আমাদের রাষ্ট্রপতি এবং মা-মাটি মানুষের কাহিনী

৬৩ বার পঠিত

গোলাম মাওলা রনি : আমাদের রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদকে আমি প্রথম দেখেছিলাম আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলে। এরশাদ জা্মানার তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ ছাত্র আন্দোলনের সেই দিনগুলোতে আমি থাকতাম স্যার এ এফ রহমান হলে। ছাত্রলীগ করার কারণে আমরা সময় পেলেই জহুরুল হক হলে যেতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলের ছাত্রলীগ কর্মীরা দল বেঁধে কারণে-অকারণে জহুরুল হক হলে আসতেন এবং হলের সামনে পুকুর পাড়ে অথবা পলাশী মোড়ে দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করতেন। তারা সবাই হলটিকে নিজেদের বাড়ি বলে ভাবতেন এবং হলের আবাসিক ছাত্রদের সৌভাগ্যবান বলে ঈর্ষা করতেন।

আমাদের রাষ্ট্রপতি ঢাকা এলে প্রায়ই জহুরুল হক হলে থাকতেন এবং ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সময় ও সুযোগ পেলে আড্ডা দিতেন। তিনি হল ক্যাম্পাসে লুঙ্গি পরে এত সাধারণভাবে চলাফেরা করতেন যা দেখে আমরা রীতিমতো অবাক হয়ে যেতাম। রাজনীতির ক্রমবিকাশে তিনি কিশোরগঞ্জের হাওর-বাঁওড় তথা ভাটিঅঞ্চলের মা-মাটি ও মানুষের নেতা থেকে যখন জাতীয় নেতারূপে জাতীয় সংসদের স্পিকার হলেন তখন সৌভাগ্যক্রমে তার সঙ্গে আমার প্রথমবার একান্ত সাক্ষাতের সুযোগ হলো। ২০১১ সালের কোনো সময়ে সংসদ চলাকালে তিনি খবর পাঠিয়ে আমাকে তার অফিসে ডেকে নিলেন। তার এত্তেলা পাওয়ার পর আমি রীতিমতো ভড়কে গেলাম। কারণ ওই সময়গুলোতে পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি, টেলিভিশনগুলোতে টকশো এবং সভা-সমিতি-সেমিনারে প্রদত্ত বক্তব্যের কারণে আমি প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হতাম যা আওয়ামী লীগে রীতিমতো অস্বস্তিকর মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত।

সংসদ চলাকালীন মাননীয় স্পিকার মহোদয়ের সার্জেন্ট অ্যাট আমর্সের একজন সদস্য আমার কাছে এসে বললেন— মাগরিবের পর স্পিকার মহোদয় আপনাকে দেখা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। এটা ছিল একটি নজিরবিহীন ঘটনা। সাদা পোশাকধারী সার্জেন্ট অ্যাট আমর্সের সদস্যরা স্পিকারের নির্দেশে যে কোনো সংসদ সদস্যকে গ্রেফতার অথবা সংসদ ভবন থেকে বের করে দিতে পারেন। তারা সব সময় অধিবেশন চলাকালীন স্পিকারের পাশে দণ্ডায়মান থাকেন এবং সাধারণত সংসদ লবি অথবা অধিবেশন হলে প্রবেশ করেন না। বাংলাদেশ সংসদের ইতিহাসে অবশ্য স্পিকার কর্তৃক কোনো সংসদ সদস্য বহিষ্কার অথবা গ্রেফতার হননি। কাজেই আমার কাছে সাদা পোশাকধারী স্পিকার মহোদয়ের দূত আসামাত্র আমি যতটা না ভড়কে গেলাম তার চেয়েও বেশি ভয় পেয়ে গেলেন সংসদে আমার পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধু-বান্ধবরা। তারা দশমুখে বাহারী ভয়-ভীতিমূলক কথাবার্তা বলে আমার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন।

