গণমাধ্যমের নতুন মাধ্যম মোবাইল সাংবাদিকতা

৪৩ বার পঠিত

এস.কে.দোয়েল ।। সময় এখন হাতের মুঠোয় মোবাইল ফোনে। তখন মোবাইল ফোন দিয়েই সময়টা কাজে লাগানো যেতে পারে নিজেদের অন্যতম ক্যারিয়ার গড়ার। যার হাতের মুঠোয় রয়েছে ইন্টারনেট পোর্টেবলযুক্ত একটি মোবাইলসেট বা স্মার্টফোন তিনি সাধারণ নাগরিক থেকে হয়ে উঠতে পারেন এসময়ের একজন ফ্রিল্যান্স জার্নালিষ্ট অর্থাৎ মুক্ত সাংবাদিক। ফ্রিল্যান্স জার্নালিজম থেকে প্রফেশনাল জার্নালিজম হয়ে উঠার সহজ ক্যারিয়ার। এই ক্যারিয়ারই পৌছে দিতে পারে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একজন সফল গণমাধ্যমকর্মীতে। নিউ মিডিয়া মোবাইল জার্নালিজম অর্থাৎ নতুন গণমাধ্যম হিসেবে মোবাইল সাংবাদিকতার অপার সম্ভাবনা এখন বাংলাদেশ তথা গোটা বিশ্বের।

মোবাইল সাংবাদিকতা কি?
একজন সাংবাদিক, যিনি স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট পিসির মতো ইলেকট্রনিকস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা ও প্রচারের কাজ করে থাকেন, তাঁকেই ‘মোবাইল সাংবাদিক’ বা সংক্ষেপে মোজো বলা হয়। মোবাইল সাংবাদিকতা বর্তমানে দ্রুত এবং জনপ্রিয় একটি সংবাদ মাধ্যম যার সহায়তায় প্রতিবেদক বিভিন্ন ধরনের বহনযোগ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করে এবং ইন্টারনেটের সহায়তায় সংবাদ তৈরি, সম্পাদনা এবং নিজের কমিউনিটিতে দ্রুত ভাগাভাগি করতে পারে। একজন প্রতিবেদকের মতোই বিভিন্ন সময়ে মোবাইল সাংবাদিক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকও হতে পারেন যিনি ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ক্যামকর্ডার, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, স্মার্টফোন অথবা ট্যাবলেট কম্পিউটার ব্যবহার করেন নিজের কাজের জন্য।

এক্ষেত্রে একটি দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্কের সাহায্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজের সংবাদ এবং ছবি প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে থাকেন মোবাইল সাংবাদিক। ২০০৫ সাল থেকে মোজো বা মোবাইল জার্নালিজম ব্যবহৃত হচ্ছে। যার শুরুটা হয়েছিল পোর্ট মেয়ারস নিউজপ্রেস থেকে। পরে এ পরিভাষাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের গাননেট নিউজপেপারের মাধ্যমে।

কেন মোবাইল সাংবাদিকতার এত গুরুত্ব?
তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুতগতির ফলে মোবাইল নেটওয়ার্ক জনপ্রিয় উঠেছে। বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মুহুর্তে বার্তা পৌছানো যায় এখন মোবাইল ফোনে। ভয়েস কল থেকে এমএসএস ও এমএমএস এর মাধ্যমে। এর সাথে মোবাইলে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেট। এই ইন্টারনেটের আদলে গোটা বিশ্বের তথ্যাবলী হাতের মোবাইলে। সারাবিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ অধিকাংশ সময় ব্যয় করছে মোবাইল ফোনে। ফেসবুক, টুইটার, ভাইভার, ম্যাসেঞ্জার, ইনেস্ট্রাগ্রামের মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই মোবাইল ব্যবহারের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। মোবাইল ভার্সন হয়ে উঠেছে এসময়ের সকল অনলাইন নিউজ পোর্টাল, স্যাটেলাইট টিভি। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অনলাইন নিউজপোর্টাল, অনলাইন টিভি, রেডিওর মত সংবাদ মাধ্যম। আর স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে টিভিতে দেখানো যাবে লাইভ শো। তাই মোবাইলে মিলছে গোটা বিশ্বের খবরাখবর।

