ভিডিও কেইস নোটিশ, যাচ্ছে গাড়ির মালিকের ঠিকানায়!

৮১ বার পঠিত

আলী মোহাম্মদ ঢালী # ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে গেলেই ভিডিও করা হচ্ছে। ভিডিও দেখে নোটিশ পৌঁছে যাচ্ছে গাড়ির মালিকের ঠিকানায়। পরে গাড়ির মালিককে ট্রাফিক জোনে সাত দিনের মধ্যে ডেকে এনে ভিডিও দেখিয়ে করা হচ্ছে জরিমানা ও সিস করা হচ্ছে ব্লু-বুক। আর এটাকে  বলা হয় ভিডিও কেইস বা সচিত্র মামলা। এমনই একজন ইকবাল চৌধুরী। বিকেল ৫টায় অফিস শেষে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বাসায় ফিরছিলেন। এয়ারপোর্ট রোড হয়ে তার গাড়িটি হাউজবিল্ডিং এর সামনে পৌঁছালে হঠাৎ চালক জানালেন গাড়িতে গ্যাস নেই। লাল সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। পাশে গাড়িটি সাইড করে রিকশাযোগে উত্তরা ৬ নম্বর রোডে বাড়ির উদ্দেশে রওনা করলেন ইকবাল চৌধুরী। আর চালককে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস নিয়ে বাসায় ফিরতে বললেন।

নির্দেশনা অনুযায়ী চালক গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেলেন সিএনজি স্টেশনে। গ্যাস নিয়ে বাসায় ফিরলেন। কিন্তু বাসায় ফেরার সময় আধা কিলোমিটার পথ তিনি উল্টো পথে গাড়ি চালিয়েছেন। তবে এ সময় ট্রাফিক তাকে কোনো সংকেতও দেয়নি। বাসায় ফিরে গাড়ি রেখে চালক চলে গেলেন নিজ বাসায়। এর তিন দিন পরে ইকবাল চৌধুরীর ঠিকানায় ট্রাফিক উত্তরা বিভাগের নোটিশ। সেখানে বলা হয়েছে, তার গাড়ি আইন ভঙ্গ করে উল্টো পথে চলেছে। সাত দিনের মধ্যে তাকে ট্রাফিকের উত্তরা জোনে হাজির হওয়ার জন্য বলা হলো।

নির্দেশনা মোতাবেক ইকবাল চৌধুরী ট্রাফিকের উত্তরা জোনে হাজির হলেন। তার গাড়ি উল্টো পথে চলেছে- সেই ভিডিও ইকবাল চৌধুরীকে দেখানো হলো। ভিডিও দেখা শেষে আইন ভঙ্গের জন্য তাকে ১৬শ’ টাকা জরিমানা করে ব্লু-বুক সিস করা হলো। পরবর্তিতে ইউক্যাশের মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধ করে গাড়ির ব্লু-বুক সংগ্রহ করলেন ইকবাল চৌধুরী। আইন ভঙ্গ করে এমন জরিমানার শিকার শুধু ইকবাল চৌধুরী নয়, হয়েছেন রাজধানীর অনেক গাড়ি মালিকই। এটা মূলত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের নতুন সংযোজন। এই প্রক্রিয়ার নামকরণ করা হয়েছে ভিডিও কেইস বা সচিত্র মামলা।

সচিত্র মামলার বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিকের উত্তরা জোনের উপকমিশনার (ডিসি) প্রবীর কুমার রায় বলেন, ‘ট্রাফিক জোনের নতুন এই সেবাটি বেশ কাজে দিচ্ছে। এই সার্ভিস চালুর পর থেকে উত্তরা জোনে গাড়ি চালকদের মধ্যে এক প্রকারের ভীতির সঞ্চার হয়েছে। আর এই ভীতির কারণেই এখন এই জোনেরর চালকদের মধ্যে আইন ভঙ্গ করার প্রবণতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।’ একই ভাবে ট্রাফিকের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ জোনে কথা বলে জানা যায়, নতুন এই সার্ভিসটির কারণে এখন সড়কে চালকদের আইন ভঙ্গ করার প্রবণতা অনেকটাই কমে এসেছে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্যানুয়াযী, পরীক্ষামূলক ভাবে ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ট্রাফিকের পশ্চিম ও উত্তরা জোনে এই সার্ভিসটি চালু করা হয়। সে বছর ৬ হাজার ৭৪৯টি গাড়িকে সাজা দেয়া হয়েছে। এরপর চলতি বছরের শুরুতেই ট্রাফিকের দক্ষিণ ও পূর্ব জোনে এই সার্ভিস চালুর মধ্যদিয়ে পূর্ণাঙ্গ ভাবে ভিডিও কেইস কার্যক্রম শুরু করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে উল্টোপথে চলাচল, সিগন্যাল অমান্য ও যত্রতত্রভাবে পার্কিং করা থেকে গাড়ি মালিকদের বিরত রাখতে এই সার্ভিসটি চালু করেছে ট্রাফিক বিভাগ। এই সার্ভিসের আওতায় প্রতিটি ট্রাফিক জোনে একটি করে টিম রয়েছে। টিমে একজন অফিসার এবং তার সহযোগী হিসেবে রয়েছে আরো ৬ জন ট্রাফিক সদস্য।

