একাডেমিক গণতন্ত্র ।। ইয়াসির আরাফাত বর্ণ

২৫৫ বার পঠিত

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে (মূলত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে) শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা লুপ্ত হয়েছে বহু আগেই, লোক দেখানো গণতন্ত্রের চর্চা হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক সমিতি নির্বাচন বা কর্মচারী সমিতি নির্বাচন বহাল তবিয়তেই আছে।

স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আছে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিহীন এক হাস্যকর ‘সিনেট’। সেখানে আবার ভোটের নামের নিম্নমানের নাটকের মঞ্চায়নে সরকারি পছন্দে নির্বাচিত (!) হচ্ছেন উপাচার্য। তারা আবার বুক ফুলিয়ে কথা বলছেন শিক্ষার্থীদের নানান দাবি-দাওয়ার বিপক্ষে। টক শো করে বেড়াচ্ছেন এবং জনগণ দেখছে যে, সরকারি-বেসরকারি-গণতন্ত্র-ক্লিন ঢাকা-অপরিষ্কার বুড়িগঙ্গাসহ নানান চিন্তায় তারা জরাজীর্ণ। দেশ নিয়ে এরূপ মহাচিন্তিত বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে রীতিমতো গর্বিত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে আমজনতা।

অথচ এদেরই আসল যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এই জনগণের পক্ষ থেকেই তা নিয়ে কিন্তু তারা বিন্দুমাত্র চিন্তিত এবং বিচলিত নয় । যাচ্ছে, যাক না!- চিন্তা নিয়ে তারা দেশের জনগণের একেকটি আশার জায়গা, জনগণের ঘাম দিয়ে চলা স্বপ্নের জায়গা- সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ফেলে রাখছেন, এর ওপর ব্যাবহার করছেন উপর্যুপরি বিকৃত আইন। সরকারের চাটুকারিতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে এগুলোকে বানিয়ে ফেলছেন সরকারের একেকটি উপশাখা।

এই স্বল্পদৈর্ঘ্য জীবনে আমি একটি ছাত্রসংসদ নির্বাচন দেখেছিলাম। ২০১০ সালে একটি কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচন। সরকারি/বেসরকারি দলের তাপ-চাপ আর প্রচণ্ড গোলাগুলির মাঝে সে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল। পরবর্তীতে বহু সময় গেছে, সে সংসদের নেতারা অনেকেই সংসার জীবনে চলে গেছেন। সংস্কার না করায় ছাত্র সংসদের ছাদ ধসে পড়েছে। সবই হয়েছে, নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের চর্চাটা শুধু হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গেলে অবস্থা আরও করুণ বলেই মনে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বশেষ ছাত্র সংসদের নেতারাও আজ প্রবীণ হবার পথে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ভবন তকতকে অবস্থায় আছে আবার কোনোটির অবস্থা পোড়াবাড়ির মতো। সংসদের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আছেন, কাজ করছেন এবং অবসরেও চলে যাচ্ছেন, সংসদের নামে প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকাও নেয়া হচ্ছে। শুধু নির্বাচনটাই হচ্ছে না। যা হচ্ছে তা হলো, ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষার্থী সংগঠনের নেতারাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছেন আর সত্যিকারের সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাকুরির বাজারের জন্য মুখস্ত করছেন, কোন ছাত্র সংসদ কত আগে বন্ধ হয়েছে- এই তথ্য।

১৯৭৩ এর ৮ অক্টোবর জারি করা অধ্যাদেশ মতে দেশের মোট চারটি বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্বশাসিত বলে ঘোষণা দেয়া হয়। এবং এ অধ্যাদেশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে মোট পাঁচজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকার কথা বলা আছে যারা কিনা ছাত্র সংসদ কর্তৃক মনোনীত হবেন। তাদের প্রধান কাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্ষমতাকেন্দ্রের সাথে সংযুক্ত থাকার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দাবি এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। যার ফলে প্রশাসনের মধ্যে শিক্ষার্থী বান্ধব নয় এমন একরোখা ভাব কোনোভাবেই বিকশিত হতে পারতো না এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির ওপর চাটুকার ও ভণ্ড শিক্ষকেরা কোনোরূপ প্রভাব খাটানোর সুযোগ পেত না। অতিরিক্ত প্রভাব দেখাতে পারতো বিভিন্ন রাজনৈতিক শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোও।