বাদ-মাগরিব দুরু দুরু বুকে স্পিকার মহোদয়ের রুমে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং চোখে মুখে পরম বান্ধবের আন্তরিকতা ফুটিয়ে তুলে করমর্দনের জন্য হাতটি বাড়িয়ে দিলেন। তারপর বললেন— ‘সবাই স্পিকারের অফিসে আসেন। গত দুই বছর আপনি একবারও এলেন না। শুধু লেখালেখি এবং টকশো করলে হবে না— মাঝে মধ্যে এদিকেও আসতে হবে।’ তিনি আরও জানালেন, তিনি এবং ম্যাডাম অর্থাৎ স্পিকার মহোদয়ের স্ত্রী আমার টকশো দেখেন এবং পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধগুলোও নিয়মিত পড়েন। তারপর স্বভাবসুলৎ হাস্যরস করে বললেন— আমার উচিত ছিল আপনার কাছে গিয়ে কথাগুলো বলা। কিন্তু স্পিকার হিসেবে আমি তো যেতে পারি না। তা ছাড়া আমার স্ত্রী বললেন— রনি সাহেবের সঙ্গে তোমার জানাশোনা আছে কিনা! তাই তাড়াহুড়া করে আপনার সঙ্গে জানাশোনার পর্বটা শেষ করার জন্যই আপনাকে দাওয়াত দিয়ে এনেছি।

মাননীয় স্পিকার মহোদয়ের সঙ্গে সেদিনের সন্ধ্যায় কয়েক ঘণ্টা আড্ডা দেওয়ার সুযোগ নিয়েছিলাম। তিনি প্রাণখুলে বহু কথা বলেছিলেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংসদ থেকে শুরু করে নিজের নানা ব্যক্তিগত বিষয়ও আলোচনা করেছিলেন। বিদায় বেলা বলেছিলেন— মাঝে মধ্যে আড্ডা দিতে আসবেন। আমি উত্তরে বলেছিলাম— স্যার! অবশ্যই আসব এবং আমার লেখা কয়েকটি বই উপহার হিসেবে নিয়ে আসব। পরবর্তীতে আমি আর কোনো দিন স্পিকার অফিসে যাইনি এবং বইগুলোও দেওয়া হয়নি। স্পিকার মহোদয়ের সৌজন্যতা, ভদ্রতা এবং আমার প্রতি আপত্য স্নেহের আধিক্য আমাকে এতটাই বিহ্বল করে তুলেছিল যে, আমি দ্বিতীয়বার যদি এমনটি না পাই এই ভয়ে তার কাছে না গেলেও তাকে আমি হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছিলাম এক অনন্য মর্যাদায় এবং নিবিড় ভালোবাসায়, ফলে তিনি যেদিন রাষ্ট্রপতি হলেন সেদিন আমার খুশির কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না।

অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আমি কোনো দিন বঙ্গৎবনে যাইনি। পরবর্তীতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না কেনা, নির্বাচন বর্জন এবং দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কারণে বঙ্গৎবনে যাওয়াটাও আমার জন্য আগের মতো সহজসাধ্য ছিল না। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতি হিসেবে জনাব আবদুল হামিদ যথেষ্ট সুনাম, সুখ্যাতি অর্জন করার পাশাপাশি তার খোলামেলা সত্য ভাষণ, অনাড়ম্বর জীবন, মা-মাটি মানুষের জন্য দরদৎরা আকুতি, নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে সখ্য এবং রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে সাধারণ মানুষের জীবন যে তার খুব পছন্দ ইত্যাদি বক্তব্য প্রায়ই পত্রপত্রিকার শিরোনাম হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নজিরবিহীন রাষ্ট্রপতির সম্মান অর্জন করে ফেললেন। ফলে বর্তমানকালে তিনি দল-মত-নির্বিশেষে অনেকের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষে রূপান্তরিত হয়েছেন।