তথ্যানুযায়ী, রুটিন করে ভিডিও টিমগুলো একেক দিন একেকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করেন। এসময় যেসব গাড়ি উল্টো পথে চলাচল করে, সিগন্যাল অমান্য করে বা যত্রতত্র পার্কিং করে রাখা গাড়ি সমূহের ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে ওই ভিডিও থেকে গাড়ির নম্বর সংগ্রহ করে পাঠানো হয় বিআরটিএ তে। সেখান থেকে গাড়ির মালিকের ঠিকানা সংগ্রহ করা হয়। পরে গাড়ির মালিকের বাসায় একটি নোটিশ পাঠিয়ে তাকে এক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাফিকের সংশ্লিষ্ট উপকমিশনার (ডিসি) অফিসে হাজির হতে বলা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযুক্ত গাড়ির মালিক ডিসি অফিসে হাজির হলে তাকে আইন ভঙ্গের ভিডিওটি দেখিয়ে মামলা দেয়া হয়।

এ বিষয়ে ট্রাফিকের অতিরিক্ত কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় যে পরিমাণ গাড়ি রয়েছে সে তুলনায় ট্রাফিক সদস্য নেই। যারা আছেন, তাদের বেশির ভাগ সময় রাস্তার সিগন্যাল সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। আর এই সুযোগটি নিয়ে কিছু অসাধু চালক আইন ভঙ্গ করে দ্রুত গতিতে গাড়ি উল্টো পথে চালিয়ে যায়। আবার কিছু চালক আছে যারা যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করে দূরে আড়ালে লুকিয়ে থাকে। তারা মনে করে, তাদের না পেলে সার্জেন্টতো মামলা দিতে পারবে না। এসব সমস্যা সমাধানে উন্নত দেশগুলোতে সড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগিয়ে আইন ভঙ্গ করা গাড়ির ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে ওইসব গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। আমরাও সেই ফর্মুলাতে কাজ করছি। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাথমিকভাবে ম্যানুয়ালি ভিডিও সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তিতে আমরাও চেষ্টা করবো গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করে ভিডিও কেইস করার। এতে একদিকে যেমন আইন ভঙ্গ করার প্রবণতা কমবে তেমনই হ্রাস পাবে প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানোর প্রবণতাও।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সার্ভিসটি চালু করার পরে এখন উল্টো পথে যানবাহন চলাচলের হার অনেকটাই কমে এসেছে। কিন্তু এখনও বিষয়টি সবাই অবগত না হওয়ায় অনেকেই আইন ভঙ্গ করছেন। কিন্তু আমরা প্রত্যেকটি ডিসি অফিস থেকে গাড়ির মালিক এবং চালকদের বিষয়টি অবহিত করছি। তারা যেখানে যেভাবেই আইন ভঙ্গ করুক না কেনো, তা ঠিকই আমাদের ভিডিও টিমের কাছে ধরা পরবে। এবং তাদের মামলার সম্মুখিন হতেই হবে।’

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে মামলার সংখ্যা, জরিমানার পরিমাণ ও রেকারিং এর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাস্তাকে সচল রাখা ও যানবাহনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ২০১৬ সালে এক লক্ষ্য ৭০ হাজার ৮২৩টি গাড়ি রেকার করেছে। একই সময়ে ১০ লক্ষ ৫১ হাজার ৩৯৫ টি গাড়িকে মামলা দিয়ে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৩৭ কোটি ১০ লাখ ২০ হাজার ২২৬ টাকা। এর আগের বছর অন্তত ২০১৫ সালেও এই সংখ্যা ছিলো অর্ধেকেরও কম। ওই বছর ৫ লাখ ৬ হাজার ৬৬৩টি গাড়িকে মামলা দিয়ে জরিমানা আদায় করা হয়েছিলো ১৮ কোটি ২৮ লক্ষ ৯৫ হাজার ৯৫০ টাকা।  

রাজধানীতে যান চলাচল স্বয়ংক্রিয় ভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য ১০০ টি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশন চিহ্নিত করে ৯২টিতে অটোমেটিক এবং রিপোর্ট কন্ট্রোল নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের অধীনে বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় সিএএসই (ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেনঅ্যাবল ইনভারমেন্ট) প্রকল্পের আওতায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল অনুযায়ী যানবাহন চলাচলের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। কিন্তু এই প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ রুপে বাস্তবায়ন হলে অটোমেটিক পদ্ধতিতে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করবে ডিএমপি। আর এ কারণে ইতোমধ্যেই রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেমের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারের সমন্বয়ে ডিএমপির ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন ইউনিট গঠন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

<

p style=”text-align: right;”>–ব্রেকিংনিউজ

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com