আবিও ।। দীপু মাহমুদ

এই সংবাদ ১৬২ বার পঠিত

আবিও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তাকে অসহায় দেখাচ্ছে। একজন তাকে ক্লাসরুম দেখিয়ে দিয়ে চলে গেছে। আবিও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সে এই ইশকুলে আর একদিন এসেছিল। সেদিন এসেছিল ভর্তি হতে। বাবা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। ওরা হেডস্যারের রুমে বসেছিল।

আবিও আজ ক্লাসে ঢুকে হকচকিয়ে গেছে। সবাই তার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। স্যার বললেন, ওর নাম আবিও রাখাইন। ওদের বাড়ি কক্সবাজার জেলার মহেশখালি দ্বীপে। ওর বাবা সরকারি চাকরি করেন। এই শহরে নতুন বদলি হয়ে এসেছেন। আবিও তোমাদের ক্লাসে ভর্তি হয়েছে।

ক্লাসের সবাই দেখল গোলগাল মুখের একটা ছেলে ক্লাসে ঢুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ধবধবে ফরসা। চ্যাপটা নাক। চোখ দুটো সরু আর ছোট। তাকে পুতুলের মতো সুন্দর দেখাচ্ছে। ছবিতে এরকম মানুষ দেখেছে ওরা। সামনাসামনি কখনো দেখেনি।

স্যার বললেন, আবিও তুমি বসো।

আবিও ক্লাসের সবার দিকে তাকাল। সবগুলো বেঞ্চ ভর্তি। পিছনের বেঞ্চের একপাশে একজন ছেলে একা বসে আছে। আবিও গিয়ে তার পাশে বসে পড়ল। সেই ছেলে চোখ গোলগোল করে তাকাল। আবিও নিজের নাম বলল। সেই ছেলে কিছু বলল না। আবিও ফিসফিস করে জিগ্যেস করল, তোমার নাম কী?

সেই ছেলে বলল, জয়ন্ত। বলেই চুপ করে গেল।

স্যার ক্লাসে অংক করাচ্ছিলেন। জয়ন্ত অংক না করে চুপচাপ বসে আছে। আবিও বলল, তুমি চুপ করে বসে আছ কেন? অংক করো।

জয়ন্ত বলল, আমি অংক বুঝি না।

আবিও বলল, এই অংকগুলো খুব সহজ। আমি তোমাকে বুঝিয়ে দেব।

ক্লাস শেষ হলে সবাই আবিওকে ঘিরে ধরল। ওরা এসেছে গল্প করতে। তখন আরেকজন শিক্ষক ক্লাসে এলেন। ওদের আর গল্প করা হলো না।

টিফিন পিরিয়ডে সবাই হৈহৈ করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে পড়ল। এখন তাদের খেলার সময়। সকলে মাঠে গিয়ে খেলছে। আবিও দাঁড়িয়ে আছে ইশকুলের বারান্দায়। মাঠের কোনায় জামগাছ। সেখানে জয়ন্ত দাঁড়িয়ে আছে। সে খেলছে না।

দুইজন ছেলে এগিয়ে এসেছে আবিওর কাছে। তারা আবিওকে খেলতে ডাকছে। দুইজন তাদের নাম বলেছে। একজনের নাম কালাম। আরেকজনের নাম হানিফ।

কালাম বলল, চলো খেলি।

আবিও হাত ইশারা করে জয়ন্তকে ডাকল।

হানিফ বলল, জয়ন্ত খেলবে না।

আবিও জিগ্যেস করল, জয়ন্ত খেলবে না কেন?

হানিফ বলল, জয়ন্ত তো হিন্দু। সে আমাদের সাথে খেলবে কেন?

আবিও বলল, আমি বৌদ্ধ। তাহলে তোমরা বুঝি আমার সাথেও খেলবে না?

হানিফ আর কালাম আমতা আমতা করছে। আবিওর সাথে ওদের খেলতে ইচ্ছা করছে। কিন্ত তারসাথে খেলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছে না।

আবিও বলল, আজ যদি এখানে বৃষ্টি হয় তাহলে সেটা তো সবার জন্য হবে। মুসলমান, হিন্দু বা বৌদ্ধদের জন্য আলাদা করে হবে না। তুমি, আমি যে বাতাস থেকে নিঃশ্বাস নিচ্ছি সেটাও তো সবার জন্য।

কালাম আর হানিফকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। কালাম হাত বাড়িয়ে জয়ন্তকে ডেকে আনল। জয়ন্ত অবাক হয়েছে। তাকে এই প্রথম ওরা খেলতে ডাকছে। কালামের কথা ক্লাসের সবাই শোনে। কালাম সবাইকে ডেকে বলল, জয়ন্ত আজ থেকে আমাদের সাথে খেলা করবে।

সবাই নিজেদের ভেতর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কালাম তখন আবিওর কথাগুলো বলল, অনেকদিনের অনাবৃষ্টির পর যখন বৃষ্টি হয় তখন আলাদা করে হিন্দু, মুসলমান আর বৌদ্ধদের জমিতে হয় না। সবার জমিতেই হয়। সেই বৃষ্টির পানিতে সবার ফসলের উপকার হয়। তাহলে আমরা নিজেদের আলাদা করব কেন?