রাষ্ট্রপতির সার্বজনীনতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ভালো মানুষীর কারণে তাকে কেউ কেবল তার পূর্বসূরিদের মতো এককেন্দ্রিক এবং দলীয় রাষ্ট্রপতি মনে করেন না। অনেকে সম্মান করে তাকে আমাদের রাষ্ট্রপতি বলে সম্বোধন করেন। রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে আমার নিজেরও গর্বের শেষ নেই। যদিও তার সঙ্গে আমার একান্ত সাক্ষাৎ সাকুল্যে মাত্র একবার। তারপরও শ্রদ্ধা ভালোবাসার মূল কারণ হলো— আমি তাকে অন্তর থেকে ভালোবাসি এবং তিনিও আমাকে পছন্দ করেন। ফলে একান্ত ঘরোয়া পরিবেশে সময় সুযোগ হলে প্রায়ই মুখ ফুটে বলে ফেলি— মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক এবং তিনি আমায় খুব পছন্দ করেন। আমার এ বক্তব্য অনেকটা আত্মতৃপ্তিমূলক। বক্তব্যের পেছনে কোনো স্বার্থ বা হেতু নেই। একজন ভালো মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আছে এ কথার মাধ্যমে নিজের ভালোত্ব জাহির করার বালকসুলৎ ত্রুটি হয়তো থাকতে পারে— কিন্তু দুরভিসন্ধির কথা কল্পনাও করা যায় না।

গত তিনটি বছরে বহুজনের কাছে বহুবার বলেছি— রাষ্ট্রপতি আমায় স্নেহ করেন। কিন্তু কোনো দিন নিজের কথার প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু গত কয়েকদিন আগে ঢাকা জেলা বারের এক আইনজীবী বন্ধু অ্যাডভোকেট কবির হোসেনের কাছে কথা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতির গল্প করতে গিয়ে মহা মুসিবতে পড়ে গেলাম। তিনি রাষ্ট্রপতির মহাৎক্ত এবং তার শখ বঙ্গৎবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে একান্তে একটু সাক্ষাৎ করে দু-চারটি কথা বলা এবং তাকে সালাম করা। তিনি আবদার করলেন— যেভাবেই হোক আমি যেন তার মনের আশাটি পূরণ করার ব্যাপারে সাহায্য করি। অ্যাডভোকেট কবিরের কথা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবং নিজের জিহ্বা, ঠোঁট এবং অতি কথনকে অভিশাপ দিতে শুরু করলাম। আমার বার বার আফসোস হতে লাগল— কেন আমি ও কথা বলতে গেলাম। এখন যদি আমি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা না করতে পারি তবে কী হবে। আমি অ্যাডভোকেট কবিরকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বেচারা নাছোড় বান্দা— আমার কথাটি এমনভাবে বিশ্বাস করেছেন যে— আমার তখন রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ লাভের চেষ্টা করা ছাড়া উপায় রইল না।

বহু দ্বিধা-বহু সংকোচ এবং স্বভাবসুলৎ লজ্জার পাহাড় পেরিয়ে অবশেষে গত ৯ আগস্ট মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির এডিসির কাছে ফোন দিলাম একটি সাক্ষাৎকারের দিনক্ষণের জন্য। তিনি বিষয়টি রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করবেন বলে ফোন রেখে দিলেন। মঙ্গলবার দিনটি আমি খুবই ব্যস্ত সময় কাটাই। তার ওপর চ্যানেল আই থেকে জিল্লুর রহমান ফোন দিলেন ওইদিন সন্ধ্যা ৬টার সময় তৃতীয় মাত্রার অনুষ্ঠান রেকডিংয়ে অংশগ্রহণের জন্য। ঘটনার দিন আমি রোজা ছিলাম তাই জিল্লুর সাহেবকে বললাম ইফতার করাতে হবে। তিনি সানন্দে রাজি হলেন। এ ঘটনার একটু পর বঙ্গৎবন থেকে ফোন এলো। রাষ্ট্রপতির এডিসি জানালেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি সম্মতি দিয়েছেন। আজ বিকাল পৌনে ৫টার সময় সাক্ষাৎকারের জন্য নির্ধারণ করা আছে। আমি এডিসি সাহেবকে বললাম সাক্ষাতের তারিখটি কোনোমতে পেছানো যায় কিনা! কারণ আজ সন্ধ্যায় আমার টকশোর রেকর্ডিং রয়েছে আর হঠাৎ করে এত তাড়াতাড়ি সাক্ষাৎকারের সময় পাব এমনটি কল্পনাও করিনি। ফলে মানসিক প্রস্তুতি নেই। উত্তরে এডিসি বললেন— স্যার মহামান্য রাষ্ট্রপতি আপনার কথা শোনামাত্র তার অপর দুটি সাক্ষাৎকার বাতিল করে পুরো বিকালটাই আপনার জন্য বরাদ্দ রেখেছেন। আমি কথা বাড়ালাম না। শুধু বললাম আমার সঙ্গে আরও একজন মেহমান থাকবেন।

