ঢাবিতে কি বুয়েটের হাওয়া লেগেছে !

৬৫ বার পঠিত

এমদাদুল হক তুহিন ॥ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরোক্ষভাবে উগ্রবাদ চর্চা থেমে নেই। বিভিন্ন বিভাগ ও হলগুলোতে নানা নামে লুকিয়ে রয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীরা। চলতি বছরের শুরুতে উগ্রবাদী কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে ৭ ছাত্রকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত দেশের অন্যতম এই প্রতিষ্ঠানটিতে থেমে নেই ইতিহাস বিকৃতি। বিশ্বববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মরণিকায় রাষ্ট্রপতির ইতিহাস নিয়ে ভুল চর্চাকে উগ্রবাদী শক্তির বহির্প্রকাশ বলে মনে করেন অধিকাংশ প্রগতিশীল শিক্ষক। এ ঘটনায় অব্যাহতি পাওয়া ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান এখন ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের ছাত্র নির্দেশনা পরামর্শ দান দফতরের উপ-পরিচালক হিসাবে কাজ করবেন! বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মনে করেন প্রগতিশীল শিক্ষকরা। তারা বলেন, ‘এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে রেজাউর কাজ করলে তা হয়ে উঠবে আরও হুমকিস্বরূপ, প্রকান্তরে তা হবে মুক্তিযুদ্ধের ওপর সরাসরি আঘাত!’

অপরদিকে প্রতিষ্ঠানটির দুই শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদ ও গোলাম মাওলার হাত ধরে দেশে আত্মপ্রকাশ ঘটে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের। এ অভিযোগে দুজনই গ্রেফতার হয়েছিলেন। একজন এখনও আত্মগোপনে। শুধু হিযবুতের অভিযোগ-ই নয়, আইবিএ বিভাগে অন্তত তিন জামায়াতপন্থী শিক্ষককে জ্যেষ্ঠতা ভেঙ্গে পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির এক নেতা বলেন, ‘বিভাগটির দুই শিক্ষকের হাত ধরেই দেশে হিযবুত তাহরীরের যাত্রা, প্রতিষ্ঠান থেকে উগ্রবাদী কর্মকা-ে যুক্ত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন সময় যারা ধরা পড়ছে তারাও একই বিভাগের। পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ- বুয়েটের পথেই কি হাঁটছে ঢাবির আইবিএ?

শুধু তাই নয়, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিতে প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন জামায়াতপন্থী প্রকৌশলী। তিনি এক সময় জামাতের রুকন ছিলেন। বিদ্যুত গ্যাসের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত হওয়ায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অধিকাংশ শিক্ষক। সাদা দল থেকে জয়ী একজন সদস্য সম্পর্কে একাধিক শিক্ষকের অভিযোগ, তিনি ক্ষমতাধরের লেজুরবৃত্তি করে কৌশলে আদায় করে নিচ্ছেন নিজেদের স্বার্থ। গোপনে শক্ত করতে চাইছেন নিজেদের অবস্থান। শুধু তাই নয়, উগ্রবাদী সংগঠনগুলোও প্রগতিশীল বিভাগে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে চায়। এক্ষেত্রে তারা একটি অনুষদ ও একটি বিভাগকে প্রাধান্য দিচ্ছে। জানা গেছে, ঢাবি থেকে প্রতিবছর অন্তত ২ জন জামায়াতপন্থী সাংবাদিক বের হচ্ছে, যারা যুক্ত হচ্ছেন দেশের গণমাধ্যমে। এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির। ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাবি পুরোপুরি নিরাপদ নয়। প্রতিষ্ঠানটিতে গোয়েন্দা সংস্থা ও সরকারের আরও নজরদারি বাড়ানো উচিত। প্রতিষ্ঠানটিতে এখনই শুদ্ধি অভিযান চালানো উচিত।’ ঠিক এমনই অভিমত প্রগতিশীল শিক্ষকদের বড় অংশের।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল জনকণ্ঠকে বলেন, ‘গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গী হামলার পর বর্তমানে কোন স্থানই নিরাপদ নয়। যে কোন স্থানে যে কোন মুহূর্তে বিপর্যয় ঘটতে পারে, চলতে পারে উগ্রবাদী কর্মকান্ডও। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ মুহূর্তে সরকারের আরও নজরদারি বাড়ানো উচিত। এছাড়া ঢাবি পরিবারকে এ বিষয়ে থাকতে হবে সর্বোচ্চ সতর্ক।’ কোথাও কোন ধরনের উগ্রবাদী কর্মকা-ের খোঁজ পেলে তা দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

