শিয়ালকে বাঘের চামড়া পরালেও শিয়ালই থাকে : নৌমন্ত্রী

১১৪ বার পঠিত

শেয়ালের গায়ে বাঘের চামড়া পরানো হলেও সে শেয়ালই থাকে বলে মন্তব্য করেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি বলেছেন, তিনি মন্ত্রী হন আর যাই হন, শ্রমজীবী-পেশাজীবী সংগঠন, নিম্ন আয়ের মানুষদের পক্ষে কথা বলতে পারেন। আজ শনিবার দুপুরে খুলনা হাদিস পার্কে গ্রামপুলিশের বিভাগীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন নৌমন্ত্রী।

শাজাহান খান বলেন, ‘বাঘের চামড়া শেয়ালের গায়ে পরিয়ে দিলে কি শেয়াল বাঘ হবে? সেই শেয়াল শেয়ালই থাকবে। আমি মন্ত্রী হই আর যাই হই, শ্রমজীবী-পেশাজীবী সংগঠন, নিম্ন আয়ের মানুষ যারা তাদের পক্ষে কথা বলতে পারি, মন্ত্রী না হয়েও কথা বলতে পারি। আর মন্ত্রী যখন ছিলাম না তখন আন্দোলন করেছি, এখন আমি শ্রমজীবী মানুষের জন্য আমার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট যাঁরা মন্ত্রী থাকেন, তাঁদের সঙ্গে কাজ করি, কথা বলি।’

ঢাকায় তাঁর বাসায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের বৈঠকে পরিবহন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি নৌমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি শ্রমিক নেতা। আজকে শুধু নয়, যখন এমপি ছিলাম তখনো আমার বাড়িতে মিটিং হয়েছে। এই যে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কথা বললাম, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দের কথা বললাম, এই যে জ্বালাও-পোড়াওয়ের বিরুদ্ধে যত আন্দোলন সেই সব মিটিং কিন্তু মূলত আমার বাড়িতে হয়েছে। এমনকি গার্মেন্টস সেক্টরে যে কিছু দিন আগে আশুলিয়ার ঘটনাটা ঘটল সেই মিটিংটাও কিন্তু আমার বাড়িতে চারজন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে হয়েছে।’

শাজাহান খান আরো বলেন, ‘শ্রমিক নেতা হিসেবে আমার বাড়িতে তো মিটিং হতেই পারে। আমি শ্রমিকদের অত্যন্ত কাছের লোক। এক-দুই বছর নয়, ৪৬ বছর আমি ট্রেড ইউনিয়ন করি। আমি কি পারব এই শ্রমিকদের সমস্যাগুলোকে অ্যাভয়েড (দূরে থাকা) করতে? সম্ভব নয়।’ নৌমন্ত্রী বলেন, ‘যখনই শ্রমিক সেক্টরে কোনো সমস্যা হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিন্তু আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন এগুলো সমাধান করার জন্য। আমি মনে করি যে আমার দায়িত্ব আমি পালন করেছি। হয়তো মানুষের কিছুক্ষণ ভোগান্তি হয়েছে, কষ্ট হয়েছে এই জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে। আমি মনে করি, আইনের দিক থেকে যেটা করণীয় আমরা সেটা করব এবং আমরা আশা করি যে বিজ্ঞ আদালত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবেন।’

শাজাহান খান বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হলো, যাঁরা এগুলো নিয়ে কথা বলছেন তাঁরা আসলে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে যে কথা বলেন, সত্য যেটি সেটা যেন আপনারা বলেন। অকারণে কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করার জন্য আমি তাঁদেরকে বিনীত অনুরোধ জানাব।’ এর আগে ভবতোষ বিশ্বাসের সভাপতিত্বে গ্রামপুলিশের বিভাগীয় সম্মেলনে ব্ক্তব্য দেন সংসদ সদস্য গাজী ম ম আমজাদ হোসেন, গ্রামপুলিশের প্রধান সমন্বয়কারী রাজেকুজ্জামান রতন, সাবেক পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিন, খুলনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদ, খুলনার জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান প্রমুখ।

চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার মামলায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন মানিকগঞ্জের একটি আদালত। এর প্রতিবাদে ওই দিন থেকে চুয়াডাঙ্গা জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবহন ধর্মঘট শুরু করে চুয়াডাঙ্গা জেলা বাস-ট্রাক সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন। এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় পরিবহন ধর্মঘট শুরু করে খুলনা বিভাগীয় আঞ্চলিক সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন।

ওই ধর্মঘট প্রত্যাহারে ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে ঢাকার বাসায় বৈঠকে বসেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। বৈঠক চলার সময় তাঁরা খবর পান ঢাকার সাভারে ট্রাকচালক মীর হোসেন মিরুকে ২০০৩ সালে ট্রাক চাপা দিয়ে এক নারীকে হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। ওই বৈঠকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবহন ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এরপর থেকে সারা দেশে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে রাস্তায় বের হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ। ২৮ ফেব্রুয়ারি নৌমন্ত্রী শাজাহান খান সাংবাদিকদের জানান, পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট নয়, তাঁরা স্বেচ্ছায় অবসরে গিয়েছেন।

নৌমন্ত্রী শ্রমিকদের ধর্মঘটকে ‘অবসর’ বললে তাঁদের তাণ্ডব চলে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে। তাঁরা কোনো বাস-ট্রাক চালাতে দেননি, ভাঙচুর করেছেন। অন্য শ্রমিকদের মারধর করেছেন। তাঁদের হাত থেকে রেহাই পাননি ব্যক্তিগত গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সের চালকরাও। ওই সব গাড়িও ভাঙচুর করেছেন। গাবতলীতে ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতভর তাণ্ডব চালান শ্রমিকরা। পুলিশের গাড়ি ও রেকারেও হামলা চালানো হয়। ১ মার্চ গাবতলীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে হয়। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

ধর্মঘটের বিরুদ্ধে জনরোষ তীব্র হলে কোনো শর্ত ছাড়াই প্রত্যাহার করে নেন পরিবহন মালিক শ্রমিকরা। নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ১ মার্চ বেলা ৩টায় শ্রমিকদের যানবাহন চালানোর অনুরোধ করার পরপর সারা দেশে গাড়ি চলাচল শুরু হয়। এরপর ওই দিন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ শ্রমিক পরিবহন ফেডারেশনকে অবৈধ সংগঠন বলে আখ্যা দেয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ। শাজাহান খানকে পদত্যাগ করারও দাবি জানায় তারা।

সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলী বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ করব একদিকে মন্ত্রী আরেকদিকে ফেডারেশনের নেতা আপনি থাকতে পারেন না। সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং একটি সংগঠনের দায়িত্বে থাকার কোনো বিধান আছে বলে আমার জানা নেই।’

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com