উবার, পাঠাও, চলো-এ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা

১৬৯ বার পঠিত

এমদাদুল হক তুহিন ॥ কাওরানবাজারের একটি মার্কেটে অবস্থান করছি। হঠাৎ জানতে পারি ভাগ্নি অসুস্থ। পাঠাও’র মোটরসাইকেলে চড়ে অল্প সময়ের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছে যাই।’-কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দা ইকরাম উদ্দিন আবির। আর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান উবারের ট্যাক্সি ব্যবহারকারী আমিনুল হক পলাশ বলেন, ‘সিএনজি চালকদের এই দৌরাত্ম্যের দিনে মধ্যবিত্তের জন্য উবার অনেকটাই আশীর্বাদ। ভাড়া নিয়ে চালকের সঙ্গে তর্কাতর্কি নেই, গন্তব্য নিয়েও চালকের কোন বাহানা নেই। এরচেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে।’ শুধু আবির ও পলাশই নয়, রাজধানীর অসংখ্য যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা ব্যবহার করে তারা সন্তুষ্ট। কেউ কেউ সেবা প্রদানকারীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। হাতের মুঠোয় পাওয়া ট্যাক্সি ও মোটরসাইকেলকে যাত্রীরা বলছেনÑডিজিটাল যুগের আশীর্বাদ। ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা নগরীর বাইরেও প্রসারিত করার দাবি জানিয়েছেন অনেকেই।

জানা গেছে, এ্যাপভিত্তিক বাইক সেবা উপভোগ করছেন নারীরাও। তারা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন। একই সঙ্গে জানাচ্ছেন সন্তুষ্টির কথা। অপ্সরা জুহি তেমনই একজন। কর্মরত আছেন শীর্ষ এক মুঠোফোন প্রতিষ্ঠানে। সম্প্রতি পাঠাও’র সেবা নেয়ার কথা জানিয়ে এই নারী বলেন, ‘নারী পুরুষ নয়। দ্রুত বাসায় পৌঁছাতে হবে এটা ভেবেই পাঠাওয়ের মোটরসাইকেলে চড়ে বসি। কোন ঝামেলা ছাড়াই অল্প সময়ের মধ্যে বাসায় পৌঁছে যাই। এক কথায়, পাঠাও ইজ সো গুড।’ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব সেবা ব্যবহারে নারী-পুরুষ উভয়ই নিরাপদ। কারণ সেবা প্রদানকারী ও ব্যবহারকারী উভয়েই এ্যাপে নিবন্ধনকৃত। কোন কারণে চালকের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হলে তাকে দেয়া যাচ্ছে নেতিবাচক মার্ক। ফলে ভুলক্রমেও কোন চালক বিরূপ আচরণ করছেন না। বরং তাদের চোখেমুখে সন্তুষ্টি আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা।

সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে রুদ্র আমিন বলেন, ‘উবারের ট্যাক্সিতে চড়ে শাহবাগ থেকে বিমানবন্দর বাস স্ট্যান্ডে নামি। ভাড়া আসে ৫৪০ টাকা। খুশি হয়ে ৫৫০ টাকা দিলে চালক তা গ্রহণ করেননি। বরং ১০ টাকা ফেরত দিয়ে বলেছেন, অতিরিক্ত গ্রহণের নিয়ম নেই। ঢাকার পথে এরচেয়ে ভাল আর কী সেবা হতে পারে।’ আব্দুল মোমিন রনি একই ধরনের কথা জানিয়ে বলেন, উবার দুর্দান্ত সেবা দিচ্ছে। তাদের সেবা ব্যবহার করে আমি খুবই খুশি। একইভাবে উবার ব্যবহারে নিজের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন রাজধানীর বাসিন্দা নাবিদ আলম অন্তু ও তাহমিনা শাম্মী। আর ভাড়া কমানোর কথা বলেছেন আমিনুল হক পলাশ ও রনি নামের দুই যাত্রী। তবে যাত্রীদের অধিকাংশই বলছেন, ঢাকার বাইরেও এ ধরনের সেবা চালু করা উচিত।