ঢাবিতে ইতিহাস বিকৃতি ॥ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মরণিকায় ইতিহাস বিকৃতির দায়ে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমানকে অব্যাহতি দেয়া হলেও বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির অন্য একটি পদে কর্মরত আছেন। জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পূর্বে তিনি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের ছাত্র নির্দেশনা পরামর্শ দান দফতরের উপ-পরিচালক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী তাকে পূর্বের পদে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. এ এম আজাদ।

এক প্রশ্নের জবাবে এ এম আজাদ জনকণ্ঠকে বলেন, ইতিহাস বিকৃতির দায়ে রেজিস্ট্রারকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, তিনি আগের পদে ফিরে গেছেন। এখন থেকে তিনি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের ছাত্র নির্দেশনা পরামর্শ দান দফতরের উপ-পরিচালক হিসাবে কাজ করবেন, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হওয়ার পূর্বে তিনি এই পদেই কাজ করতেন।

সৈয়দ রেজাউরকে পুনর্নিয়োগ দেয়া হচ্ছে এমন খবর কয়েকদিন ধরেই ছড়িয়ে পড়ে ঢাবির বাতাসে। এমন প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জনকণ্ঠের করা এক প্রশ্নের জবাবে ঢাবি উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, নতুন করে নিয়োগ প্রাপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই, উনাকে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার করা হয়েছিল। অভিযোগ ওঠার পর তিনি ছুটিতে আছেন। অন্যদিকে নতুন রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে টিএসসিতে কাজ করবেন রেজাউর এমন তথ্য তিনি অস্বীকার না করে বরং তিনি জানান রেজাউর বর্তমানে ছুটিতে আছেন।

জানা গেছে, ইতিহাস বিকৃতির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্তের পর রেজাউরের চাকরি থাকাÑনা থাকার বিষয়টি জানা যাবে। তবে উপাচার্যের অধীন তদন্ত কমিটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন প্রগতিশীল শিক্ষকরা। যাদের নিয়ে কমিটি করা হয়েছে তাদের নিয়ে প্রশ্ন আছেÑ তাই নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত আসার প্রশ্নই আসে না। তাদের আশঙ্কা, কমিটি থেকে আসা সিদ্ধান্তের সুফল ভোগ করবেন স্বয়ং অভিযুক্ত রেজাউরই। তারা রেজাউরকে টিএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেখতে চান না। তাদের অভিমত, গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে রেজাউর কাজ করলে তা হয়ে উঠতে পারে আরও হুমকিস্বরূপ, প্রকান্তরে যা হবে মুক্তিযুদ্ধের ওপর সরাসরি আঘাত।

রেজাউরকে টিএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হলে আন্দোলনে যেতে পারে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কয়েকটি সংগঠন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা গেছে, রেজাউর টিএসসিতে কাজ করলে তা তারা মেনে নেবে না। প্রয়োজনে আন্দোলনে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন সংগঠনের এক নেতা।

আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘসময় ধরে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ার ফল কি হতে পারে তার একটি নিদর্শন দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মরণিকায়।’ তার মতে, রেজাউর টিএসসির ওই পদে বসলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আরও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষক ও কর্মচারীদের নিয়ে গঠিত মুক্তিযোদ্ধা হাইকমান্ডের নেতা ও উপরেজিস্ট্রার শাহজাহান হাওলাদারের মতও একই। তিনি একধাপ এগিয়ে বলেন, ইতিাহাস বিকৃতির কারণে তাকে বহিষ্কার করা যেত, কিন্তু দেয়া হয়েছে অব্যাহতি। আর গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি স্থানে তাকে বসানোর কোন দরকারই ছিল না। তিনি জানান, রেজাউরকে টিএসসিতে স্থলাভিষিক্ত করা হলে তা কোনক্রমেই মেনে নেয়া হবে না। জানা গেছে, বিগত জোট সরকারের আমলে ঢাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফয়েজের হাত ধরে রেজাউর প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ পান।

বুয়েটের পথেই হাঁটছে ঢাবির আইবিএ ॥ ঢাবির ইনস্টিটিউট অব বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) বিভাগ সম্পর্কে অভিযোগ অনেক। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির আইবিএ বিভাগ বুয়েটের পথেই হাঁটছে। যেখানে লুকিয়ে রয়েছে উগ্রবাদী শিকড়। এ বিভাগের শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদ ও গোলাম মাওলার হাত ধরে দেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীরের অত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। তবে সংগঠনটি নিষিদ্ধ হলেও শিক্ষক মহিউদ্দিন এখনও নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। আর গোলাম মাওলাও প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছেন বহাল তবিয়তে। এমনকি সম্প্রতি টিএসসিতে জঙ্গীবিরোধী এক অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিশ্বস্ত একটি সূত্রে জানা গেছে, একই বিভাগে শিক্ষকদের সিনিয়রিটি ভেঙ্গে ইনস্টিটিউটের ক্ষমতায় বসানো হয়ছে পরপর তিন শিক্ষককে। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে উগ্রবাদী কর্মকা-ের অভিযোগ। সূত্র জানায়, লবিংয়ের মাধ্যমে নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতেই উগ্রবাদী ও জামায়াতপন্থীরা ক্ষমতার এই অপব্যবহার করেছে। অনৈতিক ভাবে এসব সুযোগ সুবিধা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে পরোক্ষভাবে উগ্রবাদের চাষাবাদ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওই সূত্রের। অন্যদিকে মহিউদ্দিনকে নিয়মিত বেতন দেয়াকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানের অপর শিক্ষক ড. আনোয়ার হোসেন। জানা গেছে, মহিউদ্দিন আহমেদকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ‘ফোর্স লিভ’-এ রেখেছে। মূলত এ কারণেই তিনি বেতন পাচ্ছেন। আর শিক্ষক গোলাম মাওলা সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি কোন উগ্রবাদী কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত নন। এতে করে শিক্ষকদের মধ্যে আঁতাতের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বলেন এক রাজনীতিবিদ।

হলগুলোর বর্তমান অবস্থা ॥ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে নানা নামে লুকিয়ে রয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীরা। এক্ষেত্রে তারা প্রাধান্য দিচ্ছেন বিজয় একাত্তর হলকে। হল শাখা ছাত্রলীগ নেতা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে বিজয় একাত্তর হলের যাত্রা শুরু। হলটি নতুন হওয়ায় বিভিন্ন হল থেকে বের করে দেয়া উগ্রবাদী ও শিবিরপন্থী শিক্ষার্থীরা এখানে এসে প্রবেশ করতে থাকে। স্বাধীনতাবিরোধীরা হলটিকে বেছে নেয়।

জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুতে ঢাবিতে হিযবুতের যে ৭ কর্মী ধরা পড়ে, তার ৩ জনই ছিল বিজয় একাত্তর হলের। আর এরা সবাই ছিল ঢাবির ইনস্টিটিউট অব বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ)’র শিক্ষার্থী। এ ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে বিজয় একাত্তর হলের ছাত্রলীগ সভাপতি শেখ ইনাম বলেন, যে কোন উগ্রবাদী কর্মকা- প্রতিরোধে ছাত্রলীগ সজাগ রয়েছে। তাদের ব্যাপারে সজাগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও।