পরিসংখ্যানবিষয়ক পোর্টাল স্ট্যাটিসটার তথ্যমতে, বর্তমান বিশ্বে ৪৩০ কোটি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। যা আগামী ২০১৭ সালে ৫শ কোটিতে পৌছবে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা। স্ট্যাটিসটার তথ্যমতে, এশিয়া মহাদেশে দ্রুত বাড়ছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বর্তমানে এশিয়াতেই বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহৃত হচ্ছে। এশিয়ার ২৪০ কোটি মানুষের হাতে এখন মুঠোফোন রয়েছে, যা আগামী তিন বছরে বেড়ে ৩০০ কোটির ঘরে পৌঁছে যাবে। বাংলাদেশ সরকারের বিটিআরসির তথ্যমতে, এশিয়া মহাদেশের অন্যতম মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী দেশ বাংলাদেশে এখন মোবাইল ব্যবহারকারী ১২ কোটি ৬৮ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ। যার কারণে বাংলাদেশের সবকটি মোবাইল ফোন অপারেটর তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের ইন্টারনেট প্রযুক্তি (থ্রিজি/ফোরজি) সুবিধা দেওয়ায় স্মার্টফোনের ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের গণমাধ্যমগুলো তাদের কনটেন্ট পরিষেবা আরও বাড়াতে পারে। চর্চা করতে পারে মোবাইল সাংবাদিকতা।

গণমাধ্যমে মোবাইল জার্নালিজম এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক হয়ে উঠতে পারেঃ
বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে যেমন মোবাইল ব্যবহার, তেমনি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর। এই হারে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। মোবাইল প্রযুক্তির দ্রুতগতির ফলে গণমাধ্যমের নতুন মাধ্যম হিসেবে মোবাইল সাংবাদিকতা (মোবাইল জার্নালিম)একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। কেননা দিন যতই যাচ্ছে ততোই ক্রমবর্ধমানভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন ব্রান্ডের মোবাইল হ্যান্ডসেট ও স্মার্টফোন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ এর তথ্যমতে, দেশে এখন শুধু স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যাই দুই কোটির ওপরে।

আর ৩৫ বছরের নিচে তারুণ্যের সংখ্যা পাঁচ কোটির বেশি। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা পছন্দের অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপ দিয়ে ছবি তোলা, ভিডিও বানানো, সামাজিক যোগাযোগের সাইট ভিজিট করা অথবা ইন্টারনেটে দ্রুত বার্তা আদান-প্রদান ও কথা বলার কাজ করে থাকেন। যার কারণে স্মার্টফোনের সাহায্যে আজ গণমাধ্যমের সংবাদ জানার কাজ আগের চেয়ে অনেক সহজতর হয়েছে। এই স্মার্টফোনের মাধ্যমে এখন পশ্চিমা বিশ্বের নামীদামি গণমাধ্যমের বার্তাকক্ষে সংবাদ পৌঁছে দিতে স্মার্টফোন নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন বিবিসি তাদের প্রযুক্তিবিষয়ক অনুষ্ঠান ক্লিকসহ বেশ কয়েকটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের পুরোটাই ধারণ ও সম্পাদনার কাজ করেছে স্মার্টফোনের মাধ্যমে। গণমাধ্যমের গতি-প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে অনেক উপকারী অ্যাপ।

এখন অনেক গণমাধ্যমই তাদের ওয়েবসাইটের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে অ্যাপ বানানো ও এর রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। তাছাড়া মোবাইল সাংবাদিকতার মাধ্যমে টিভি চ্যানেল, এফএম রেডিও স্টেশন, দৈনিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনসমূহ এবং অনলাইন ভিত্তিক নিউজ ওয়েবসাইটগুলো একদিকে যেমন খরচ কমাতে পারবে অন্যদিকে আরো বেশি সংবাদ ও রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারবে। রাজধানী ঢাকার বাইরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রেরণেও মোবাইল সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

