ডিজিটাল দেশ গড়ার প্রকল্পে জালিয়াতি! ৩৭৮ কোটি টাকা হরিলুটের শংকা

এই সংবাদ ৭৮ বার পঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক # তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ইনফো সরকার-৩ প্রকল্পে ৩৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দের পর আশা জেগেছিলো ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিতে। তৃণমূলপর্যায়ের মানুষকে ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য থাকলেও প্রকল্পটির পদে পদে ঘটে গেছে সুক্ষ্ম জালিয়াতির ঘটনা। অথচ ভিশন-২০২১ তথা ডিজিটাল দেশ গঠনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প এটি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগামী ২০ বছর পর্যন্ত দেশের দুই হাজার ৬০০ ইউনিয়নের মানুষকে ইন্টারনেট সেবা দিতে অনুমোদিত প্রকল্পটি আটটি প্যাকেজে ভাগ করে বাস্তবায়নের কথা। অথচ সেটি করা হচ্ছে মাত্র দুটি প্যাকেজে। উন্মুক্ত দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে কৌশলে প্রকল্পটিকে বাটোয়ারা করে দেওয়া হয়েছে মাত্র দুটি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানকে। এক্ষেত্রে এনটিটিএন লাইসেন্সের শর্তাবলী ও গাইডলাইন্স, সরকারের কোন নিয়ম-কানুনÑ কোন কিছুরই তোয়াক্কা করা হয়নি। এমনই একটি অভিযোগ সম্প্রতি দুদকে জমাও দেয়া হয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এ প্রতিবেদককে জানায়, সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড এবং ফাইবার এট হোম নামক দুটি প্রতিষ্ঠানের মাঝে প্রকল্পটি বাটোয়ারা করে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বড় রকমের দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে বলে একটি অভিযোগ সংস্থায় (দুদকে) জমা পড়েছে। দুদক অভিযোগটি খতিয়ে দেখছে বলেও জানান তিনি।

সূত্র জানায়, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী, কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার সরকার এবং প্রকল্প পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষের যোগসাজশে বড় জালিয়াতির ঘটনাটি চ’ড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে। বুধবার (৯ আগস্ট) সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে দুর্নীতিমাখা প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উঠতে যাচ্ছে। জালিয়াতির এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়ে গেলে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছে। অনুসন্ধান করে আরও জানা যায়, ইনফো সরকার-৩ প্রকল্পটি ২০ বছর মেয়াদি। অথচ যে দুটি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেওয়া হয়েছে, তাদের লাইসেন্সই আছে যথাক্রমে সাড়ে ছয় এবং সাত বছর। এক্ষেত্রে এনটিটিএন লাইসেন্সের শর্ত চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের।

২০ বছরের জন্য অবৈধ ব্যবসার লাইসেন্স!

নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইনফো সরকার-৩ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। অথচ গত ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় সাইবার এট হোম এবং সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেডের দুই প্রতিনিধি অভিন্ন সুরে দাবি করেন, আটটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করলে কাজের স্বাভাবিক গতি কমে যাবে। এ জন্য যেন তাদের দুই প্রতিষ্ঠানকেই কাজটি দেওয়া হয়। ৪৮৮ উপজেলার ২৬০০ ইউনিয়নে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজটি এ দুটি প্রতিষ্ঠানই বাগিয়ে নিতে সমর্থ হয়। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠান দুটির এনটিটিএন লাইসেন্সের মেয়াদ আছে যথাক্রমে সাড়ে ছয় এবং সাত বছর। অথচ অনুমোদিত প্রকল্পটি ২০ বছর মেয়াদি। সর্বোচ্চ সাত বছর মেয়াদ থাকা লাইসেন্স দিয়ে কি করে প্রতিষ্ঠান দুটো ২০ বছর মেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, তথাকথিত দরপত্রের প্রথমটিতে ২৪৭টি উপজেলায় ১৩০৭টি ইউনিয়নে ফাইবার এট হোম ১৮৯ কোটি ৯৪ লাখ ২০ হাজার ২৭১ টাকায় সর্বনিন্ম দরদাতা এবং সামান্য বেশি দর দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিন্ম দরদাতা হয় সামিট কমিউনিকেশন্স লিমিটেড। অন্য দরপত্রে ২৪১টি উপজেলায় ১২৯৩টি ইউনিয়নে ১৮৮ কোটি ৫২ লাখ ৩৫ হাজার ৪৮৫ টাকায় সামিট কমিউনিকেশন্স লিমিটেড সর্বনিন্ম দরদাতা এবং ফাইবার এট হোম সামান্য বেশি দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিন্ম দরদাতা হয়। সামগ্রিক বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করলেই দরপত্রের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ ছাড়া লাইসেন্সের শর্তানুযায়ী এনটিটিএন লাইসেন্সধারীদের ট্রান্সমিশন সুবিধা ভাড়া দেয়ার কথা। এদের ইন্টারনেট সেবাদানের সুযোগ নেই। আইএসপি বা ‘ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারা’ই কেবল ইন্টারনেট সেবা দিতে অনুমোদনপ্রাপ্ত।

