দিনাজপুরে বন্যায় ৮শিশুসহ ১৫ জনের মৃত্যু, আরও দুই জেলায় ৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি

৩৮ বার পঠিত

দিনাজপুরে বন্যায় চার উপজেলায় ৮ শিশুসহ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ১ জন নিখোঁজ রয়েছে। এদিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা দুপুর থেকে উদ্ধার কাজ শুরু করেছে। এ পর্যন্ত ৬৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ৯০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা মোকলেসুর রহমান জানান, বিরল উপজেলার বন্যায় পানিতে ডুবে ৫ জন ও সাপের কামড়ে ১ জন মারা গেছে। এরা হলেন- হাসিলা গ্রামের আব্দুর রহমানের মেয়ে চুমকি (১৩), ছেলে শহিদ আলী (১০) ও সিয়াদ (৭), প্রতিবেশী সাঈদ হোসেনের ছেলে সিহাদ (৭), মালঝাড় এলাকার বাবলু রায়ের স্ত্রী দিপালী রায় (৩২), মালঝাড় এলাকার বাবলু রায়ের স্ত্রী দিপালী রায় (৩২)।

কাহারোল উপজেলায় একই পরিবারের ৪ শিশুসহ ৫ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন। কাহারোল থানার ওসি মনসুর রহমান জানান, রোববার বেলা সাড়ে ৩টায় উপজেলার ঈশ্বরগ্রাম থেকে নিজের তিন সন্তান ও প্রতিবেশী এক শিশুকে নিয়ে কলা গাছের ভেলায় চড়ে বিরল উপজেলার হাসিলা গ্রামে বাড়িতে যাচ্ছিলেন আব্দুর রহমানের স্ত্রী সোনাভান বেগম। এ সময় ভেলা উল্টে চার শিশুর মৃত্যু হয় বলে জানান তিনি। একজনের পরিচয় জানা যায়নি।এদিকে দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ী ঢিবিপাড়া এলাকার মেহেদী হাসান (১৫), মির্জাপুর এলাকার আবু নাইম (১৩) ও সদরের দরবারপুর গ্রামের মেহের আলীর ছেলে চাঁন মিয়া (৫৫) পানিতে ডুবে মারা যায়। নিখোঁজ রয়েছে একজন। এছাড়াও বীরগঞ্জ উপজেলায় ১ জন শিশু মারা গেছে বলে জানা গেছে।

বন্যা দুর্গত মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা হিসাবে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা ও ৬৭ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ৫০ লাখ টাকা ও ৩০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম ১৪ জন মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই সেনাবাহিনী বিজিবি সদস্যরা উদ্ধার কাজ শুরু করেছে।

লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামঃ

লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উজানের ঢলে তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও সানিয়াজান নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় লালমনিরহাট জেলার ৫টি উপজেলায় ও কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে দুই জেলার চার লাখ করে প্রায় আট লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানিবন্দি পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অসহায় পরিবারগুলোর মাঝে দেখা দিয়েছে তীব্র খাবার সঙ্কট।

রোববার বিকেলে তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সকালে তিস্তার পানি বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ব্যারাজটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৪৪টি গেট খুলে দেয়া হয়। তিস্তার পানি কমছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানালেও এখনও অনেক এলাকা জলমগ্ন। অন্যদিকে, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় রোববার বিকেলে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১২৪ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি ৩৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের কাঁঠালবাড়ী, রাজারহাটের কালুয়া ও ফুলবাড়ীর গোড়কমন্ডল এলাকায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক ভেঙে যাওয়ায় এবং এর ওপর পানি ওঠায় জেলার সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। জেলার ৯ উপজেলার ৫৭ ইউনিয়নের প্রায় ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দি। বন্যায় ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ৬০৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। পানিতে ডুবে যাওয়ায় ৮৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা পাড়ে মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে যাওয়ার জন্য বার বার মাইকিং করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ। সদরের কাউয়াহাগা এলাকায় বিদ্যুতের টাওয়ার ভেঙে পড়ায় সকাল থেকে জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ টিম মাঠে নেমেছে। সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খানের সভাপতিত্বে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।

হাতীবান্ধা উপজেলায় পনিবন্দি পরিবারগুলো মহাসড়কে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি এবং গোখাদ্য সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বন্যাকবলিত এলাকায় এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছায়নি। উপজেলা ফকিরপাড়া ইউনিয়নের রমনীগঞ্জ গ্রামের সফির আলী (৫০) বলেন, আমরা তিন দিন ধরে পানিবন্দি। এখনও কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে মহাসড়কে তাবু টাঙিয়ে কোনো মতে না খেয়ে বেঁচে আছি।এদিকে, লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলায় রেলপথ ভেঙে যাওয়ার কারণে রোববার সকাল থেকে লালমনিরহাট-বুড়িমারী রুটে রেল যোগোযোগ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা গেছে। পানির প্রবল বেগে ঝুঁকিতে রয়েছে মহাসড়কের একটি ব্রিজ। হাতীবান্ধা ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন মহসড়কের ওই ব্রিজটি যেকোন মুহূর্তে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা।

এর মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য মানুষের ঘরবাড়ি। ঝুঁকিতে রয়েছে আদিতমারী উপজেলা সলেডি স্পার-২ বাঁধটিও। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ মানবেতর জীবন-যাপন করছে। বন্যার্তদের ত্রাণ সহায়তা দিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কাজ করলেও ভারি বর্ষণ আর পানির কারণে তা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক সফিউল আরিফ বলেন, জেলার ৩৫টি ইউনিয়নে প্রায় ৯৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি আছে বলে আমরা ধরণা করছি। এসব পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় ৮৭টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। বন্যায় প্লাবিত হয়েছে ৫৭টি ইউনিয়ন। ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ১৭ জন। এছাড়া পানিতে ডুবে যাওয়ায় ৮৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com