সকলে কালামের যুক্তি মেনে নিল। জয়ন্তকে নিয়ে সকলে একসাথে খেলা করল। ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে সবাই ক্লাসে ফিরে গেল। ইশকুল ছুটির পর জয়ন্ত, কালাম, হানিফ, আবিও সবাই একসাথে খেলতে গেল।

পরদিন থেকে ক্লাসে আর জয়ন্তকে একা বসতে হলো না। ওরা সবাই মিলেমিশে বসল। জয়ন্ত নিয়মিত আবিওর কাছে অংক বুঝে নেয়। আবিও জয়ন্তকে অংক বুঝিয়ে দেয়। আরও অনেকে আসে আবিওর কাছে অংক বুঝতে। জয়ন্ত এখন আর অংক ক্লাসে চুপ করে বসে থাকে না। সে অংক ভালো করে। স্যার খুব খুশি হয়েছেন।

পরের ছুটির দিন। আবিও বাবার সাথে ঘরের কাজ করছে। মা রান্নাঘরে। কেউ একজন ওর নাম ধরে ডাকছে। বাবা বললেন, আবিও দেখো তোমাকে কেউ ডাকছে।

আবিও বাইরে গিয়ে দেখে কালাম, হানিফ, মানিক আর জয়ন্ত দাঁড়িয়ে আছে। ওরা রায় বাবুদের আমবাগানে খেলতে যাচ্ছে। আবিওকে ডাকতে এসেছে। আবিওর সাথে ওর বাবা বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। জয়ন্ত বলল, নমস্কার।

আবিওর বাবা বললেন, নমস্কার। আচ্ছা এখানে একটা বৌদ্ধ মন্দির আছে শুনেছি।

কালাম বলল, আছে, তবে অনেকদিন সেখানে কেউ যায় না। শুকনো পাতা পড়ে ভরে গেছে।। আবিওর বাবা জিগ্যেস করলেন, একবার দেখে আসা যায়?

হানিফ বলল, আপনার অসুবিধা না থাকলে চলেন এখনই যাই।

আবিওর বাবা বললেন, চলো আবিও আমরা ঘুরে আসি।

ওরা সবাই মিলে সেই বৌদ্ধমন্দিরে গেল। বাবার সাথে আবিও, কালাম, হানিফ, মানিক আর জয়ন্ত মিলে মন্দিরে পড়ে থাকা শুকনো পাতা সরাতে লাগল। কালাম আর হানিফ দৌড়ে গিয়ে ঝাড়– নিয়ে এলো। জয়ন্ত নিয়ে এলো কোদাল। মানিক নিয়ে এলো পানিভর্তি বালতি। আশপাশ থেকে অনেকেই চলে এলো। সবাই মিলে সেই মন্দির ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে ফেলল। আবিওর বাবা বললেন, সবাই মিলে একসাথে থাকার ভেতর অনেক আনন্দ আছে।

দেখতে দেখতে বাংলা বছর ফুরিয়ে এলো। এখানে তিন দিন ধরে বৈশাখী মেলা হয়। জয়ন্ত, আবিও, কালাম, মানিক, হানিফ সবাই একসাথে বৈশাখী মেলায় গেল। ওরা সবাই খুব মজা করল।

এর কয়েকদিন পর এক বিকেলে আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ধুলো উড়িয়ে ঝড় শুরু হলো। কালবৈশাখী ঝড়। সেই কালবৈশাখী ঝড়ে অনেকের গাছের ডাল ভেঙে পড়ল। ভাঙা ডালে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। মানুষের চলাচলে অসুবিধা হলো। কারও ঘরের চাল উড়ে গেল। মাটির বাড়ি ধ্বসে পড়ল।

ঝড় থেমে গেলে এলাকার মানুষ ছুটে গেল। সবাই মিলে কাজে লেগে পড়ল। গাছের ভাঙা ডাল সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে ফেলল। তাতে মানুষের চলাচলে সুবিধা হলো। ঝড়ে যাদের ঘর পড়ে গেছে তাদের থাকার ব্যবস্থা করল। সকলের সাথে জয়ন্ত, কালাম, হানিফ, আবিও আর মানিকও কাজে লেগে পড়ল।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com