বঙ্গৎবন থেকে প্রাপ্ত সুখবরটি অ্যাডভোকেট কবিরকে জানালাম এবং পাখির গতিতে এক ঘণ্টার মধ্যে আমার অফিসে আসার জন্য বললাম। চ্যানেল আইয়ের জিল্লুর সাহেবকে ফোন করে রেকর্ডিং টাইম সাড়ে ৭টায় নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়ে নির্ধারিত সময়ে অ্যাডভোকেট করিবকে নিয়ে উপস্থিত হলাম বঙ্গৎবনে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার খাস কামরায় ডেকে নিলেন এবং ঠিক পূর্বেকার মতো আবেগ এবং উচ্ছ্বাস নিয়ে চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে করমর্দন করলেন। আমাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হলো, সবই অতীত স্মৃতির রোমন্থন। আমার মনে হলো মহামান্য রাষ্ট্রপতির বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তার স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনটিকেই তিনি সবচেয়ে বেশি আনন্দভুবন বলে মনে করেন। আমি জাতীয় সংসদের কিছু স্মৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতেই তিনি অতি উচ্চৈঃস্বরে হাসতে আরম্ৎ করলেন। ঘটনাগুলোর সঙ্গে আমার কিছুটা সম্পৃক্ততা থাকার কারণে আমিও প্রাণ খুলে হাসতে আরম্ৎ করলাম। আমাদের উচ্ছ্বসিত হাসির শব্দে মহামান্য রাষ্ট্রপতির দুজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা অযাচিতভাবে খাস কামরায় ঢুকে পড়লেন। তারা যতটা আশ্চর্য হয়ে কামরায় প্রবেশ করেছিলেন ঠিক তার চেয়েও বেশি আশ্চর্য হয়ে দ্রুত সেখান থেকে বের হয়ে গেলেন। অনুমান করলাম রাষ্ট্রপতির খাস কামরা থেকে তারা হয়তো ইতিপূর্বে এমন হাসির শব্দ শুনেননি। তাই শব্দ শুনে অনাহৃত আশঙ্কায় দেখতে এসেছিলেন এবং একটি চমৎকার দৃশ্য দেখার পর ফিরে গিয়েছিলেন।

কথা প্রসঙ্গে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জানালেন, গত তিন বছরে বঙ্গৎবনে যত দর্শনার্থী এসেছেন তা বিগত ত্রিশ বছরেও আসেনি। তার নির্বাচনী এলাকার খেটে খাওয়া মানুষগুলো লুঙ্গি পরে সরাসরি চলে আসেন বঙ্গৎবনে। সাধারণ দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ লাভের বিষয়টি আগের তুলনায় অনেক সহজ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে সাক্ষাৎ প্রার্থীদের লিখিতভাবে দরখাস্ত জমা দিতে হতো। অনেক আমলাতান্ত্রিক পথঘাট পেরিয়ে সেই দরখাস্ত রাষ্ট্রপতির টেবিলে আসতো অনুমোদনের জন্য। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাভের পর সাক্ষাতের দিনক্ষণ নির্ধারিত হতো। ফলে ইচ্ছা থাকাসত্ত্বেও খুব অল্পসংখ্যক লোক বঙ্গৎবনে রাষ্ট্রপতির একান্ত সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পেতেন। আমাদের রাষ্ট্রপতি অতীতের সেই জটিল নিয়মটি রহিত করে দিয়েছেন। এখন যে কেউ সরাসরি রাষ্ট্রপতির এডিসিকে ফোন করে তার সাক্ষাৎকার কামনা করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি আরও জানালেন, সাক্ষাতের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আকুতিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। কোনো দিন যদি দেখা যায় যে, বঙ্গৎবনের মূল ফটকে বিত্তবান লোকদের সঙ্গে লুঙ্গিপরা সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন সে ক্ষেত্রে লুঙ্গিধারী মেহমতি মানুষজনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাক্ষাতের জন্য ডাকা হয়।

