জঙ্গিরা এবার এমএলএম ব্যবসা ধরেছে

১১৫ বার পঠিত
খলিলুর রহমান :  নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর সদস্যরা টাকার যোগান পেতে এবার এমএলএম ব্যবসার পথ ধরছে বলে জানা গেছে। ওই ব্যবসা তারা করছে অনলাইনের মাধ্যমে। সম্প্রতি র্যা বের অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

 

র‌্যাব জানায়, সম্প্রতি জেএমবি’র জঙ্গিরা অনলাইনভিত্তিক এমএলএম কম্পানির মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এমন সংবাদ তাদের কাছে এলে তারা অনুসন্ধানে নামে। এক পর্যায়ে ‘নতুন দিগন্ত’ নামে একটি অনলাইন ই-কমার্স জাতীয় এমএলএম কম্পানির সঙ্গে জড়িত আট জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছে, জামাল ওরফে রাসেল জিহাদী (৩৫), খন্দকার আবু নাঈম ওরফে নাঈম জিহাদী (৪৯), নুরুল আবছার (২৭), মহসিন (৫২), জাবির হাওলাদার (২২), আক্তারুজ্জামান ওরফে মারুফ (৩২), হাফেজ মাওলানা ওমর ফারুক (৩২) ও কাশেম মুন্সি (৩১)।

 

র‌্যাব জানায়, আটকরা এমএলএম কম্পানির নামে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ওই কম্পানিগুলো র‌্যাবের হাতে আটক জেএমবি’র সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সদস্য জামাল, নাঈম ও আবছার পরিচালনা করত। তাদের মধ্যে আবছারের ডেসটিনিতে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে তারা তারা ঘন ঘন কম্পানির নাম পরিবর্তন করে।

 

র‌্যাব আরো জানায়, গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধিতে তারা গ্রাহকদেরকে লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে থাকে। তাদের যে কোনো গ্রাহক নির্দিষ্ট পণ্য বা নির্দিষ্ট দোকান থেকে কেনাকাটা করলে পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ ছাড় পেয়ে থাকে। এমএলএম কম্পানিও পণ্যের উপরে ১০ শতাংশ কমিশন পেয়ে থাকে। তাদের কম্পানিতে সদস্য হতে হলে ব্যক্তিগত বিবিধ তথ্য, যেমন নাম, ঠিকানা, ছবি, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি বা নম্বর ইত্যাদি তথ্য তাদের দিতে হয়। এক পর্যায়ে তারা ওই ব্যক্তি বা গ্রাহকের ফেসবুক আইডি সংগ্রহ করে বা সার্চ করে ওই ব্যক্তির ফেসবুক আইডি বের করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। পরবর্তীতে তার কাছে বিভিন্ন উগ্রবাদী পোস্ট পাঠাতে থাকে।

 

এদিকে, র‌্যাবের হাতে আটক আট জেএমবি সদস্য জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, এমএলএম কম্পানির গ্রাহকদের তথ্য দিয়ে তারা তাদের সংগঠনের সদস্যদের জন্য ভুয়া নথিপত্র তৈরী করত। ভুয়া নথিপত্রগুলো তৈরীতে মূলত আবু নাঈম মূল ভূমিকা পালন করে। এ কাজে সে তার জমি বিক্রির দালালির অভিজ্ঞতা কাজে লাগায়। কম্পিউটার কম্পোজের কাজটি করতো কম্পিউটার ও মোবাইল সার্ভিসিংয়ে দক্ষ মারুফ ও জাবির। তৈরীকৃত ভূয়া নথিপত্রগুলো জামাল ওরফে রাসেল জিহাদী তাদের গ্রুপের অপর সদস্য কাসেম ও মোহসিনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে পাঠাতো।

 

থ্রমা,ইমো, ওয়াসট এ্যাপস ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে জানিয়ে আটক জেএমবি সদস্যরা জানায়, তারা বেশ কয়েকবার শনির আখড়ার একটি লাইব্রেরী ও কুমিল্লার কয়েকটি স্থানে মিলিত হয়েছে। ওই সকল স্থানে তাদের সংগঠনের কয়েকজন ”বড় ভাই” আসতো এবং তাদের বিবিধ নির্দেশনা দিত।

 

আটক আটজন যেভাবে জঙ্গির কার্যক্রমে জড়িত হয় :

 

র‌্যাবের হাতে আটক জামাল উদ্দিন ওরফে রাসেল জিহাদী পেশায় ব্যবসায়ী। সে এসএসসি পাস করার পর ২০০১ সালে বক্সীবাজার নিডাসা থেকে কম্পিউটার হার্ডওয়ারের উপর দুই বছরব্যাপী ডিপ্লোমা করে। সে মূল দলটির প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন এবং এমএলএম কম্পানিটি পরিচালনা করে থাকে। সে ছাত্রাবস্থা হতে শিবিরের সঙ্গে জড়িত। ২০১৫ সালের শেষের দিকে কথিত বড় ভাই বা হুজুরের মাধ্যমে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপে জুটে যায়। ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে বিস্ফোরক তৈরীর উপর চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণ গ্রহন করে। তার মাধ্যমে সোহেল, আবু নাঈম, নুরুল আবছার ও জাবির হাওলাদার জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়। সে তাদের দলের সোহেলকে হাতেকলমে বিস্ফোরক তৈরী ও ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

 

