আজ বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

১০১ বার পঠিত

পাহাড় আর সাগরের অপূর্ব মিতালীর ‘কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক’ এখন বিশ্বের দীর্ঘতম ও একমাত্র সমুদ্র সড়ক। শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর এটি যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শনিবার সকালে ৮০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এ সড়কটি উদ্বোধনের জন্য কক্সবাজার সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সফরে তিনি মেরিন ড্রাইভ সড়ক ছাড়াও সাতটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ঘোষণা এবং আটটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। সরকারি সফরসূচি শেষে দুপুরে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় যোগ দেবেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কক্সবাজার সফরকে সফল করতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। এমনিতেই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের নগরী কক্সবাজার। পাহাড় আর সাগরের অপূর্ব মিতালীর সৌন্দর্যে গড়া মেরিন ড্রাইভ সড়কটি ভ্রমণ পিপাসু যে কাউকে বিমোহিত করবে। এ ছাড়া সমুদ্রের কোলঘেঁষে নির্মিত এ সড়কটিতে প্রতিনিয়ত আছড়ে পড়া উচ্ছ্বসিত ঢেউ, বিস্তৃর্ণ বেলাভূমি, সারি সারি ঝাউবীথি আর উঁচু-নিচু পাহাড়ে বেড়াতে আসা পর্যটকদের প্রকৃতির মমতার পরশ বুলিয়ে দেবে।

দুই যুগ আগে ১৯৯৩ সালে শুরু হওয়া ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের প্রকল্পটির তিন ধাপে নির্মাণকাজ শেষ হয় এ বছর এপ্রিল মাসেই। এখনো সড়কটির সৌন্দর্য বর্ধনের কিছু কাজ অবশিষ্ট থাকলেও কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত শেষ হয়েছে যানবাহন চলাচলের উপযোগী নির্মাণকাজ। পাহাড়, সাগর আর নদীর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে গড়া এমন দীর্ঘতম ও অবিচ্ছেদ্য সমুদ্র সড়ক পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই বলে জানিয়েছেন সড়কটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন (ইসিবি) ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী হাসান।

মেহেদী হাসান বলেন, প্রকৃতির নান্দনিক সৌন্দর্যে গড়া সমুদ্রের কোলঘেঁষে মেরিন ড্রাইভ সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯৩ সালে। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজ শুরু হলেও ১৯৯৪ সালে প্রকল্পটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশে প্রকল্পটি পুনরায় সেনাবাহিনীর ইসিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপরই নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পন্ন হয় প্রকল্পটির নির্মাণকাজ।

তিনি জানান, তিনধাপে এ সড়কটির প্রথম পর্যায়ের কলাতলী থেকে ইনানী পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটারের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০৮ সালে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে ইনানী থেকে শিলখালী পর্যন্ত আরো ২৪ কিলোমিটারের কাজ সম্পন্ন হয় ২০১৬ সালের জুন মাসে। এ ছাড়া তৃতীয় পর্যায়ে শিলখালী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয় এ বছর এপ্রিল মাসেই।

তৃতীয় পর্যায়ের ২০১৫ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজের কার্যাদেশের শেষ সময় ছিল আগামী ২০১৮ সাল পর্যন্ত। কিন্তু সেনাবাহিনীর ১৬ ইসিবির সদস্যদের সময়োপযোগী কাজ, সিদ্ধান্ত ও অক্লান্ত মেধা-পরিশ্রমের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের এক বছর আগেই পুরো সড়কটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে দ্রুততার সঙ্গে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে প্রকৃতির অনেক বিরূপতার পাশাপাশি নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়েছে বলে জানান সেনা কর্মকর্তা মেহেদী।

তিনি বলেন, কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে সেনা সদস্যদের নানাভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে রাস্তাটি প্রতিনিয়ত ভাঙনের সম্মুখীন হওয়াই ছিল মূল প্রতিবন্ধকতা। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে প্রায়শই রাস্তাটির নির্মাণকাজের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সড়কের ভেঙে যাওয়া অংশ প্রতিনিয়ত পুনঃনির্মাণ করতে হয়েছে। তা ছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছানোও ছিল কষ্টসাধ্য।

সেনাবাহিনীর কক্সবাজারস্থ ১৬ ইসিবির অধিনায়ক মেহেদী জানান, প্রকল্পটির জমি অধিগ্রহণসহ আনুষঙ্গিক নির্মাণকাজে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন কক্সবাজারের ইউনিট ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়ুয়া বলেন, সমুদ্রের কোলঘেঁষে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ ৮০ কিলোমিটারের নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠায় এ অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেল। যা স্থানীয় জনগণের জন্য আর্থ-সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এ সড়কের কারণে বেড়ে যাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের পাশাপাশি মৎস্য প্রকল্পেরও উন্নয়ন। সড়কটি স্থানীয় বাসিন্দাদের লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকেও রক্ষা করবে বলে জানান তিনি। তবে দীর্ঘতম এ সমুদ্র সড়কটি দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেও মন্তব্য করেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সড়কটি নির্মিত হওয়ায় টেকনাফের সাবরাংয়ে প্রস্তাবিত ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন’ এর কার্যক্রমও দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাবে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফরকে সফল, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ চূড়ান্ত হয়েছে। তিনি কক্সবাজার এসে সম্পন্ন হওয়া সাতটি উন্নয়ন প্রকল্প এবং নতুন করে আরো আটটি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ছাড়া উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পগুলো হলো- প্রথমবারের মতো বোয়িং বিমান অবতরণের মধ্য দিয়ে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে, কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজের একাডেমিক ভবন, কক্সবাজার সরকারি কলেজের একাডেমিক ও হোস্টেল ভবন এবং কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের হোস্টেল ভবনসহ আরো কয়েকটি প্রকল্প।

এ ছাড়া নতুন করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে, কক্সবাজার শহরের কস্তুরাঘাট এলাকায় বাঁকখালী নদীতে দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার-খুরুশকূল সংযোগ সেতু এবং টেকনাফের নাফ নদীর জালিয়ার দ্বীপে এক্সক্লুসিভ ‘নাফ ট্যুরিজম পার্ক’সহ আরো কয়েকটি প্রকল্পের। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. ইকবাল হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফলকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তার বলয়। পুরো কক্সবাজারে এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।

এদিকে দলীয় প্রধান ও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার কক্সবজার সফরকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শনিবার দুপুরে আয়োজন করা হয়েছে বিশাল জনসভার। সরকারি সফরসূচি শেষে আ.লীগ নেত্রী ভাষণ দেবেন দলের জনসভায়। এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে জনসভা সফল করতে দলের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রীর জনসভা সফল করতে জেলা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সকল ইউনিটের নেতা-কর্মীরা গত এক সপ্তাহ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জেলাব্যাপী পোস্টারিং, মাইকিং, গণসংযোগ, পথসভা ও হাটসভার আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এবারকার কক্সবাজার সফর অত্যন্ত গুরুত্ববহ বলে মন্তব্য করেন আ.লীগের এ নেতা।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com