চার্লি চ্যাপলিন এর ১২৮ তম জন্মদিন আজ

১১১ বার পঠিত

১৮৮৯ সালের এই দিনে লন্ডনের ইষ্ট স্ট্রিট ওয়ালওয়ার্থে জন্ম গ্রহণ করেন পৃথিবী বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক চার্লি চ্যাপলিন । তার পুরো নাম স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র। কিংবদন্তি এই ব্রিটিশ চলচ্চিত্র অভিনেতার আজ ১২৮ তম জন্মদিন। হলিউড সিনেমার প্রথম থেকে মধ্যকালের বিখ্যাততম শিল্পীদের একজন চ্যাপলিন পৃথিবী বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালকও বটে। এমনকি চ্যাপলিনকে চলচ্চি্ত্রের পর্দায় শ্রেষ্ঠতম মূকাভিনেতা ও কৌতুকাভিনেতাদের একজন বলেও মনে করা হয়। 

চলচ্চিত্র শিল্প জগতে চ্যাপলিনের প্রভাব অনস্বীকার্য। নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের অন্যতম মৌলিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব চ্যাপলিন নিজের ছবিতে নিজেই অভিনয়, সংলাপ রচনা, পরিচালনা, প্রযোজনা এমন কী সঙ্গীত পরিচালনা পর্যন্ত করেছেন। চার্লি চ্যাপলিনের জীবনটা বড়ই রহস্যময়। চ্যাপলিনের জন্ম থেকে শুরু করে নাম, পিতা, মাতা সবকিছুই যেনো এক রহস্য। যুক্তরাজ্যের জাতীয় আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত নথি থেকে জানা যায়, চার্লি চ্যাপলিনের আসল নাম হলো ইসরায়েল থর্নস্টেইন। চ্যাপলিন তার ছদ্মনাম ।(তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দারা চ্যাপলিনের ছদ্মনাম নিয়ে কোনো প্রমাণ খুঁজে পাননি)। 

চার্লি চ্যাপলিনের কোনো বৈধ জন্ম প্রমানপত্র পাওয়া যায়নি, তাই তার জন্ম নিয়ে সর্বদাই কুয়াশা রয়েছে । সংবাদ মাধ্যম নানা সময়ে নানারকম তথ্য দিয়েছে তার জন্মস্থান সম্পর্কে । এমনকি তার চলচ্চিত্র জীবনের প্রথমদিকে চ্যাপলিন নিজেও একবার বলেছেন যে তিনি ফ্রান্সের ফঁতেউব্ল শহরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন । 

আল-জাজিরায় প্রকাশিত এক খবরে জানা যায়, এমআইফাইভের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এমন হতে পারে যে চ্যাপলিনের জন্ম রাশিয়ায়। তিনি একবার রাশিয়ায় ফিরে যাওয়ার কথাও বলেছিলেন। আবার এমনোও হতে পারে যে চ্যাপলিন ইহুদি বংশোদ্ভূত । প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের মতো। যুদ্ধের বিরুদ্ধে তিনি বই লিখলেন, সিনেমা করলেন, বক্তৃতাও দিলেন। সেই সময় তার সখ্যতা বাড়লো কমিউনিষ্টদের সাথে। তখন তিনি করেছিলেন সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘মানুষকে ভালোবাসার জন্য যদি আমাকে কমিউনিষ্ট বলা হয়, তো আমি কমিউনিষ্ট’।

এদিকে ২৫ বছর বয়সে, ১৯১৪ সালে চ্যাপলিন পরিচালিত ১ম মুভি ‘কট ইন এ ক্যাবার’ মুক্তি পায়। মুভিটি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।‘ড্রামাটিক মিরব’ পত্রিকায় লেখা হয়; চার্লির কোনও তুলনা হয় না। তিনি অদ্বিতীয়। একই বছর নিজের লেখা কাহিনী দিয়ে চ্যাপলিন নির্মাণ করেন ‘কট ইন দি রেন’ মুভিটি। এ ছবিটিও প্রচুর দর্শক প্রিয়তা লাভ করে। ১৯১৫ সালে চ্যাপলিন অভিনয় করেন ‘দ্য ট্র্যাম্প’ বা ‘ভবঘুরে’ মুভিতে। এই মুভিটি মুক্তির পর চার্লির জনপ্রিয়তা স্রোতের বেগে বেড়ে যায়। এই মুভিতে চ্যাপলিন শুধুমাত্র দর্শকদের মজাই দেন নি, শেষ দৃশ্যে চার্লি তার অভিনয় দিয়ে দর্শক হৃদয়কে মোচড় দিয়ে দেন। চার্লির চাপা কষ্টে দর্শকদের মন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এরপর ১৯১৭ সালে ‘দ্য ইমেগ্রান্ট’ নামে একটি মুভি নির্মাণ করে চ্যাপলিন। ১৯১৮ সালে নির্মাণ করেন ‘এ ডগস লাইফ’ মুভিটি। এই মুভিটিতে চ্যাপলিন দরিদ্র মানুষের জীবন ও একটি কুকুরের জীবনের মধ্যে পার্থক্য ফুটিয়ে তোলেন। 

