সাব্বিরই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখলেন

৩০ বার পঠিত

অবিশ্বাস্য! রোমাঞ্চকর! শ্বাসরুদ্ধকর! আধুনিক মারকাটারি রঙিন পোশাকের জামানায় টেস্টে এই শব্দগুলোর প্রয়োজন পড়ে যৎসামান্যই! রোববার চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে সেটারই দেখা মিললো। যার কেন্দ্রস্থল হয়ে থাকল বাংলাদেশের ব্যাটিং। শেষপর্যন্ত তাতে উতরে স্বপ্নছোঁয়া হবে কিনা সেটি জানতে অবশ্য সোমবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে মুশফিকুর রহিমের দলকে। ইংল্যান্ডের ছুঁড়ে দেওয়া ২৮৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে যেয়ে এদিন ২৫৩ রান পর্যন্ত পৌঁছেছে বাংলাদেশ। হাতে ২ উইকেট নিয়ে ৩৩ রানের স্বপ্নছোঁয়া দূরত্বে স্বাগতিকরা।

রোববার জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৫৩ রান তুলে দিন শেষ করেছে বাংলাদেশ। উইকেটে ভরসা হয়ে আছেন সাব্বির রহমান ৫৭ ও তাইজুল ইসলাম ১১ রানে। চট্টগ্রাম টেস্টে ইংল্যান্ডের ছুঁড়ে দেওয়া ২৮৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে হলে নিজেদের সক্ষমতার সর্বোচ্চটাই ঢেলে দিতে হতো বাংলাদেশ দলকে। সেই পথে অনুপ্রেরণা যোগাতে সামনে ছিল একটি পরিসংখ্যানও। প্রতিপক্ষকে যে কয়বার দু’ইনিংসেই অলআউট করেছে টাইগাররা, হারেনি তার একটিতেও! আরেকবার সেই পরিসংখ্যান সমুন্নত রাখতে অবশ্য দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছে স্বাগতিকরা। তবে পথ এখনো অনেকটা বাকি। সেই বাকি পথটাই পাড়ি দিতে সাব্বিরের দিকে ভরসার চোখ রাখছে বাংলাদেশ।

তার আগে জয়ের ভিত্তিটা তৈরি হতে একটি স্বাস্থ্যবান জুটির প্রয়োজন ছিল। দলকে স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে ৮৭ রানের সেই জুটিটি গড়েছেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম ও অভিষিক্ত সাব্বির রহমান। ষষ্ঠ উইকেটে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানো এই জুটি গড়েছেন দুজনে। মুশফিক যখন নামেন তখনো জয় থেকে ১৪৬ রান দূরে বাংলাদেশ। আর যখন সাজঘরে ফেরেন তখন চাই ৫৯ রান। জয় হাতছাড়া হওয়ার দুশ্চিন্তা তাই ভালো করেই ঘিরে থাকছে টাইগার শিবিরকে। ফেরার আগে ৩৯ রানের দারুণ একটি ইনিংস খেলেছেন টেস্ট অধিনায়ক।

আর মুশফিকের জুটি সঙ্গী সাব্বির ৫৯ রানে থেকে পঞ্চম দিনের লড়াই শুরু করবেন। বাংলাদেশের হয়ে অভিষেকে চতুর্থ ইনিংসে ফিফটি ছোঁয়া প্রথম নামটি হওয়ার দিনে ৩ চার ও ২ ছয়ে নিজেকে মেলে ধরেছেন এই অভিষিক্ত ডানহাতি।

বাংলাদেশ এর আগে মাত্র ৮টি টেস্টে প্রতিপক্ষকে দুবার অলআউট করতে পেরেছে। যার ৭টিতে জয়ের পাশাপাশি অন্যটিতে ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল লাল-সবুজরা। চট্টগ্রাম টেস্টে সেটির পুনরাবৃত্তি করার সঙ্গে থাকছে অন্য একটি ইতিহাস গড়ার হাতছানিও। টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ ২১৫ রান তাড়ার রেকর্ড আছে বাংলাদেশের। সেটিও ২০০৯ সালের জুলাইয়ে, গ্রেনাডায় খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। তাতে জয় এসেছিল ৪ উইকেটে। স্পিনারদের স্বর্গ হয়ে ওঠা চট্টগ্রামে চতুর্থদিনেই সেই সংগ্রহকে টপকে গেছে মুশফিকরা। এখন পরীক্ষা সমাপ্তিটুকু টানার।