মোবাইল এ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট তথ্য প্রযুুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার জনকণ্ঠকে বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে এ্যাপভিত্তিক এসব সেবা প্রদান অত্যন্ত ইতিবাচক। ধীরে ধীরে সবই বদলে যাবে। সবকিছুই মোবাইল ও ইন্টারনেটে চলে আসবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের সব আইনই মান্ধাতা আমলের। ডিজিটাল বাংলাদেশের উপযোগী করতে হলে ১৬৭টি আইন বদলাতে হবে। ডিজিটাল পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমি বলব, অনুগ্রহ করে আইনগুলো বদলান, ডিজিটাল যুগের মতো করেন। একইভাবে আইনী বৈধতা প্রসঙ্গে পাঠাও’র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ সায়মন চৌধুরী বলেন, এটি একটি নতুন ধারা। যখন আইন তৈরি হয়েছিল, তখন এ্যাপের উদ্ভব হয়নি। ডিজিটাল যুগে আইন অবশ্যই ডিজিটাল যুগের উপযোগীই হতে হবে। উবার

গত বছরের শেষের দিকে বহুজাতিক ট্যাক্সিসেবা প্রতিষ্ঠান উবার ঢাকায় যাত্রা শুরু করে। এ্যাপল স্টোর ও গুগল প্লে স্টোর থেকে এ্যাপটি বিনামূল্যে নামানো যাবে। ফোন নম্বর এবং ই-মেইল ব্যবহার করে এ্যাপ সক্রিয় করতে হয়। জানা গেছে, উবারের বেজ ভাড়া ৫০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২১ টাকা। ওয়েটিং চার্জ মিনিটে ৩ টাকা। যাত্রা শুরুর আগে গন্তব্য ঠিক করে সম্ভাব্য ভাড়া জানা যাবে। ২৪ ঘণ্টাই এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। নগদ বা কার্ডে ভাড়া পরিশোধ করা যাচ্ছে। বৈধতা পেতে উবার কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ’তে আবেদন করেছে। সেই আবেদন এখন পর্যালোচনা চলছে।

পাঠাও

এ্যাপভিত্তিক মোটরবাইক সেবা পাঠাও। এর বেজ ভাড়া ২০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া দশ টাকা। ভাড়া নগদে পরিশোধ করা যাবে। বর্তমানে তাদের ৫০০ নিবন্ধিত রাইডার রয়েছে। প্রতিদিন অন্তত ১ হাজার যাত্রী তাদের সেবা ব্যবহার করছে। পাঠাও’র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ সায়মন চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছি। গণপরিবহন সঙ্কট ও যানজটের সমস্যার কথা বিবেচনা করেই পাঠাও’র উদ্ভব। যারা আমাদের সেবা ব্যবহার করেছেন তারা খুবই সন্তুষ্ট। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও বিভাগীয় শহরগুলোতেও পাঠাও সেবা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।চলো

যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে দেওয়ান শুভ ২০১৫ সালে ‘চলো’ শুরু করেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ট্যাক্সিসেবার পাশাপাশি এ্যাপ, ই-মেইল বা ফোনে গাড়ি আগে থেকে বুকিং দেয়ারও সুযোগ আছে।

এ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও আছে ‘আমার রাইড’, ‘আমার বাইক’, ‘শেয়ার এ মোটরবাইক-স্যাম’ ইত্যাদি। যাত্রী সেবায় নিরপত্তা প্রসঙ্গে পাঠাও’র বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ সায়মন চৌধুরী বলেন, পাঠাও রাইড ব্যবহারকারী ও রাইড প্রদানকারী উভয়েই নিবন্ধিত এবং লাইভ ট্রাকিং-এর আওতায় থাকেন। ফলে উভয়ের ক্ষেত্রেই কোন ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সেবা দিতে গিয়ে রাস্তায় নতুন কোন বাইক নামাতে হচ্ছে না। যাদের বাইক আছে তারা এ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করে অবসর সময়ে কাজ করছেন। ফলে তারা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ধরনের সেবায় বৈধতার পথে কোন অন্তরায় নেই বলে মনে করি।

এ ধরনের সেবাকে ইতিবাচক মন্তব্য করে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) পরিচালক নাজমুল আহসান মজুমদার জনকণ্ঠকে বলেন, এ্যাপভিত্তিক পরিবহন সেবার অনুমোদন দিতে পর্যালোচনা চলছে। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় একটি পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে সড়ক ও পরিবহন আইনকে ডিজিটাল যুগের উপযোগী করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সূত্রঃ জনকণ্ঠ

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com