ছাত্র সংসদের চর্চা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপূর্ণ স্বায়ত্বশাসন নিশ্চিতকরণে সবচাইতে বড় হাতিয়ার ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্যুতে সরকারের অনৈতিক হস্তক্ষেপও বিলীন হয়ে যেত এর ফলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসতো রাজনৈতিক সহাবস্থানের খুব চমৎকার একটি ধারা। বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যকালাপ বাড়তো বহুগুণ। কিন্তু বাস্তবে যা হচ্ছে তা আমি আপনি সবাই-ই জানি। স্বায়ত্বশাসন আর সরকার এখন একাকার হবার পথে, সরকারের মন্ত্রী নাক গলাতে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা- পড়ালেখার হালচাল নিয়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা হয়ে বসে আছেন রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল সদস্য। অধ্যাপকরা সব তেলতেলে বদনে ভিড় জমাচ্ছেন মন্ত্রীদের কাছে।

সবচাইতে হতাশাজনক বিষয়টি দাঁড়ায়, অধ্যাপকরা ঠিকই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বাছাই হয়ে আসা নেতাদের টেবিলেই ভিড় জমাচ্ছেন অথচ স্বায়ত্বশাসনকে কাজে লাগিয়ে তারাই আবার তাদের প্রতিষ্ঠানে গণতন্ত্রের চর্চা ঘটাতে পারছেন না। এই চাটুকার শ্রেণির মধ্যে অনেক শিক্ষকেরা তো আবার কয়েক কাঠি সরেস। তারা স্বীকারই করে নিচ্ছেন যে দেশের বাজে পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে সরকার চাচ্ছে যে ছাত্র সংসদ তৈরি না হোক (এবং এর মাধ্যমে এই চাটুকারের দল নিজেদের অবস্থানও বুঝিয়ে দেন)। তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসনের কি করার ক্ষমতা আছে তা নিয়ে জোরোলো সন্দেহ আসে ।

গত তেইশ বছর ধরে অকার্যকর হয়ে আছে ’ডাকসু’ , ’জাকসু’-তে কার্যক্রম নেই চব্বিশ বছর যাবৎ, ছাব্বিশ বছর ধরে অচল পড়ে আছে ’চাকসু’ আর বাইশ বছর ধরে বন্ধ ’রাকসু’-র সব কার্যকালাপ । সংসদগুলোর সর্বশেষ কমিটির নেতাদের অনেকেই জাতীয় পর্যায়ের নেতা হয়ে গেছেন অথচ পরবর্তী এতাগুলো বছরে দেশের রাজনীতি বঞ্চিত আছে বিশ্ববিদ্যালয় পেরুনো সতেজ ধ্যাণ ধারণার ঝাঁকে ঝাঁকে রাজনীতিবিদ প্রাপ্তি থেকে। যার ফলে শূন্যস্থান পূরণ  করেছে অথর্ব আর ভণ্ডে ভরা একটি দল, যারা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চেতনার কথা বলে ক্রমাগত ছড়াতে থাকেন ধর্মগত বিদ্বেষ ।

শেষ করবো প্রচণ্ড বিভ্রান্তিকর একটি অবস্থার বর্ণনা দিয়ে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নিয়ে যখন এ রকম চোর পুলিশ খেলা চলছে, তখই ২০১৪ সালে ‘জাকসু’ নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি ও নিজেদের মধ্যে বেশ কিছু ব্যাপারে চোখ রাঙানি চলতেই থাকে।

পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনের দোহাইয়ে নির্বাচন পেছানো হয়। আর এ সবের মাঝেই বহুসময় ধরে চলা আন্দোলনের চাপে আনোয়ার হোসেনও পদত্যাগ করেন। নতুন উপাচার্য আসে, ‘জাকসু’ নিয়ে আর কথা হয় না। সাংবাদিকরা একটু আধটু খোঁজ নিতে থাকে বলে প্রশাসন হ্যাঁ-হু করতে থাকে। ব্যাস এ পর্যন্তই। সম্প্রতি আবার উপ-উপাচার্য বলেছেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে এখানেও হবে।

এখন সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই যদি এই একই কথা বলা হয়, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হয়ে দাঁড়াবে বলুন তো পাঠক। দেশের বিভ্রান্ত এবং অতিদুষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো নিজেদের বিভ্রান্তির তোপে আরও বেশি হতাশ করে তোলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা হাজার হাজার স্বপ্ন বিলাসী মানুষদের।

লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com