আজ শুক্রবার, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ১লা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ সন্ধ্যা ৭:৪৩ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

টার্গেট মূল চেতনায় ।। কবীর চৌধুরী তন্ময়

সাম্প্রতিক গুপ্তহত্যা বা টার্গেট হত্যা নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। এই গুপ্তহত্যার বিরুদ্ধে খোদ জাতিসংঘের বিবৃতিও আমাদের নজরে এসেছে। কিন্তু বরাবরই গুপ্তহত্যাকারীরা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। টার্গেট হত্যার মিশনে মাঠ পর্যায়ের কিছু সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হলেও মূল পরিকল্পনাকারীদের এখনও শনাক্ত করতে পারেনি দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আর এই হত্যার পর কথিত বার্তা পাঠিয়ে জঙ্গি সম্পৃক্ততার কথা জানান দিয়ে হত্যার নেপথ্য উদ্দেশ্য অন্যদিকে পরিচালিত করাও একটা সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে।

এখন পর্যন্ত যত হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুলিশ সুপার বাবুল আকতারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুর ঘটনাটি। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ দায় স্বীকার করেনি। অথচ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বার্তা পাঠিয়ে দায় স্বীকারের বিষয়টি যেন একটা সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে।
বাংলাদেশে আইএস, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আল-কায়েদার ভারতীয় শাখা বা এই ধরনের কোনও জঙ্গি সংগঠন আছে কিনা তা প্রশাসনযন্ত্র এ ব্যাপারে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিষ্কার বলতে পারবে। তবে এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের আলোকে সাধারণ জনগণের মাঝে রীতিমতো এক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, এটা এখন আর লুকানোর বিষয় নয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককেই দেখেছি—প্রতিটি হত্যার পর কতিপয় মানুষ ওই হত্যাকে জায়েজ করার জন্য ইনিয়ে-বিনিয়ে খুন হওয়া লোকের অতীত নিয়ে শুরু করে কথা চালাচালি। সামাজিক যোগাযোগ তথা ফেসবুকে কখন কোন স্ট্যাটাস দিয়েছে, কখন কোন লেখায় ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়েছে কিংবা কার বিতর্কিত লেখায় লাইক-কমেন্ট করেছে তা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে বের করে নানান রঙে রাঙিয়ে গুপ্তহত্যাকারীদের পক্ষে এক ধরনের মৌন সমর্থন দিয়েছিল। আর যদি ব্লগার-লেখক হয় তাহলে তো কথাই নেই! শুরু হয় কতিপয় মিডিয়ার সঙ্গে স্যোশাল মিডিয়ার যোগসাজশে রঙ ছড়াছড়ি।

পাঠক, শুধু একটু অন্য রকম দেখা যাচ্ছে মিতুর হত্যাকাণ্ডটি। প্রচার মাধ্যমের সঙ্গে স্যোশাল মিডিয়াও বেশ সতর্ক। সতর্ক কথিত বার্তা প্রেরণকারী ইন্টেলিজেন্স সাইটও। হত্যার দায় স্বীকার না করে বরং আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ (একিউআইএস) শাখা নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়ে বলেছে, এ হত্যাকাণ্ড ইসলামে ‘অনুমোদনযোগ্য নয়’। এখানে একটু লক্ষ্য করলে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, জঙ্গি দমনে দেশজুড়ে পুলিশি সাঁড়াশি অভিযান কতটুকু যৌক্তিক তা এই অভিযানের একদিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইটটির এই বিবৃতিটি উল্লেখযোগ্য!

একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, ছয় মাসে চারজন ব্লগার খুনের পর এই ধরনের গুপ্তহত্যাকারী বা অপরাধীদের ধরতে না পারার মধ্যে ধর্ম নিয়ে লেখালেখি না করার পরামর্শ দিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেছিলেন, ‘যারা মুক্তমনা লেখেন, তাদের কাছে এবং আপনারা যারা আছেন, তাদের কাছে অনুরোধ, আমরা যেন সীমা লঙ্ঘন না করি। এমন কিছু লেখা উচিত নয় যেখানে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে, বিশ্বাসে আঘাত আনে।’ অন্যদিকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠিন ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের কথার বিপরীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করে ব্লগে বা অন্য কোনও মাধ্যমে লেখালেখি করলে তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আমরা দেখেছি, যারা ব্লগে লেখেন না বা ব্লগ সম্পর্কে  তেমন কোনও ধারণাও নেই এ রকম অসংখ্য ব্যক্তিকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল দেশের প্রখ্যাত ব্যক্তিদেরও। রাজশাহীতে শিক্ষককে জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল। কুড়িগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল। পুরোহিতকে হত্যা করা হয়েছিল। যদিও তাদের কোনও ব্লগে কোনও অ্যাকাউন্ট নেই বা আমার জানা মতে তারা কোনও ব্লগে লেখেন না। এমনকী পুলিশ অফিসারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুও কোনও ব্লগে লিখতেন বলে এই পর্যন্ত কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। তথ্য পাওয়া যায়নি যারা খুন হয়েছেন তারা কখনও কোনও ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন বা করতে সহায়তা দিয়েছেন।