খন্দকার আবু নাঈম ওরফে খন্দকার আবু সাঈদ ওরফে খন্দকার আবু সাইয়ুম ওরফে নাঈম জিহাদীও সারোয়ার-তামিম গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। সে একজন গ্রাজুয়েট এবং জমির দালালীর সঙ্গে জড়িত। ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে সে জামালের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়ায়।

 

জাবির হাওলাদার ওরফে জাবির পটুয়াখালী স্কুলে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত এবং পরে আলিয়া মাদ্রাসায় এক বছর পড়াশুনা করে কম্পিউটার পরিচালনা ও গ্রাফিক্স শেখে। পিতা-মাতার বিচ্ছেদের কারণে মানসিক হতাশা থেকে সে নিজে থেকেই জঙ্গিবাদে জড়ায়। পরবর্তীতে জনৈক সোহেলের সাথে পরিচয়ের সূত্রে ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে এ দলের অন্তর্ভূক্ত হয়।

 

মো. আকতার ওরফে আকতার হোসেন ওরফে আক্তারুজ্জামান ওরফে মারুফ ২০০৪ সালে রাঙ্গা প্রাইমারী স্কুলে ৫ম শ্রেণী এবং দশপাড়া হযরত দবির উদ্দিন দাখিল মাদ্রাসায় দাখিল পর্যন্ত পড়েছে। বিভিন্ন মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে কাজ করে মোবাইল পরিচালনায় পাশাপাশি কম্পিউটার পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করে। গৌরীপুর বাজার, কুমিল্লায় তাইফা টেলিকম নামে তার মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকান আছে। তার দোকানটি জঙ্গি সংগঠনের কাজে ব্যবহৃত হয়।

 

ওমর ফারুক উত্তরার বায়তুল সালাম মাদ্রাসায় ২০০৬ সালে হেফজ পর্যন্ত লেখাপড়া করে। পরে দেবীদ্বার রামপুর মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে। সে বর্তমানে গৌরিপুর এলাকায় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক। সে সোহেলের মাধ্যমে ২০১৬ সালে জঙ্গিবাদে জড়ায়। সে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করতে ধর্মীয় বিষয়ে নানা রকম অপব্যাখ্যা দিত।

 

আবুল কাশেম মুন্সী ওরফে কাশেম ২০০২ সালে গৌরিপুর সুবল আকতার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৪ সালে মুন্সী ফজলুর রহমান সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। পরে হাসানপুর কলেজ দাউদকান্দিতে বিএসসিতে ভর্তি হয়। ২০০৭ সাল পর্যন্ত সে পড়াশোনা করে এবং ৩য় বর্ষে ফেল করে। ২০১৬ সালের শুরুর দিকে মারুফ ও সোহেলের মাধ্যমে জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপে যোগদান করে। সে সিলেটে অস্ত্র প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে বলে জানা গেছে।

 

মোহসেন উদ্দিন শিবচরের মির্জার চর সিনিয়ার মাদ্রাসা থেকে ১৯৮৩ সালে দাখিল এবং ১৯৮৫ সালে আলিম, মাদারীপুর আহাম্মদিয়া আলিয়া মাদ্রাসা হতে ১৯৮৭ সালে ফাজেল এবং ১৯৮৯ সালে কামেল পাস করে। সে প্রগতি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ রায়েরবাগ-এর নাইট গার্ড এবং সাইন বোর্ডে অবস্থিত নবনির্মিত পারিজাত মার্কেটে সদ্যপ্রতিষ্ঠিত ঔষধের দোকানের মালিক। জামাল ওরফে রাসেল জিহাদীর মাধ্যমে সে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়। রাসেল জিহাদীর পরিকল্পনায় তার দোকানটি “নতুন দিগন্ত” নামে অনলাইনভিত্তিক এমএলএম কম্পানির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সেখানে নানা ছদ্মবেশে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের আসা-যাওয়া ছিল, যাতে বিভিন্ন গোপন বৈঠক এবং পার্সেল বিনিময় হতো।

 

নুরুল আবছার ওরফে পলাশ ডগাইর দারুল সুন্নাত ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ২০০৫ সালে দাখিল এবং ২০০৭ সালে আলিম পাস করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামিক ষ্টাডিজে অনার্স এবং ২০১৪ সালে মাষ্টার্স পাস করে। বর্তমানে সে বাংলাদেশ হোমিও মেডিক্যাল কলেজ ডিএইচএমএসের প্রথম বর্ষের ছাত্র। সে শিবির কর্মী ছিল এবং ‘নতুন দিগন্ত’ এমএলএম-এর সাথে সংযুক্ত ছিল। ডেসটিনিতে কাজ করার সুবাদে এই ব্যবসায় তার জ্ঞান কাজে লাগে। জামাল উদ্দিন ওরফে রাসেল জিহাদীর মাধ্যমে সে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়। সে মূলত উগ্রবাদী কোন কোন পোষ্ট ভাইরাল করতে হবে এবং কোন কোন গ্রাহকদের নিকট কি ধরনের পোষ্ট প্রেরণ করতে হবে তার ব্যাপারে পরামর্শ দিত।

 

এদিকে, আট জেএসবি’র সদস্যকে আটক করার পর র্যাপব-১১ এর প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে লে. কর্নেল কামরুল হাসান জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে শুক্রবার ভোর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সাইনবোর্ড এলাকার একটি মার্কেট ও কুমিল্লার গৌরিপুর এলাকা থেকে এই আটজনকে আটক করা হয়েছে। তারা সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর সরোয়ার-তামিম গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। তারা প্রায় দেড় বছর থেকে একত্রিত রয়েছে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্টাফ রিপোর্টার

Bogra Offce

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com