সেই পরীক্ষায় শুরুটা আশাজাগানিয়া হয়েও স্থায়িত্ব পায়নি তামিম ইকবালের দ্রুত ফিরে যাওয়ায়। প্রথম ইনিংসে এই বাঁহাতি ঝলমলে একটি ফিফটি উপহার দিয়েছিলেন। রোববারও ইমরুল কায়েসের সঙ্গে ৩৫ রানের উদ্বোধনী জুটি এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু ৯ রানের বেশি অবদান রাখতে পারেননি। মঈনের বলে শর্ট-লেগে ব্যালান্সকে ক্যাচ দেওয়ার আগের বলেই তামিমের বিপক্ষে রিভিউ নিয়ে অসফল হয়েছিলেন ইংলিশ অধিনায়ক কুক। পরের বলেই সাজঘরের পথ ধরে কুকের একটি রিভিউ নষ্টের মনকষ্ট লাঘব করেন তামিম।

ওয়ানডাউনে নামা মুমিনুল হককে সঙ্গী করে এরপর ইমরুল বড় কিছুর স্বপ্নই দেখাচ্ছিলেন। যথারীতি সেটা ছোট কিছুতেই বিসর্জন দিয়ে যান এই উদ্বোধনী। আক্রমণাত্মক হতে যেয়ে ৪৬ রানের জুটির পর রশিদের বলে রুটকে ক্যাচ দিয়েছেন ইমরুল। ফেরার আগে ৬ চারে ৬১ বলে ৪৩ রান যোগ করেছেন নামের পাশে।

এরপর ভালোই এগোচ্ছিলেন মুমিনুল ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। কিন্তু নিজেদের ইনিংসটাকে টেনে নিতে পারেননি কেউই। গ্যারেথ ব্যাটির বলে সুইপ করতে যেয়ে মুমিনুল উইকেট বিলিয়েছেন ব্যক্তিগত ২৭ রানে, পরে মারবো না ডিফেন্স করবো টাইপের শট খেলার দোটানায় ব্যাটির বলেই উইকেট খুইয়েছেন মাহমুদউল্লাহ (১৭)।

চার টপঅর্ডারকে হারিয়ে চাপ খানিকটা বাড়ার মাঝেই উইকেটে আসেন অধিনায়ক মুশফিক, অন্যপ্রান্তে সাবলীল ব্যাটিং করতে থাকা সাকিব। প্রথম ইনিংসের বাজে শটের প্রায়শ্চিত্ত করার প্রতিজ্ঞা নিয়েই নেমেছেন বলে মনে হচ্ছিল সাকিবকে! কিন্তু ১টি করে চার-ছয়ে ২৪ রানে যাওয়ার পরই দুর্দান্ত এক টার্নে তাকে সাজঘরের পথ দেখান মঈন।

এরপর মুশফিকের পথ ধরে অভিষেকেই বল হাতে চমক দেখানো মেহেদি হাসান মিরাজ (১) সাজঘরে ফিরলে ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। পেসার কামরুল ইসলাম রাব্বিও রানের খাতা না খুলে দলকে কোনো সাহায্য করতে পারেননি। বাংলাদেশের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের দিনে ইংল্যান্ডের হয়ে ৩টি উইকেট তুলে নিয়ে দিনের সফল ‘বুড়ো’ স্পিনার গ্যারেথ ব্যাটি। এছাড়া স্টুয়ার্ট ব্রড ও মঈন আলি ২টি করে উইকেট নিয়েছেন।

রোববার সকালে ২ উইকেট হাতে রেখে ২২৮ রান নিয়ে সংগ্রহটা বাড়াতে নেমে আর মাত্র ১২ রান যোগ করতে পেরেছে ইংল্যান্ড। স্টুয়ার্ট ব্রড ১০ রানে মিরাজের থ্রোতে রানআউটের ফাঁদে পড়ার পর ব্যাটিকে (৩) ফেরান তাইজুল। সফরকারীদের দ্বিতীয় ইনিংস থেকে আগের দিনই ৫ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন সাকিব; যেটি তাকে প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে টেস্টে ১৫০ উইকেট নেয়ার মাইলফলকে বসিয়ে দেয়। এছাড়া তাইজুলের ভাগে সেখানে ২টি ও ১টি করে ঝুলিতে পুরেছেন মিরাজ ও রাব্বি।

