে কী করতে তুমি? আমাকে প্রথম বানিয়ে দিতে?
— হ্যাঁ, দিতাম। তুই মকবুলের কাছে যাচ্ছিস না তা হলে?
: না।
— কত অবলীলায় ‘না’ বলতে শিখে গেছে আমার মেয়েটা! একদম আমার মতোই হয়েছিস তুই। ষোলো বছর আগে ঠিক এভাবেই তোর বাপকে আমি ‘না’ বলেছিলাম। সব কিছুতে ‘না’ বলতাম বলে বন্ধুরা এককালে আমাকে না-দিজা বলে ডাকত।

থমথমে আদিবাকে বাসায় রেখে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন খাদিজা খায়ের। আদিবা ফেসবুকে লগইন করে একে-একে ডিলিট করতে থাকে সাক্ষাৎকার-খবরের সবগুলো লিংক; বন্ধুতালিকা থেকে বহিষ্কার করে মকবুলকে, বহিষ্কার করে সাগরিকা হেয়ার অয়েলের প্রধান নির্বাহীকেও। মালিহা-সাদিয়া-আনিকা-অর্নিও আদিবার বহিষ্কারযজ্ঞ থেকে রেহাই পেল না। অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করতে গিয়েও করতে পারে না সে। জাকারবার্গের এই নীলগহ্বরে ঢোকা যায়, বেরোনো যায় না।

সন্ধ্যায় আচমকা একটা ফোন কলে তাজ্জব হয় আদিবা। কল শেষে সে ‘এ তো অসম্ভব’ বলে লাফিয়ে ওঠে। উদ্বাহু নাচ নাচতে-নাচতে মাকে যখনই কল করতে যাবে, তখনই বেজে ওঠে কলিং বেল। দরোজা খুলে খাদিজাকে দেখতে পেয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে আদিবা। আদিবার এই আসমানি আনন্দের উৎস মকবুলের একটি ফোন কল। খানিক আগে আদিবাকে মকবুল বলেছেন, ‘কাল বিকেলে উত্তরার অর্গাজম টাওয়ারে চলে এসো ঠিকঠাক, সাথে তোমার মাকেও এনো।’

শুটিং হলো। চ্যানেল এক্সে নাটক প্রচারিত হলো। লোকে বলাবলি করছে মাত্র তিনটে দৃশ্যে হাজির হওয়া সত্ত্বেও আদিবার উপস্থিতি মূল তিন নায়িকার চেয়ে দাপুটে ছিল। এর বদৌলতে আদিবার ফলোয়ার বাড়তে লাগল হু-হু করে। আশি-একশোর গণ্ডি পেরিয়ে তার ছবিতে লাইক পড়তে থাকে চারকিলো-পাঁচকিলো। বাড়বাড়ন্ত ফলোয়ারদের বাড়তি চাহিদার যোগান দিতে আদিবা আপলোড করতে থাকে দৈনিক ছয়টি করে সেলফি। এর মধ্যে ‘মায়ের সাথে পিৎজা’ আর প্রত্যহ ‘ম্যাঁওয়ের সাথে সেলফি’ উল্লেখযোগ্য।

উপর্যুপরি ওপরে উঠতে থাকে আদিবা। এরই মধ্যে ডজন খানেক নাটকে অভিনয় করা হয়ে গেছে তার। সাতটি নাটক প্রচারিতও হয়ে গেছে। সাতটির একটি ছিল ধারাবাহিক; একত্রিশ পর্বের, এই নাটকের এগারোটি পর্বে উনিশটি দৃশ্যে তাকে দেখা গেছে। তার ফলোয়ার এখন পৌনে দু লক্ষ। লোকজন তাকে ‘সিনিয়র আর্টিস্ট’ বলে ডাকাডাকি করা শুরু করেছে। লাইভে এসে সিনিয়র আর্টিস্ট হিশেবে জুনিয়রদের উদ্দেশে মাঝে-মাঝে ‘মোটিভেশনাল স্পিচ’ও দিচ্ছে সে। মোটিভেশনাল স্পিচের ভীষণ জয়জয়কার এখন। ইতোমধ্যে আদিবা সেলফি আপলোডও কমিয়ে দিয়েছে, ছেড়ে দিয়েছে রোমান অক্ষরে বাংলা লেখার অভ্যেসও। এখন সে বাংলা অক্ষরে বাংলা লেখে, সেলফি তোলার সময়ে বজায় রাখে যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য, রাত-বিরেতে সে পদ্যও লেখে আজকাল। তার সর্বশেষ পদ্য— তুমিই আমার মহাসাগর, তুমিই আমার ঢেউ; তোমায় কত লাভ করেছি, জানবে না তো কেউ।

এখন আর মাকে শুটিংয়ে নেয় না আদিবা। ধারাবাহিকে অভিনয়ের পর থেকে মায়ের সাথে সেলফিও আপলোড করে না খুব-একটা। খাদিজাও তাতে অবশ্য চিন্তিত নন। মেয়েকে নায়িকা বানাতে পেরেই তিনি খুশি। তিনি সবচেয়ে আমোদ পেয়েছেন আসিফুল কাদের একদিন ফোন করে মেয়ের খোঁজ নিয়েছিলেন দেখে। তিনি বস্তুত আসিফের এই একটি কলের অপেক্ষায়ই ছিলেন দেড়টি দশক। খাদিজা-আসিফের ফোনালাপ অবশ্য ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়, সেই বিষবাক্য পঠিত বলে গণ্য হোক।