একই বছর তিনি নির্মাণ করে ‘শোল্ডার আর্মস’ নামে আরেকটি বিখ্যাত মুভি। ১ম বিশ্বযুদ্ধকে বিদ্রুপ করে এই মুভিটি নির্মাণ করা হয়। ১৯২১ সালে নির্মাণ করেন ‘দ্য কিড’ মুভিটি। চার্লি চ্যাপলিনের জনপ্রিয়তার পেছনে যেই মুভিটির অবদান অন্যতম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমেরিকার বাস্তবচিত্রের এক প্রতিছবি বলা যেতে পারে ছবিটিকে। বিশেষ করে হাজার হাজার অনাথ শিশুদের ভাগ্যে কি ঘটেছিল এবং দারিদ্র্যের কারণে কিভাবে মায়েরা তাদের শিশু সন্তানকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছিল তার একটি প্রামাণ্য দলিল বলা যেতে পারে এই ছবিটিকে। এই ছবিতে চার্লি চ্যাপলিন এবং শিশু জ্যাকি কুগানের অভিনয় দর্শকদের বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল। 

১৯২৪ সালে এসে চ্যাপলিন নির্মাণ করেন তার আরেক জনপ্রিয় মুভি ‘দ্য গোল্ড রাশ’। এই মুভিটির কাহিনী ছিল ভয়াবহ। ১৮৯৮ সালের স্বর্ণ-অভিযানের একটি সত্যিকারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চ্যাপলিন এ ছবিটির চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন। বরফের মরুভূমিতে সোনা পাওয়া যাচ্ছে এমন এক গুজবের উপর ভিত্তি করে ১৫০ জন অভিযাত্রী বরফের মরুভূমিতে পাড়ি জমান। দুর্ভাগ্যক্রমে মাত্র ১৮ জন জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে পারেন। যারা জীবিত ছিলেন তারা মৃতদের মাংস, কুকুরের মাংস এমনকি জুতোও সিদ্ধ করে খেয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে চ্যাপলিন নির্মাণ করেন ‘দ্য সার্কাস’ মুভিটি। এই মুভিটিতে চ্যাপলিন তুলে ধরেনপ্রমোদ শিল্পের অধিপতিদের টাকা রোজগার করার নোংরা নেশাকে। শিল্পী বা শিল্পের প্রতি তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ১৯২৮ সালেই আমেরিকাতে অস্কার পুরস্কার নিয়ম চালু করা হয়। সে বছরই অলরাউন্ডার চার্লি চ্যাপলিন ‘দ্য সার্কাস’ মুভিটির জন্য লেখক, প্রযোজক, অভিনেতা এবং পরিচালক হিসেবে অস্কার পুরস্কারের সম্মানে ভূষিত হন।
এরপর তিনি নির্মাণ করেন ‘মডার্ণ টাইমস’ মুভিটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চার্লি চ্যাপলিন নির্মাণ করেন ‘মঁসিয়ে ভের্দু’ মুভিটি। এই মুভিটি মুক্তি পাওয়ার বুর্জোয়া সমালোচকরা চ্যাপলিনের পেছনে উঠেপড়ে লাগেন। কেননা চ্যাপলিন এই মুভিটিতে ফুটিয়ে তোলে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার অনাচারকে। এই মুভিটির কারণে চ্যাপলিনকে আমেরিকায় বসবাসেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আমেরিকা ছাড়ার আগে চার্লি চ্যাপলিন ‘লাইম লাইট’ নামে আরেকটি মুভি নির্মাণ করেন। লাইমলাইট ছবিটির শেষ দৃশ্যটি শতবর্ষের সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম একটি অসাধারণ দৃশ্য।

জীবনের শুরুটা টা যেমন দুর্ভাগ্যের শাসনে কেটেছিল এই কিংবদন্তির, ঠিক তেমনি শেষটাও আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল দুর্ভাগ্য আর নিঃসঙ্গতায়। ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বরে চার্লি প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান সুইজারল্যান্ডের কার্সিয়ারে । ওই দেশের ডিঙ্গিতে চার্লির শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু পরের বছর চার্লির মৃতদেহ চুরি হয়ে যায় । ১৬ দিন পরে তা উদ্ধার করে আবার সমাহিত করা হয় । 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com