অন্যদিকে সব হলেই কমবেশি উগ্রবাদী শক্তি লুকিয়ে রয়েছে। কখনও এদের রূপ প্রকাশ্য পেলেও অধিকাংশ সময় তারা খোলসে আবৃত থাকে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মনে করেন, উগ্রবাদীরা ফজরের নামাজের পর গোপন স্থানে মিলিত হয়। তারা নামাজের পর চালায় দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র। এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রত্যক্ষভাবে নিষিদ্ধ কোন সংগঠনের কার্যক্রম নেই, তবে পরোক্ষভাবে থাকতে পারে। হলগুলোতে কিছু কিছু শিবিরের কর্মী লুকিয়ে রয়েছে। এ ব্যাপারে সাংগঠনিকভাবে আমরা সতর্ক রয়েছি।

প্রতিষ্ঠানটিতে চলে হিযবুতের কর্মকান্ড, চলতি বছরেই বহিষ্কার ৭ ছাত্র ॥ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নীরবে চলছে হিযবুতের কর্মকা-। চলতি বছরের শুরুতে নিষিদ্ধ এ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ ছাত্রকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বহিষ্কৃতরা হলেন, আলম মোঃ শিহাব উদ্দিন, সাঈদী হাসান সজীব, নাকিব ফারহান, আলমগীর হোসেন, তরিকুল ইসলাম, মোঃ সোলাইমান ও আব্দুল মতিন। যে ৭ ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয় এদের ৩ জনই ছিল আইবিএ বিভাগের।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি শিবিরমুক্ত নয়। প্রতিষ্ঠানটিতে অন্ধকার ও অন্তরালে থেকে শিবির ও হিযবুত তাহরীর কাজ করছে। এর সঙ্গে কিছু শিক্ষক সরাসরি যুক্ত।

বিএনপি-জামায়াতপন্থী ৫০০ শিক্ষক ॥ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ১০০ জন। এর মধ্যে ৫ থেকে ৬শ’ শিক্ষক বিএনপি ও জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত। সিন্ডিকেটে সাদা দল (বিএনপি ও জামায়াতপন্থী প্যানেল) থেকে জয়ী একমাত্র সদস্য অধ্যাপক মোঃ লুৎফর রহমান। তিনি আন্তর্জাতিক হলের প্রাধ্যক্ষ।

অন্যদিকে জানা গেছে, ঢাবির বিজ্ঞান বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষকই জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিতি। তাদের কেউ কেউ পর্দার অন্তরালে থেকে উগ্রবাদী কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটিতে উগ্রবাদী গোষ্ঠী রয়েছে মন্তব্য করে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিহ্নিত শিবির রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হাজার শিক্ষকের ভেতরে অনেক শিক্ষক এক্কেবারে জামায়াতের রুকন। কই তাদের ছাঁটাই করতে পারছেন না?’ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গীবাদ প্রতিরোধে জনসচেতনতা শীর্ষক অনুষ্ঠানে উদ্বেগের কথা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসণের প্রতি তথ্যমন্ত্রী এ প্রশ্ন রাখেন।

যত অভিযোগ ॥ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। একজন প্রকৌশলী নিয়ে যেমন অভিযোগ রয়েছে তেমনি অভিযোগ পাওয়া গেছে প্রতিষ্ঠানটির একজন সহকারী রেজিস্ট্রার সম্পর্কেও। আর খোদ ছাত্রলীগ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। দেশের বিশিষ্ট এক অর্থনীতিবিদের অভিযোগ স্বয়ং ছাত্রলীগ নিয়েই। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির হল শাখার ছাত্রলীগের সভাপতি পদে রয়েছেন এমন অনেকেই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি বলেন, টাকার বিনিময়ে কমিটি করার কারণে খোদ ছাত্রলীগেও শিবিরের অনুপ্রবেশ।

জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই শিবির পরিচালিত বেশকিছু মেস রয়েছে। নিলক্ষেত, পলাশী, ফুলার রোড, কাঁটাবনের ওইসব মেসে প্রথমত গ্রাম থেকে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। প্রগতিশীল এক শিক্ষকের অভিযোগ, এসব মেসে প্রথমে ধর্মের বাণী শুনিয়ে গ্রামের শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের ব্যক্তিত্ববান, ধার্মিক ও মহানুভব হিসেবে জাহির করা হয়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে শিবিরকর্মী হিসেবে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে এদের মধ্য থেকেই জন্ম নেয় উগ্রবাদ। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠনে।

হিযবুত তাহরীর ॥ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীর দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। ঢাবিতেও রয়েছে তাদের কার্যক্রম, প্রায়শই ধরা পড়ে প্রশাসনের হাতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদ ও গোলাম মাওলার হাত ধরে বাংলাদেশে এ সংগঠনের আত্মপ্রকাশ। ২০০০ সালের শুরুর দিকে ‘লিবারেটেড ইয়ুথ’ এর ব্যানারে কার্যক্রম শুরু হলেও ২০০৬ সালে ‘ছাত্রমুক্তি ও ‘আলোকিত ছাত্রী ফোরাম’ নামে আলাদা দুটি সংগঠনের মাধ্যমে ঢাবিতে কার্যক্রম শরু করে হিযবুত তাহরীর।

এদিকে হিযবুত তাহরীর প্রধান সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদ ২০১০ সালে গ্রেফতার হন। পরে জামিনে ছাড়া পেয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশের দাবি। আর পুলিশ বলছে বর্তমানে তার বিষয়ে তাদের কাছে কোন তথ্য নেই। তবে একটি সূত্র জানায়, মহিউদ্দিন বর্তমানে টিচার্স কোয়ার্টারে রয়েছেন।

আর গোলাম মাওলা এখনও বিভাগটিতে রয়েছেন বহাল তবিয়তে। একটি সূত্রের অভিযোগ, সম্প্রতি তিনি ঢাবি আয়োজিত জঙ্গীবিরোধী একটি অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছিলেন। এমনকি সম্প্রতি সহকর্মীদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি কোন উগ্রবাদী কর্মকা-ের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত নন। তবে অতীতে হিযবুতের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য স্বীকার করেন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ॥ ছাত্রলীগ নেতারা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রকাশ্যে কোন উগ্রবাদী কর্মকা- নেই। একই কথা জানিয়েছেন একাধিক শিক্ষক। ছাত্রদের অধিকাংশই মনে করেন, প্রতিষ্ঠানটি একেবারে শঙ্কা মুক্ত নয়। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে কোন উগ্রবাদী সংগঠন সংগঠিত হচ্ছে এমন কোন তথ্য তাদের কাছে নেই। ঢাবির মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সঙ্গে যুক্ত উপরেজিস্ট্রার শাহজাহান হাওলাদার জানান, প্রশাসনে কেউ উগ্রবাদী কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত এমন তথ্য তার জানা নেই। বরং তিনি বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে কাজ করে চলছি। চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি। শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবু বকর সিদ্দিক জনকণ্ঠের এক প্রশ্নের জবাবে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে হিযবুত তাহরীর কিংবা উগ্রবাদী সংগঠন সংগঠিত হচ্ছে এমন কোন তথ্য তাদের জানা নেই। সর্তকতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা শতভাগ সচেতন রয়েছি, এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

সামগ্রিক প্রসঙ্গে ঢাবির উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক জনকণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাবিতে কোন অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে বলে আমার মনে হয় না, তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমরা পুরো জাতি যেহেতু ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, তাদের কিছুই করার থাকবে না। গণপ্রতিরোধের মুখে এরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com