এনটিটিএন লাইসেন্স নিয়েও কারসাজি

২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন্স ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) লাইসেন্স প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উন্মুক্ত লাইসেন্সিং পদ্ধতিতে ২০০৯ সালের ৭ জানুয়ারি প্রথমে ফাইবার এট হোম এবং একই বছরের ৯ ডিসেম্বর সামিট কমিউনিকেশন্সকে এনটিটিএন লাইসেন্স দেওয়া হয়। এরপর এনটিটিএন লাইসেন্স আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। নিয়ম মেনে বাংলা ফোন লিমিটেড, ম্যাঙ্গো টেলি সার্ভিসেস লি. এবং বি-কানেক্ট লি. এনটিটিএন লাইসেন্সের আবেদন করে। সরকারের সদয় বিবেচনায়ও ছিলো প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু অজানা কারণে অদ্যাবধি বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারাদেশে মাত্র দুটি বেসরকারি এনটিটিএন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের কাছে নেটওয়ার্ক ব্যবসা কুক্ষিগত থাকায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী আইএসপির মাধ্যমে দ্র”তগতির ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। তৃতীয় কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই লাইসেন্স না দেওয়ার ফলে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন অনেকটা দুরুহ হয়ে পড়েছে। এটি একদিকে দুটি প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া এবং অন্যদিকে সরকারকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করার পাঁয়তারা বলেও মনে করছেন অনেকে।

সূত্র জানায়, তিনটি প্রতিষ্ঠানকে এনটিটিএন লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের সবুজ সংকেতের আঁচ পেয়ে নড়েচড়ে বসে সামিট এবং সাইবার এট হোম। সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেনদরবার করে নতুন প্রতিষ্ঠানের নামে লাইসেন্স ইস্যু বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বহুদূর!

আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম নির্বাচনী ইশতেহার হলোÑ ডিজিটাল বাংলাদেশ। তারই অংশ হিসেবে সরকার বিভিন্ন দপ্তরকে ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় নিয়ে আসে। এখন সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই বিভিন্ন দরকারি কাজ সারতে পারছেন ইন্টারনেট সুবিধার মাধ্যমে। তবুও বিশ্ব সূচকে অনেকটা তলানিতেই বাংলাদেশের অবস্থান।

চলতি বছরের ৩ মার্চ ইকোনমিষ্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও ইন্টারনেট ওআরজি ডটকম-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষ ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গত বছরের ২৮ জুলাই আন্তর্জাতিক টেলিযোাগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবহারে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় পিছিয়ে রয়েছে। দেশটির মাত্র ১৪.৪ শতাংশ মানুষ ইন্টরনেট ব্যবহার করছে। এর আগেও গত বছর আইটিইউ এবং ইউনেস্কো প্রকাশিত ‘স্টেট অব ব্রডব্যান্ড ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ৬ শতাংশ, বা দেড় কোটির কিছু বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।

গত বছরের ১৬ মে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘ওর্য়াল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০১৬: ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে (সংযুক্তি-১) আইসিটি খাতের হতাশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, বেকার সমস্যা কবলিত বর্তমান বাংলাদেশের মাত্র আধা (০.৫) শতাংশ মানুষের আইসিটি খাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে। অথচ প্রতিবেশি ভারতে ও আফ্রিকার কেনিয়ায় আইসিটি খাতে ১ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যয় অনেক বেশি এবং ১৪ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে ‘অফলাইন জনগোষ্ঠি’।

এছাড়া মোবাইল ফোন অপারেটরদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘জিএসএমএ’র ‘এশিয়ায় ডিজিটাল সমাজ নির্মাণ’ শীর্ষক গত বছরের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠির ৩০ শতাংশ ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছে। যার মাত্র ১ শতাংশ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এবং বাকি ২৯ শতাংশই মুঠোফোন ভিত্তিক। ইন্টারনেট সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৩৩। ইন্টারনেট সংযোগে পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ফাইবার অপটিকের দুর্বল কাঠামো, সর্বত্র বিদ্যুৎ না থাকা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বিশ্বব্যাংক, ‘জিএসএমএ’ এবং আইটিইউ-ইউনেস্কোর এইসব প্রতিবেদন-গবেষণার সাথে সরকারি পরিসংখ্যানের পার্থক্য থাকলেও এটা স্বীকৃত যে, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষকে এখনও ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। রাজধানী ও বড় বড় শহরের মানুষ উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা পেলেও মফস্বল শহর, উপজেলা ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠিকে ধীরগতির মোবাইল ইন্টারনেট নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। ফলে দেশে ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ (বিভাজন) তৈরি হচ্ছে।

বিশেষ করে তৃতীয় কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এনটিটিএন লাইসেন্স না দেওয়ার কারণে দেশব্যাপী ইন্টারনেটের প্রসার দ্রুত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। তারা মনে করছেন, ইনফো সরকার-৩ প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কিছুটা হলেও বিশ্ব সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি হওয়ার কথা। কিন্তু মূল লক্ষ থেকে দূরে সরে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকল্প বণ্টন করে দেওয়ায় কাজের কাজ কিছুই হবে না। বরং এই প্রকল্পের মাধ্যমে জনগনের অর্থ হরিলুটের একটি সুযোগ তৈরি হলো।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com