নির্বাচনী হাওয়া লেগেছে আওয়ামী লীগে

নির্বাচনী হাওয়া লেগেছে আওয়ামী লীগে। আগাম নির্বাচন হবে কি হবে না, এ নিয়ে বেশ আগে থেকেই নানা গুঞ্জনের ডালপালা মেলে আছে। তবে সংবিধান মতে সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে এর দুই বছর আগেই ক্ষমতাসীন দলে নির্বাচনী তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে দলটি। এ জন্য দলের পক্ষ থেকেও নানা কৌশল হাতে নেয়া হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে জেলা-উপজেলাসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে চষে বেড়াচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

তৃণমূল পর্যায়ে কোন্দল মিটিয়ে দলকে সুসংগঠিত করতে জোরালোভাবে তাগিদ দেয়া হচ্ছে। একই সাথে নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার পাশাপাশি নেতারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরছেন দল ও দলের বাইরের নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে। এ ছাড়া দলের নেতাকর্মী এবং জনপ্রতিনিধিদের আগের ভুলভ্রান্তি শুধরিয়ে সামনের দিনে বিতর্ক এড়িয়ে চলতে ইতোমধ্যে কঠিন বার্তা দেয়া হয়েছে এবং জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হাইকমান্ড নির্দেশ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, গত অক্টোবরে দলের জাতীয় সম্মেলনে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের নির্বাচনমুখী হওয়ার নির্দেশ দেয়ার পরই কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠ প্রস্তুত করতে তৎপরতা শুরু করেছেন। এরপরই নতুন কমিটির কার্যনির্বাহী বৈঠকসহ একাধিক বৈঠকে দলীয় সভাপতি নির্বাচনী ইশতেহার প্রস্তুতকরণ ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য জোরালোভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ২০তম জাতীয় সম্মেলনের পর থেকেই মূলত নেতাকর্মীরা নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছেন। নির্বাচন কবে হবে এ বিষয়ে কোনো বার্তা না দিলেও আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন, এটাই যথেষ্ট মনে করে কেন্দ্রীয় নেতা, বর্তমান ও সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠ তৈরি করার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এবারের সম্মেলনেও নির্বাচনকে সামনে রেখে কমিটি সাজানো হয়েছে। কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী এমপিকে রাখা হয়নি, অনেকেই বাদ পড়েছেন। এরপরেই নেতাকর্মীসহ দলের জনপ্রতিধিনিদেরও সতর্ক বার্তা ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনোভাবেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করবে না দলটি, এ বিষয়েও কড়া হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকির জন্য আওয়ামী লীগ আটটি বিভাগীয় টিম গঠন করেছে। চারজন যুগ্ম সম্পাদকের প্রত্যেককে দুইটি বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করে তৃণমূলে কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে তখন থেকেই নড়েচড়ে বসেছেন সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা। আর সুযোগ পেলেই কেন্দ্রীয় নেতা, এমপি-মন্ত্রীরা সংশ্লিøষ্ট এলাকায় গিয়ে নেতাকর্মীদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করছেন, তাদের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। তারা অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা সমাবেশ, মতবিনিময় কর্মসূচিতে। সামাজিক কর্মকাণ্ডেও বেড়েছে তাদের তৎপরতা। এ মাসেই দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মদ ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এ কে এম এনামুল হক শামীমসহ প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রীরা নিজের নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে দফায় দফায় ঘরোয়া বৈঠক, মতবিনিময় সভা করেছেন।

এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের সুনজর পেতে চেষ্টা করছেন নানাভাবে। দলীয় সভাপতির এ নির্দেশের পরই সামনের নির্বাচনকে টার্গেট করে সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা জেলা সফর শুরু করেছেন। তবে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পরই ওবায়দুল কাদের তৃণমূল চষে বেড়াচ্ছেন। বিশাল বহর নিয়ে তৃণমূলকে চাঙা করতে কখনো কখনো নিজের নির্বাচনী এলাকা নোয়াখালীসহ জেলা-উপজেলায় সফর করছেন। আবার কখনো একা একা ছুটছেন, সভা সমাবেশ করছেন। তৃণমূলের দ্বন্দ্ব নিরসন করে আগামী নির্বাচনের জন্য জোরালোভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সার্বিক নির্দেশনাও দিচ্ছেন নতুন কমিটির এ সাধারণ সম্পাদক। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সফরকালে ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই বছর বাকি আছে এবং এর প্রস্তুতি চট্টগ্রাম থেকে শুরু হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে সারা দেশে দলের অভ্যন্তরে থাকা সমস্যা সমাধান করে ছয় মাসের মধ্যে অঙ্গ সংগঠনের সম্মেলন শেষ করা হবে। তিনি আরো বলেন, যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন, জনপ্রিয়তা ও সততার কারণে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। একইভাবে সারা দেশের সব নির্বাচন ও বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থিতা ওইভাবে পছন্দ করা হবে। প্রার্থীর কোনো অনিয়ম অপকর্ম কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক সদস্য জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ইমেজের প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য আগে থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। দল ও সরকারের একাধিক মাধ্যমে প্রার্থীদের বিষয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে প্রার্থীদের একটি সম্ভাব্য খসড়া তালিকা করা হবে নির্বাচনের আগেই। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি কৌশলও অবলম্বন করা হচ্ছে। জেলা জেলায় মতবিনিময় সভা ডাকা হচ্ছে। ওই সভা থেকে প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। তৃণমূলের মতামতকে এবার গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনতে চাইছে দলটি। সম্প্রতি ধানমন্ডিতে অনুষ্ঠিত ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের মতবিনিময় সভায় নবম জাতীয় সংসদের এমপি নির্বাচন ও বর্তমান এমপি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় নেতারা। তাদের মতে, উড়ে এসে জুড়ে বসাদের এমপি বানিয়ে দলের ত্যাগী নেতাদের কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে। যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করায় দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করার পরামর্শ দেন ওই নেতারা।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সেই বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। এ দিকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কার্যক্রম বিগত দিনে ধানমন্ডির কার্যালয় থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে এবার ধানমন্ডির কার্যালয়ের পাশে পৃথক একটি ভবন নেয়া হয়েছে। ওই ভবন থেকেই বৃহৎ পরিসরে ব্যাপক কলেবরে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করবে দলটি। এখান থেকেই সারা দেশের নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা ও পর্যবেক্ষণ করা হবে। অবশ্য নির্বাচনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক কমিটি গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। এর আগেই ওই কার্যালয়ের রুমগুলো বণ্টন করে দেয়া হবে।

আওয়ামী লীগের মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, সভানেত্রী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে ইতোমধ্যে নির্দেশ দিয়েছেন, দল সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। লক্ষ্য করবেন, আগামী নির্বাচনের লক্ষ্যেই সব নেতা, দলের এমপিরা আগের চেয়ে এলাকায় যাতায়াত বাড়িয়ে দিয়েছেন। জনসম্পৃক্ততামূলক কাজে অংশ নিচ্ছেন। বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমরা চাই সব দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হোক। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র আরো সুসংহত হবে। বিএনপি গত নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আমরা আশা করি, এবার সেই রকম সিদ্ধান্ত নেবেন না। নির্বাচনে অংশ নিয়ে গণতন্ত্রের ভিতকে আরো মজবুত করার জন্য কাজ করবেন।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার ধারণা আগাম নির্বাচন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলছেন, এটা আসলে ২০১৮ সালের শেষের দিকে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ওই নির্বাচনে প্রস্তুতির জন্য। সরকারের কাছে এমন তথ্য আছে, এবার নিশ্চিত বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে। গত নির্বাচনে না গিয়ে যে ভুল করেছে এবার সেই ভুল বিএনপি করবে না। নির্বাচনে বিএনপি একটি অন্যতম ফ্যাক্টর। এটা জেনেই আওয়ামী লীগ আগেভাগেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
১১৭ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com