এখানে একেবারেই স্পষ্ট বোঝা যায়, মুক্তমনা লেখক, অধ্যাপক, ব্লগার, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতা, ভিন্ন মতাবলম্বী কিংবা মিতুকে হত্যা করার জন্য একটা ভ্রান্ত বার্তা প্রয়োজন। আর সেটাই তারা ধর্মীয় অনুভূতি মিশ্রিত করে এই ধরনের গুপ্তহত্যাকে জায়েজ করার লক্ষে সমাজ ও রাষ্ট্রের দুর্বল লোকের সামনে উদ্ভট সংস্কৃতি প্রচলন করার ষড়যন্ত্র করছে। মূল সমস্যা আমাদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং ৭১-এর মতো মেধাবীদের তালিকা তৈরি করে দেশকে মেধাশূন্য করার নীল নকশা; যা ইতোমধ্যেই পরিস্থিতি উপলব্ধি করে তিন দেশ সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও চেতনাবোধ জাগানোর কথা বলেছেন।

গত ৭ আগস্ট, ২০১৫ ঢাকায় ঘরের ভেতর ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়কে হত্যার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানাবিধ সমালোচনার মুখে এই কথাগুলো যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বায়িত্ববান কর্তাব্যক্তিদের মুখ থেকে প্রকাশ পায়, তখন দেশের সাধারণ জনগণ সত্যিই অসহায় হয়ে পড়ে। আর অন্যদিকে উৎসাহ পায় অপরাধীরা, সংঘটিত অপরাধ অব্যাহত রাখে।

ব্লগার নীলয়ের ফেসবুক থেকে জানতে পেরেছি, একের পর এক ব্লগার খুন হওয়ার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থেকে থানায় জিডি করতে গেলে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তা সাধারণ ডায়েরি না নিয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন নীলাদ্রি চট্টোপধ্যায় নিলয়কে। আর এর সত্যতাও আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি খুন হওয়ার পর নিলয়ের বাসায় গিয়ে। যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান দ্বায়িত্ববান ব্যক্তি অপরাধীর বিরুদ্ধে তাদের করণীয় পদক্ষেপের কথা না বলে উল্টো সীমা লঙ্ঘন না করার পরামর্শ  দিয়ে সেখানে জুনিয়র পুলিশ অফিসার বা পুলিশ সদস্যের দোষ দিয়ে লাভ কী বলুন!

এসপির স্ত্রী মিতু হত্যার ধরন এক হলেও ঠিক কোন মতবাদ বা জীবনাদর্শ কিংবা কোন সীমা লঙ্ঘনের অপরাধ থেকে এ গুপ্তহত্যা করেছিল তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে বাবুল আক্তার সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার থাকাকালে জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তার গুরুত্বপূর্ণ অভিযান। বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার পর রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন ইউনিট এই হত্যাকাণ্ডটির ব্যাপারে গুরুত্বের সঙ্গে যেভাবে তৎপর রয়েছে তা, সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু একটু আফসোস হয়, এই তৎপরতা যদি আরও আগে গ্রহণ করা যেত, যদি ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়ের জিডিটি পুলিশ কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করত, যদি প্রথম হত্যার পর প্রশাসনযন্ত্র নড়েচড়ে বসত, তাহলে একের পর এক হত্যার মধ্য দিয়ে এই ধরনের হত্যার সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠত না।

এখানে সরকার ও সরকারের পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তাব্যক্তিদের উচিত হবে মূল সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী তাদের পরিচালিত অ্যাকশন অব্যাহত রাখা। যদিও শুধু পুলিশ বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা রাজনৈতিক জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ করা সম্ভব হলেও ধর্মীয় জঙ্গিবাদ একেবারেই বন্ধ করা ততটা সহজ হবে না। এক্ষেত্রে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এমনকি সামাজিক ঐকমত্য গড়ে তোলাও জরুরি। সমাজে যখন তারা নিপীড়িত হবে তখন তাদের তৎপরতা কমে যাবে।

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের প্রাণ কোনও অংক কষে তার মূল্য নির্ধারণ করা কখনোই সম্ভব হবে না। যার যায় সেই বুঝে হারানোর বেদনা। আজ আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভব নয় সাহসী পুলিশ অফিসার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজের সচেতন মহল চাইলে এসব হত্যকাণ্ড থামানে যেতে পারে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com