থমকে গেছে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড

থমকে গেছে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনসহ ভবিষ্যৎ রাজনীতির কর্মপন্থা নির্ধারণ নিয়েও দলটির মধ্যে চলছে এক ধরনের স্থবিরতা। নতুন নির্বাচন আদায়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামা তো দূরের কথা দাবি আদায়ে দলটি একটি কার্যকরি রাজনৈতিক রোডম্যাপ তৈরি করতে পারছে না। এমনকি নতুন নির্বাচন আদয়ের কর্মকৌশল নির্ধারণে দলটির ভেতরে কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। বিএনপির এমন পরিকল্পনাহীন রাজনীতিতে দলটির সাধারণ নেতাকর্মী ও সর্মথকরা হতাশ।

পবিত্র হজ পালন শেষে ২২ সেপ্টেম্বর দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দেশে ফিরেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি তিনি। এমনকি জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও তার কোনো বৈঠক হয়নি। নিয়মিত গুলশান কার্যালয়ে অফিসে বসা ছাড়া তেমন কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিও তার নেই। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের দুই-তিনজন শীর্ষ নেতা নিয়মিত দুই-একটি সভা, সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছেন। ব্রিফিং করছেন। এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ বিএনপির রাজনীতি।

জানা গেছে, দায়িত্বশীল শীর্ষ নেতাদের দু-একজন ছাড়া অধিকাংশই নেতাই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। এমনকি অনেকেই চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। চেয়ারপার্সন না ডাকলে এখন অনেকেই আর গুলশান কার্যালয়মুখী হন না। কাউন্সিলকে সামনে রেখে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে যে উদ্দীপনা দেখা গেছে তাও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেছে। হতাশা থেকে সক্রিয় নেতাকর্মীরাও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন। বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, মূলত সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনে যেতে পারছে না। জানা গেছে, কর্মসূচি দিলে তা বাস্তবায়ন হবে কিনা এমন সংশয় থেকে রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো ইস্যুতে কর্মসূচি দিতে ভয় পাচ্ছে বিএনপি হাইকমান্ড।

পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে বিএনপি ১৯ মার্চ তাদের দলীয় কাউন্সিল সম্পন্ন করে। কাউন্সিলের চার মাসেরও বেশি সময় পর দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটি ঘোষণার পর যেখানে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর কথা সেখানে দেখা যায় উল্টো চিত্র। কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের যে উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল তা ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নিয়েছে। শুধু বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি নয় অঙ্গসংগঠনগুলোর অবস্থাও একই। নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের পর দলের অঙ্গসংগঠনগুলো ঢেলে সাজানোর কথা থাকলেও সেই প্রক্রিয়াও থমকে পড়েছে। অনেক দিন ধরে অঙ্গসংগঠনের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করার আলোচনা থাকলেও শুধু জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নতুন কমিটিই ঘোষণা করা হয়েছে। সেই কমিটিও ঘোষণা করা হয়েছে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ যেদিন মারা গেলেন সেদিন। এ নিয়েও নেতাকর্মীরা দফতরের ওপর বিরক্ত। তাদের মতে, এতদিন কমিটি না দিয়ে যেদিন হান্নান শাহ মারা গেলেন সেদিনই কেন নতুন কমিটি দিতে হবে। যেখানে হান্নান শাহর মৃত্যুতে দলের নেতাকর্মীরা শোকাহতÑ এমন দিনে কমিটি দিয়ে দফতর দায়িত্বহীন কাজ করেছে। সাধারণ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এভাবেই লেজেগোবরে অবস্থায় বিএনপির মতো একটি বড় দলের দফতর চলছে।

২৭ সেপ্টেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। জানা গেছে, প্রভাবশালী নেতাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির গ্যাঁড়াকলে আটকে পড়েছে ঢাকা মহানগর, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক, মুক্তিযোদ্ধা, কৃষকদলের পুনর্গঠন। প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের অনুগত লোক দিয়ে এসব কমিটি গঠন করতে চাইছেন। গুলশান কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, নেতাদের এমন আচরণে স্বয়ং চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াও তাদের ওপর ক্ষুব্ধ। অঙ্গসংগঠনগুলোর পুনর্গঠন নিয়ে সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আমার কাছে কোনো খবর নেই। পুনর্গঠনের বিষয়গুলো দেখভাল করেন আমাদের চেয়ারপার্সন। অঙ্গসংগঠন ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে। সময়মতো নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।

জানা গেছে, কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হলেও ইস্যুভিত্তিক উপ-কমিটিগুলো গঠনের উদ্যোগ এখনো শুরুই হয়নি। বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিলে ইস্যুভিত্তিক উপকমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এমনকি এক নেতার এক পদের বিধানও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ডজনখানেক নেতা এক পদ ছাড়লেও মির্জা আব্বাসসহ অনেকেই এখনো একাধিক পদ আঁকড়ে আছেন। শুধু অঙ্গসংগঠন নয়, রয়েছে জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন নিয়েও জটিলতা। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠনের দেখভালের দায়িত্বে নেই দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অথচ দলের মহাসচিব হিসেবে সেই দায়িত্ব তার পালনের কথা। কিন্তু চেয়ারপার্সন জেলা পর্যায়ের কমিটি গঠন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনে সাংগঠনিক দায়িত্ব দিয়েছেন ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের ওপর। এ নিয়েও দলের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

গুলশান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হোমওয়ার্ক শুরু করেছেন। জানা গেছে, অতীতের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে আগামী নির্বাচনের জন্য একটি রোডম্যাপ নির্ধারণে বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে প্রতিবেদন তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছেন। সূত্র জানায়, যে কোনো মূল্যে বিএনপি আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়। সেজন্য আগে থেকেই সেই প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি হাইকমান্ড। এ দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার পর বিএনপি চেয়ারপার্সন যে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন সেই প্রক্রিয়াও ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ২০ দলীয় জোটের বাইরে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা হলেও তা খুব একটা ফলপ্রসু হয়নি।

বিএনপির রাজনীতির পরিকল্পনার বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহাবুবুর রহমান বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা রয়েছে এটা সত্যি। কিন্তু বর্তমান সরকারের দমন-পীড়নের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। তিনি বলেন, আমরা একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। জনগণেরও প্রত্যাশা সেটাই। এখন আমাদের দাবি আদায়ের একটি কৌশল বের করতে হবে। আমরা সব মত-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই তা নির্ধারণ করব।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২৬ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com