আলাপ-আলোচনা এবং গল্প গুজবে প্রায় দেড় ঘণ্টা পার হয়ে গেল। মহামান্য রাষ্ট্রপতি বললেন— আপনার যখন ইচ্ছা চলে আসবেন। তারপর এডিসি সাহেবকে ডেকে বলে দিলেন তার ইচ্ছার কথা। এডিসি আমার ভিজিটিং কার্ড এবং ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর নিলেন। এবার ওঠার পালা। মহামান্য রাষ্ট্রপতি চেয়ার ছেড়ে তার টেবিলের অপর প্রান্তে এসে আমাদের সঙ্গে করমর্দন করলেন। দাঁড়ানো অবস্থায় তিনি আরও কিছু কথা বলার পর ডান হাত দিয়ে আমার ডান হাতটি চেপে ধরলেন এবং বাম হাতটি আমার কাঁধের ওপর রেখে পরম মমতায় জিজ্ঞাসা করলেন— এবার নমিনেশন কিনেননি কেন! উত্তরে আমি জানালাম অভিমান করে। তিনি স্বাভাবিক গলায় বললেন— রাজনীতিতে অভিমান ঠিক না। যে কাজগুলো বর্তমানে করছেন তা দলের ভিতরে থেকে করলে আরও বেশি ভালো হতো। তারপর বললেন— আমি আপনার নির্বাচনী এলাকায় একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির শেষের কথাগুলো আমাকে ভীষণভাবে আবেগতাড়িত করল। কারণ গত তিন বছরের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আমার নমিনেশন পেপার না কেনার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমি আমার অভিমানের কারণগুলো তাকে বললাম। তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে শুধু বললেন— অল্প বয়স! অভিমান হওয়াটাই স্বাভাবিক। তারপর তিনি এমন কতগুলো কথা বললেন যার উত্তরে আমি কিছুই বলতে পারলাম না। তিনি তখনো আমার একটি হাত ধরে রেখেছিলেন এবং নিজের অপর হাতটি দ্বারা আমার কাঁধের ওপর তার স্নেহের কর্তৃত্ব বহাল রেখেছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে অ্যাডভোকেট কবির রাষ্ট্রপতির পা ছুঁয়ে কদমবুচি করলেন। আমারও খুব ইচ্ছা হচ্ছিল একটু কদমবুচি করার। কিন্তু মহামান্য রাষ্ট্রপতির করদর্মনরত হাতের বন্ধন ছিন্ন করে চরণ দুটি স্পর্শ করে কদমবুচি করার সুযোগ নিতে সাহস পেলাম না। আমাদের রাষ্ট্রপতি আমার হাতখানি নিজের হাতের মধ্যে রেখে নিজের খাস কামরার সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসে বিদায় জানালেন।

বঙ্গৎবন থেকে ফেরার পথে গাড়িতে বসে আমার মন কিছুটা ভার হয়ে রইল। কারণ কথা প্রসঙ্গে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তার একটি চোখের গ্লুকোমা সংক্রান্ত রোগের যন্ত্রণা এবং নিজের বার্ধক্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে মৃত্যুর কথা স্মরণ করেছিলেন। আমার আরও মনে হতে লাগল মা-মাটি মানুষের আত্মার সঙ্গে মিশে যাওয়া একজন মানুষকে তার মূল সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মর্মর পাথরের বৃত্তে বন্দী হয়ে রাষ্ট্রীয় কায়দা-কানুনের কাছে নিজের সারা জীবনের আনন্দ-উল্লাস, উচ্ছ্বাস এবং অনুভূতি বিসর্জন দিতে হচ্ছে। আমি যখন এমনতরো এলোমেলো ভাবনায় ব্যস্ত ছিলাম তখন অ্যাডভোকেট কবির বলে উঠলেন— ‘আজ প্রথমবার বুঝলাম। আল্লাহ কেন একজন মানুষকে এত উপরে উঠিয়ে সম্মানিত করেন। জীবনে আর চাওয়ার কিছু নেই— বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি যে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন তা বাকি জীবনে কোনো দিন ভুলব না। লেখক : কলামিস্ট।

বিডিপ্রতিদিন

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com