অভিনেতা বনাম সাংবাদিক ।। বন্যা মির্জা

৫৯৬ বার পঠিত

আমি একজন মানুষ। বাংলাদেশের সুনাগরিক হওয়াই আমার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। আমি অভিনেতা নই, তা হতে পারার যোগ্যতাও আমার নেই, শিল্পী হতে পারা তো অনেক দূরের কথা। কিন্তু যেহেতু একটু থিয়েটার একটু টেলিভিশন ও কয়েকটি সিনেমাতে কাজ করেছি, সেই সুবাদে বাংলাদেশে যা দুয়েকজন লোক চেনেন তা অভিনেতা হিসেবেই চেনেন। আমি ধন্য। আমার জন্ম ধন্য। বাংলাদেশে না জন্মালে আমাকে কেউ চিনত না। এই যোগ্যতা নিয়ে পৃথিবীর আর কোথাও এত মানুষের ভালবাসা পাওয়া যেত না। বাংলাদেশের কত কিছু খারাপ! কিন্তু একটা জিনিস খুব ভাল। তা হলো বাংলাদেশের ‘মানুষ’। ভাল বললে কম বলা হবে। অসাধারণ! না হলে এই দেশে যা যা কিছু ঘটতে থাকে তারপরও মানুষের জীবন স্বাভাবিক গতিতে চলত না। রাতে বাড়ি ফেরা, অফিসে যাওয়া, তার কর্মময় দিন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন ‘মানুষ’। মানুষ-ই। পরিশেষে মানুষই খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কেউ যে পেশাতে কাজ করুন, তিনি মানুষ।

‘কল্যাণ’ নামক এক ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে কারণ সে সন্দেহভাজন, জিয়া নামক এক ব্যক্তিকে গাড়ি দিয়ে আঘাত করার কারণে।’ বিষয়টা এমন হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। হয়নি কারণ জিয়া একজন ব্যক্তি, একজন মানুষ (আমার জানা মতে একজন অসাধারণ মানুষ তিনি) হবার চেয়েও তাঁর ফটো-সাংবাদিক পরিচয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আবার কল্যাণও মানুষ নন। তিনিও অভিনেতা!

জিয়া আপনার জন্য জন্য আমার অসীম আর আকুল প্রার্থনা ‘ফিরে আসুন’। আপনার সহকর্মীরা, আপনার বন্ধূরা কী বিহ্বল হয়ে অপেক্ষা করছেন! অপেক্ষা করছেন পরিজন পরিবার। এই কদিনে আপনি কত সজ্জন মানুষ তা আরো জেনেছি। আশা রাখি দেখা হবে। কথা হবে। আমি আপনার জন্যই আপনার কাছে যাব কখনো।

কিন্তু কল্যাণ! আপনি মানুষ নন, আপনি অভিনেতা। সমাজের কীট-পতঙ্গও আপনি নন! মানুষ তো দূরের কথা! আপনি একজন ‘খুনি’। আপনি ‘অভিনেতা’ ও ‘খুনি’! অভিনেতা বলেই আপনার জন্য দরজা খোলা নেই। এমনকি আপনার সহকর্মীরা যাঁরা আপনার মতোই ‘অমানুষ’ ও ‘খুনি’, তাঁরাও দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছেন আপনার পাশে, প্রমাণ হবার আগে থেকেই। কারণ যদি প্রমাণিত হয় আপনিই কাজটি করেছেন! আপনি একটা নর্দমার কীট! দেশের কোনো কাজেই লাগেন না! আপনার সঙ্গে আমরা সবাই তাই। তাই-ই।

আপনি কি জানেন, যখন আপনার আটকের কথা জেনে আপনার সহকর্মীরা আপনাকে দেখতে গেছেন পুলিশ-স্টেশনে, তখন কত নিগ্রহ তাঁদের সহ্য করতে হয়েছে? হবেই তো! তাঁদের সাথে আমিও গেছি। বলেছি ‘অপরাধীর পক্ষে আমরা কেউ না। অপরাধীর সাজা হবেই।’ এটা বিশ্বাস না কল্যাণ। এটা এমনই। একটা রাষ্ট্র বিশ্বাসের উপর চলে না। চলে কতগুলো নিয়ম দিয়ে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রও তাই পরিশেষে। তাই আপনার সহকর্মীরা কেউ বলেননি যে আপনি নির্দোষ, যেহেতু আপনার বিরুদ্ধে ‘সন্দেহভাজন’, হ্যাঁ সন্দেহভাজন হিসেবে মামলা হয়ে গেছে। এখন সেটা রাষ্ট্রের আইনের অধীন। আপনার সহকর্মীরা কেউ আপনাকে ছাড়াতে বা সুপারিশ করতে থানায় যাননি। তাঁরা কেবল জানতে ও বুঝতেই গিয়েছিলেন কী ঘটেছে, কী ঘটছে। তাঁরা জেনেছেন। তাঁরা এও জেনেছেন যখন মামলা হয়েছে তখন তা একটি প্রক্রিয়ার মধ্যেই সম্পন্ন হবে।

তাঁরা তাঁদের জীবনে আরও জেনেছেন বা শিখেছেন যে অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হয় না। যদি প্রমাণ হয় আপনি দোষী, কেউ নেই আপনার জন্য কোথাও। আর যদি অপরাধী না হন তাহলে আপনার পাশে আছেন সকলে। তা নিশ্চিত। আপনার সহকর্মীরা এই শিক্ষাতে শিক্ষিত। তাঁরা অবিবেচক নন। তাঁরা হতে পারেন ‘বাস্টার্ড’, ‘প্রস্টিটিউট’ বা কীট-পতঙ্গ বা জানোয়ার বা বদমাইশ। আইনের উপর তাঁরা শ্রদ্ধাশীল ও তাঁরা বিবেচক। তাই আগে থেকেই আপনাকে কিছু বলা থেকে তাঁরা বিরত আছেন, থাকবেন। অপেক্ষা করা কর্তব্য তাঁদের।

জিয়া ইসলামের সুস্থতা কামনা করছি। এটাও কামনা করছি যে কল্যাণ নিরপরাধ প্রমাণিত হোন। কিন্তু আমি জানি যে, সকল কিছু শান্ত হবার পরও একজন পেশাজীবী হিসেবে, একটা পেশাদল হিসেবে যে ধরনের ও যে পরিমাণের বিদ্বেষ ও আক্রোশের শিকার হয়েছি সেই ক্ষত সহজে শুকোবে না।

লেখক: অভিনেতা

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com