মকবুল মতিন নাটকপ্রযোজনা ছেড়ে দিয়েছেন বেশ আগেই। এবার তিনি সিনেমা বানাবেন। ভালোবেসে বেশ করেছি— বিগ বাজেট সিনেমা। যৌথ প্রযোজনার ছবি; নায়িকা বাংলাদেশের, নায়ক ভারতের। কোলকাতার হার্টথ্রব নায়ক মহেন্দ্র মুখার্জির বিপরীতে অভিনয় করবে আদিবা আমরিন— আদিবা এ কথা স্বপ্নেও ভাবেনি কোনো দিন। এত বড় সুযোগ হাতছাড়া করার কোনোই কারণ নেই।

খাদিজার আফসোসের কারণ হচ্ছে কন্যার ক্যারিয়ারের এত বড় ঘটনাটা তাকে জানতে হয়েছে পত্রিকা মারফত। এমনকি তার কন্যা সিনেমার লোকেশন দেখতে যে আজকের সন্ধ্যার বিমানেই মকবুল মতিনের সঙ্গে মুম্বাই যাচ্ছে, খাদিজাকে সেটিও জানতে হয়েছে মকবুলের প্রযোজনাসংস্থা তাজ প্রোডাকশনের ফেসবুক পেজ থেকে।

দুপুর থেকেই গোছগাছ শুরু করে দিয়েছে আদিবা। তিনদিনের মুম্বাই-সফর, এটি তার প্রথম বিদেশযাত্রাও বটে। স্বভাবতই উত্তেজনা একটু বেশিই কাজ করছে, এর ওপর যৌথ প্রযোজনার ছবিতে একক নায়িকা হওয়ার হাতছানি। বাসার বৃহত্তম লাগেজটি নিয়ে ‘মুম্বাই যাচ্ছি’ বলে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয় আদিবা। ওকে শক্ত করে টেনে ধরেন খাদিজা। প্রচণ্ড হাঁসফাঁস করতে-করতে ছলছল চোখে কন্যাকে আগলে জাপটে ধরেন তিনি।

— তুই মুম্বাই যাস নে, আদি!
: মা, কী বলছ এসব! আমি না গেলে হবে কীভাবে? না গেলে তাজ প্রোডাকশন আমাকে এই ছবিতে নায়িকা করবে? তুমি জানো কত মেয়ে এই ছবিতে ছোট্ট একটা পার্ট পাওয়ার জন্য সালোয়ারের গিঁট খুলে বসে আছে? সমস্যা কী তোমার?
— কোনোই সমস্যা নেই রে, মা! তুইও গিঁট খুলে বসে থাকলে সমস্যা নেই আমার।
: তা হলে?
— মকবুলের সাথে গেলে তোদেরকে তো একই রুমে থাকতে হবে!
: থাকব এবং দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারী এক রুমে যা যা করে, আমরাও তা-ই তা-ই করব। তো?
— কোনো তো-এরই উত্তর আমার জানা নেই রে, মা। আপত্তি মুম্বাইয়ে না, রুমেও না। আপত্তি মকবুলে। তুই অন্য কারো সাথে গেলে আমি বাধা দিতাম না।
: মকবুল ভাই কী ক্ষতি করেছে তোমার? নিঃস্বার্থভাবে তোমার মেয়েকে নাটকে সুযোগ দেয়াটাই কি ছিল তার অপরাধ?
— মকবুল আমার কোনোই ক্ষতি করেনি রে, বরং যারপরনাই উপকার করেছিল। এত উপকার করেছিল যে, এতই উপকার করেছিল যে, তা আমি তোকে বলতে পারছি না।

কী উপকার— জানতে চেয়েছিল আদিবা। খাদিজা এর জবাব দিতে পারেননি। তিনি নিথর-নিস্তব্ধ বসে রইলেন সোফায়। জবাব না পেয়ে লাগেজ টানতে-টানতে আদিবা চলে গেল মকবুলের অফিসের দিকে। হাঁ-হয়ে-থাকা দরোজার দিকে তাকিয়ে আছেন খাদিজা খায়ের। আদিবা জানেনি, আদিবা জানে না, আদিবা জানবে না— ‘তুমি একটা রোদ’ নাটকের শুটিংয়ের আগের দিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি খাদিজা মকবুলের সাথে কই ছিলেন, কেন ছিলেন, কী করেছিলেন।

খাদিজা খুব করে চাইছেন ঢাকা থেকে মুম্বাইগামী আজকের সব কটা বিমান বিধ্বস্ত হোক।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোঃ কামরুজ্জামান বাবু, কুমিল্লা #

A responsible and committed journalist who displays an ability to write balanced, informative and interesting stories that give all involved parties an opportunity to have their say. A quick learner who can absorb new ideas and can communicate clearly and effectively. Possessing excellent bonding skills and an enquiring mind that helps to win over the confidence of people. Multi skilled with a ability to build strong working relationships with fellow investigators, photographers, columnists and news editors. Currently looking for a suitable role in journalism with a reputable and exciting publisher.

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com