খালেদার টেবিলে ‘ভোট সরকার’ এর রূপরেখা

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রধান দাবি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার তথা ভোট সরকারের রূপরেখা তৈরির প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের’ এই রূপরেখা তৈরি করেছেন। কয়েকদিন আগে বিশেষজ্ঞ কমিটি তাদের তৈরি রূপরেখার একটি খসড়া কপি বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে হস্তান্তর করেছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট কমিটির অন্যতম সদস্য ও দলের প্রভাবশালী একজন ভাইস চেয়ারম্যান সহায়ক সরকারের রূপরেখার অগ্রগতির এ খবর নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সিনিয়র নেতা বলেন, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারনী ফোরামের সদস্যগণ ও একাধিক সিনিয়র নেতা এবং জোটের শীর্ষ নেতাদের সাঙ্গে বিশদ আলোচনা-পর্যালোচনা করে রূপরেখা চূড়ান্ত করবেন জোট নেত্রী খালেদা জিয়া। এরপর এই রূপরেখা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের কাছে পেশ করা হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা দেশবাসীর কাছে প্রকাশ করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার পরিবর্তন চায় উল্লেখ করে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তন চাই। কিন্তু এখন কথাও বলতে দেয়া হচ্ছে না। কোথাও ১০ জন বসলেই বলা হয় নাশকতার চক্রান্ত? জাতীয় নির্বাচনের জন্য অবশ্যই নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন দরকার। তাছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’ গতকাল বুধবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব এসব কথা বলেন।

এছাড়া দলটির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন একই প্রসঙ্গে বলেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার হলে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুত। আমরা মনে করি, বর্তমান সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতি ও জুলুম-নির্যাতনের কারণে দেশের জনগণ অতিষ্ঠ। তাদের জনসমর্থন এখন একেবারে তলানিতে বলা যায়। এ অবস্থায় অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সরকারের ভরাডুবি নিশ্চিত। তাই অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন আদায় করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। নির্বাচন এবং নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের আন্দোলনের সার্বিক প্রস্তুতি চলছে।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন বিশেষ সম্পাদক প্রসঙ্গক্রমে জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা ও সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে দলের পৃথক আরো তিনটি টিম কাজ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন এবং ভারতের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি আদায় এ টিমের মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

দলীয় একটি সূত্র জানায়, আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নীবিড় যোগাযোগ রক্ষা করছেন বিএনপির চারজন সিনিয়র নেতা। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি নিয়ে তারা এসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নানান আলোচনা-পর্যালোচনা করছেন। ভোট সরকারের দাবি নিয়ে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট এসব নেতারা কাজ করছেন। পাশাপাশি ভোট সরকারের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তুলতে নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে পর্যালোচনার জন্যও পৃথক কমিটি গঠিত হয়েছে।

এসব কমিটি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দাবি তুলে ধরে জনমত তৈরি করবে। একই সঙ্গে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি এবং প্রচারণার কৌশলও নির্ধারণ করবে। এছাড়া বিএনপি প্রতিটি বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদককে সদস্য সচিব এবং কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সিনিয়র নেতাকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটি প্রতিটি বিভাগের সাংগঠনিক রিপোর্ট এবং জাতীয় নির্বাচনের বিষয় সার্বিক তত্ত্বাবধান করে তা দলের চেয়ারপারসনকে অবিহিত করবে।

এদিকে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে দলের ভেতরে নানামুখি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। অন্তত ২০০ আসনে প্রার্থী হিসেবে সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা নির্বাচন করার সম্ভাবনাই বেশি। বাকি ১০০ আসনে নতুন মুখ খোঁজা হচ্ছে। বিতর্কিত সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের নির্বাচনের বাইরে রাখা হতে পারে। বার্ধক্যের কারণেও বেশ কয়েকজন প্রবীণ নেতার আসনে নতুন মুখ আসবে। সে ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতার পাশাপাশি নারীদের এসব আসনে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। তবে সব আসনেই একাধিক বিকল্প প্রার্থী বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। আসনপ্রতি তিন-চার জন প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে। দলীয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একাধিক তৃণমূল নেতার সঙ্গে আলাপকালে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি নেতাদের এলাকায় গিয়ে সময় দিতে বলেছেন। তৃণমূলের অনেক নেতা রাজধানীর গুলশান কার্যালয়ে বারবার আসা-যাওয়া করায় বিএনপি চেয়ারপারসন তাদের ধমকও দিয়েছেন। দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও এ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। জেলা পুনর্গঠনের দায়িত্বে থাকা নেতাদেরও কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ আগামী জাতীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়টি বিবেচনায় আনতে নির্দেশ দিয়েছেন খালেদা জিয়া।

দলের তৃণমূল গোছানো : সাংগঠনিক পুনর্গঠন কমিটি ইতোমধ্যে সারাদেশে জেলা পর্যায়ের কমিটি গঠনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের তত্ত্বাবধানে এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের নেতৃত্বে এ কমিটি কাজ করছে। জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে একটি খসড়া কমিটি তৈরি করে দলীয় চেয়ারপারসনের কাছে তা পেশ করা হচ্ছে। এরপর চেয়ারপারসন সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিটি জেলা কমিটি চূড়ান্ত করছেন।

এ প্রসঙ্গে দল পুনর্গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নানান প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে আমরা দল পুনর্গঠনের কাজ করছি। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা, রয়েছে সরকারের প্রতিবন্ধকতা। তারপরও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। খুব শিগগিরই আমাদের দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ হবে। এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলের ঐক্য ও সংহতি আরো দৃঢ় হচ্ছে। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক অবস্থা আরো শক্তিশালী হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
৬৬ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com