এর আগে বাংলাদেশকে প্রথম ইনিংসে ২৪৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে ৪৫ রানের লিড পাওয়া ইংলিশরা সাকিবের ঘূর্ণি জাদুর পরও শেষপর্যন্ত তাই বাংলাদেশের সামনে ২৮৬ রানে লক্ষ্য দিতে পেরেছে। নিজেদের প্রথম ইনিংসে ২৯৩ রান তুলতে গুটিয়ে গুটিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। তালগোল পাকিয়ে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ আড়াইশর আগে গুটিয়ে যাওয়াতেই চতুর্থ ইনিংসে লক্ষ্যটা এত বড় দেখাচ্ছে। নিজেদের প্রথম ইনিংসে তামিম (৭৬), মাহমুদউল্লাহ (৩৮), মুশফিক (৪৮), সাকিব (৩১) রানের ইনিংসগুলো যদি আরেকটু টেনে নিতে পারতেন, তবে রান তাড়ার ক্ষেত্রে এতটা চাপে পড়তে হতো না বাংলাদেশের।

আবার ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে ৬২ রানে সফরকারীদের প্রথম ৫ ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে পাঠানোর পর যদি ধারাবাহিকতাটা ধরে রাখা সম্ভব হতো, তাতেও লক্ষ্যটা আরো ছোট হতে পারতো। সেটি হয়নি বেন স্টোকস ও জনি বেয়ারস্টোর কৃতিত্বে। ষষ্ঠ উইকেটে এই দুজন ১২৭ রানের অনবদ্য জুটি গড়লে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ডের হয়ে স্টোকস সর্বোচ্চ ৮৫ রান করেন। এছাড়া বেয়ারস্টোর ব্যাট থেকে আসে ৪৭ রান।

চট্টগ্রামে প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডকে ২৯৩ রানে অলআউট করে দেওয়ার পথেও আছে অনেক পাওয়ার গল্প। মঈন (৬৮), বেয়ারস্টো (৫২), রুটদের (৪০) থামিয়ে দেওয়ার পথে অভিষিক্ত মেহেদি হাসান মিরাজ দারুণ বোলিংয়ে ইংলিশদের ৬ উইকেট তুলে নেন। যেটি সর্বকনিষ্ঠ বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি অভিষিক্ত টাইগার বোলার হিসেবে দ্বিতীয় সেরা বোলিং ফিগারের পাশে বসিয়ে দেয় এই তরুণের নাম। যার সবকিছু ডুবে গেলো পরাজয় নামের কালো-মেঘের আড়ালে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের পর সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে আগামী ২৮ অক্টোবর থেকে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে লড়বে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড। টেস্ট সিরিজের আগে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ১-২ ব্যবধানে সফরকারীদের কাছে পরাজিত হয়েছে মাশরাফি বিন মুর্তজার দল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর- (চতুর্থ দিন শেষে)

ইংল্যান্ড ১ম ইনিংস- ১০৫.৫ ওভারে ২৯৩/১০ (মঈন ৬৮, বেয়ারস্টো ৫২, রুট ৪০, কুক ৪, ওকস ৩৬; মিরাজ ৬/৮০, সাকিব ২/৪৬, তাইজুল ২/৪৭ ও দ্বিতীয় ইনিংস ২২৮/৮ (স্টোকস ৮৫, বেয়ারস্টো ৪৭, ডাকেট ১৫, মঈন ১৪, ওকস ১৯*; সাকিব ৫/৮৫, তাইজুল ২/৪১, মিরাজ ১/৫৮)
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস- ৮৬ ওভারে ১০/২৪৮ ( তামিম ৭৮, ইমরুল ২১, মাহমুদউল্লাহ ৩৮, মুশফিক ৪৮, সাকিব ৩১, সাব্বির ১৯; স্টোকস ৪/২৬, মঈন ৩/৭৫, আদিল ২/৫৮ ব্যাটি ১/৫১) ও দ্বিতীয় ইনিংস- ৭৮ ওভারে ২৫৩/৮ (ইমরুল ৪৩, মুমিনুল ২৭, সাকিব ২৪, মুশফিক ৩৯, সাব্বির ৫৯*, তাইজুল ১১*; ব্যাটি ৩/৬৫, মঈন ২/৬০, ব্রড ২/২৬)।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com