আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস

৮২ বার পঠিত

“আমি হিমালয় দেখেনি, আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি” তিনি আর কেউ নয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন আজীবন সংগ্রামী জীবনের অভিযাত্রী। বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশে তিনি আজও ছড়িয়ে চলেছেন নাক্ষত্রিক প্রভা। কালজয়ী এ মানুষটির মন্ত্রমুগ্ধ আহ্বানে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলার লাখো মুক্তিপাগল মানুষ। মানুষের হৃদয়ে পরম যত্নে রাখা পরম পুরুষকে তাই শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ। কারণ তিনি মানুষের মুক্তির জন্য লড়েছেন। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আজ শুক্রবার বঙ্গবন্ধুর ৯৭তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস। তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা দেশের নন্দিত প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটি। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বেতার, টেলিভিশন ও দৈনিকগুলো প্রচার ও প্রকাশ করবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান,  ক্রোড়পত্র।

১৯৯৬ সাল থেকে দিবসটিকে সরকারিভাবে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, বিভিন্ন পর্যায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনটি পালন করবে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। এ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এতে অংশ নিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী আজ টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছেন। তাঁরা সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণসহ বাদ জুমা দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে অংশ নেবেন। এ ছাড়া শিশু সমাবেশ, আলোচনাসভা, গ্রন্থমেলা, সেলাই মেশিন বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হাজির থাকবেন, ‘খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামের আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘুরে দেখবেন।

আজ সারা দিন বাজবে ৭ মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মসজিদে মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনাসভা হবে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাঁর বাণীতে শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনো আপস করেননি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আপামর জনগণ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করে বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাণীতে দেশের প্রকৃত ইতিহাস ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি শিশুদের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত এবং আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

অবিসংবাদিত নেতা, জাতির জনক : বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি, হাজারো বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তদানীন্তন ভারত উপমহাদেশের বঙ্গ প্রদেশের ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর বাবার নাম শেখ লুত্ফর রহমান। মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। পরিবারের চার মেয়ে ও দুই ছেলের সংসারে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয় সন্তান। সেদিনের টুঙ্গিপাড়ার অজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা ‘খোকা’ নামের সেই শিশুটি পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারী। গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ ও জনগণের প্রতি অসাধারণ মমত্ববোধের কারণেই পরিণত বয়সে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা ‘বঙ্গবন্ধু’। কিশোর বয়সেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হন, কারাবরণ করেন।

এর পর থেকে শুরু হয় তাঁর আজীবন সংগ্রামী জীবনের অভিযাত্রা। মেট্রিক পাসের পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের মতো নেতার সান্নিধ্য পান। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ঢাকায় ফিরে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় এগোতে থাকেন তিনি। বঙ্গবন্ধু তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে ১৯৪৮ সালে গঠন করেন  বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। পরের বছর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে তার যুগ্ম সম্পাদক করা হয় শেখ মুজিবকে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে পরে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নাম রাখা হয় আওয়ামী লীগ। সাতচল্লিশের দেশ ভাগ ও স্বাধীনতা আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে সত্তর সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধুর নাম চির ভাস্বর হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করেন। বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ’ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে বিশ্বাসঘাতকদের বুলেটে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। কিন্তু বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক অবিচ্ছেদ্য নাম। বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতির অবিভাজ্য সম্পর্কের কোনো পরিসমাপ্তি নেই। তাই বাঙালি জাতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় বাংলাদেশের ইতিহাস বিনির্মাণের কালজয়ী এ সিংহপুরুষকে স্মরণ করে।

কর্মসূচি : আওয়ামী লীগ সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করবে। সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হবে। সকাল ১০টায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের প্রতিনিধিদল টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করবে। দিবসটি উপলক্ষে আগামীকাল শনিবার বিকেল ৩টায় আওয়ামী লীগ আলোচনাসভার আয়োজন করেছে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। তাতে সভাপতিত্ব করবেন শেখ হাসিনা।

জাতির পিতা ও তাঁর পরিবারের শহীদ সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন সারা দেশে ৬০ হাজার ৩৮২টি স্থানে কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৭টায় উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল সাড়ে ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে আলোচনাসভা। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদসহ আবাসিক হলের মসজিদ ও উপাসনালয়ে দোয়া প্রার্থনা অনুষ্ঠান হবে। এর আগে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চারুকলা অনুষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।

বাঙালি সাংস্কৃতিক জোট চারুকলার বকুলতলায় আয়োজন করেছে বঙ্গবন্ধু উৎসবের। বিকেল ৩টায় এতে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিকেল ৫টায় জাদুঘর প্রাঙ্গণে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। লেখক ও গবেষক ড. এনামুল হক রচিত, সুরারোপিত ও স্বকণ্ঠে উপস্থাপিত এবং পটচিত্রী শম্ভু আচার্য চিত্রিত ‘মহাপুরুষের অন্তর্ধান : ছহী শহীদ মুজিবনামা’ শীর্ষক পটের গান পরিবেশিত হবে।

বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে সকাল ৭টায় ৩২ নম্বরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। সকাল সাড়ে ১০টায় একাডেমির বটতলায় শিশু-কিশোরদের অনুষ্ঠান বঙ্গবন্ধুর গল্প শোনো এর আয়োজন আছে। বিকেলে হবে বঙ্গবন্ধুবিষয়ক একক বক্তৃতানুষ্ঠান। জেলা ও উপজেলা সদরে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, ডিএফপি ও গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সপ্তাহব্যাপী প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি দূতাবাসে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com