যেভাবে মোবাইল সাংবাদিকতার বিস্তৃতি ঘটানো সম্ভবঃ
দেশের প্রায় ১২ কোটি মানুষ যেখানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। সেদিক লক্ষ্য করলে নতুন সংবাদ মাধ্যম হিসেবে মোবাইল জার্নালিজম হয়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে অতি সহজে পাওয়া সম্ভব। এটা করতে পারে একজন সাধারণ নাগরিকও। তিনি হতে পারেন বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবি। এজন্য মোবাইল সাংবাদিকতা বাস্তবায়ন ঘটাতে এই প্রবন্ধের লেখক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন মোবাইল জার্নালিজম অব বাংলাদেশ গড়ার। বাংলাদেশ সরকার আইসিটির ওপর বেশির ভাগ গুরুত্ব দিচ্ছেন। সরকার এই আইসিটির গুরুত্বারোপের মোবাইল জার্নালিজমের বিস্তৃতি তথা বাস্তবায়ন করতে পারলে তৈরি হবে আউটসোর্সিংয়ের মত একটি কর্মসংস্থান।

এক্ষেত্রে সাংবাদিকতা পেশায় স্মার্টফোনের সঠিক ব্যবহার এবং এই কাজের ব্যবহারের উপযোগী অ্যাপ ও আনুসঙ্গিক উপকরণ বাড়তে থাকায় মোবাইল সাংবাদিকতার ওপর কোর্স চালু করতে হবে। যেটা বিশ্বের রাশিয়াসহ ইউরোপ-আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে মোবাইল সাংবাদিকতার ওপর কোর্স চালু হয়েছে। এটি বিস্তৃতি ঘটাতে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য করতে হবে প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও সভা-সেমিনার। মোবাইল সাংবাদিকতার ওপর নিয়মিত গবেষণা ও কর্মশালার আয়োজন করে থাকে আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও রেডিও সম্প্রচার সংস্থা আরটিই। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে মোবাইল সিনেমা নির্মাণ, মোবাইল সাংবাদিকতা ও মোবাইল ফটোগ্রাফির ওপর প্রথম আন্তর্জাতিক মোবাইল সাংবাদিকতা সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সম্মেলনে  একজন সাংবাদিক স্মার্টফোন ব্যবহার করে কীভাবে হয়ে উঠতে পারেন মোবাইল সাংবাদিক, আর এর জন্য তাঁর করণীয়ই বা কী এমন খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরা হয়।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংঘটিত ঘটনাগুলো সংগ্রহ করতে অনেক সময় গণমাধ্যমকর্মীর ঘটনার সময় যাওয়া সম্ভব হয় না, ওই সময় একজন সাধারণ মানুষও তার মোবাইলসেট বা স্মার্টফোনে সংঘটিত ঘটনাটি ধারণ করে গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন। এজন্য দেশের প্রত্যেক জেলা/উপজেলায় ‘মোবাইল জার্নালিজম এসোসিয়েশন’ নামের একটি সংগঠন দাঁড় করানো যেতে পারে। যার হেড অফিস হবে রাজধানী ঢাকায়। এটি করতে পারলে তথ্যপ্রযুক্তির অপার সম্ভাবনার দুয়ার হিসেবে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর বৃদ্ধি পাবে। দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে মোবাইল জার্নালিজম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং অতি সহজে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংঘটিত ঘটনাগুলো দ্রুতগতিতে অনলাইন, ইলেক্ট্রিকমিডিয়ায় পৌছে প্রচারমূখর হয়ে উঠে। প্রতি মুহুর্তে খবর সাধারণ মানুষও তার মোবাইলে পেয়ে যেতে পারেন, টিভিতে দেখতে পারেন। এতে করে সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে তেমনি তথ্যপ্রযুক্তিসম্পন্ন স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

লেখকঃ এস.কে.দোয়েল    
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
এবং
উদ্যোক্তা-মোবাইল জার্নালিজম অব বাংলাদেশ

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com