আজ বুধবার, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ২৮শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ বিকাল ৫:২২ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

মানুর পরিবারের ঈদ

সাজ্জাদ হোসেন সাখাওয়াত #  বাংলাদেশের এক নিতান্ত দারিদ্র্য গ্রাম মোমিন নগর। ঈদ পূজা সব উৎসবে তারা প্রতিদিনকার মতো জীবন যাপন। আধুনিক সভ্যতায় বাতাসে একটু পরিবর্তন হচ্ছে সবে মাত্র। অন্য দশ পরিবারের মত গ্রামের এক পরিবার মানুর। চার মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। অভাব অনটনের যুদ্ধের এক মহাযোদ্ধা মানু। জীবনের জন্মলগ্ন থেকে এই অর্ধশত বয়স পর্যন্ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে। মিথিলা মানুর বড় মেয়ে। বয়স কুড়ি বছর। গ্রামের মেয়ে যদি বয়স হয় কুড়ি তা’হলে হয়ে যায় বুড়ি। তাই মানু মেয়ের বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। অনেক ঘর নিয়ে আসে ঘটক কিন্তু মানুর অবস্থা দেখে সবাই কেটে পড়ে।

সমাজের অপয়া হিসাবে মিথিলা নাম সবার মুখে মুখে। আর সমাজ প্রতিরা এর সুযোগ ব্যবহার করতে উঠে পড়ে লেগেছে। মানু দরিদ্র তবে সৎ। তাই নিজের মেয়েকে পিঞ্জিরায় বেঁধে রেখেছে। পাশের গ্রামের এক সন্তানের জনক সাইফুল। তার বউয়ের সন্তান জন্মের সময় মৃত্যু হয়। এবার ঘটক সাইফুলের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। মানু প্রথমে একটু নারাজি তারপর সব কিছু চিন্তা করে রাজি হয়। অল্প সল্প খরচে মেয়ের বিয়ে হবে তার পরেও হাতে টাকা না থাকায় কিছু টাকা কর্জ করতে হবে মানুর। মিথিলার বিয়ে হয়েছে ঠিক তবে মনের তেমন আনন্দ নেই। পিতার সংসারে ছোট ভাই বোনদের সেই দেখাশোনা করে পিতার অবর্তমানে। তবুও নিয়তি খেলা মেনে নিতে হবে। কারণ মেয়েদের দুই কূল নিয়ে জন্মায়।

মোটামুটি অন্য দশ জনের মত চলে যাচ্ছে দিনকাল মিথিলা আর সাইফুলের। পরিবারে সৌন্দর্যেররূপ দিতে এখন সংসারের চাবিকাঠি মিথিলার শাশুড়ির হাতে। সে হচ্ছে সমাজের একটা রূপরেখা। সমাজ যে তালে চলে তার পরিবার সে অনুযায়ী চলে। তাই গ্রামের আধুনিক পরিবার বলতে মিথিলার শাশুড়ির পরিবার কে বুঝায়।

গ্রীষ্ম শেষে দিকে টুকটাক বৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ মিথিলার শাশুড়ি খবর পাঠায় মানুর জন্য। মানু ক্ষেত থেকে কিছু শাকসবজি নিয়ে ছুটে বেয়াই বাড়ীর দিকে। মানুকে ভাল আদর সমাদর করে। চলে আসার সময় মানুকে বেয়ান সাহেব বলে,” এখন তো ফলের সৃজন কিছু টাকার ফল পাঠিয়ে দিয়েন। আর বুঝেন তো বড় বাড়ী সবাইকে একটু করে দিলে কতটুকু লাগবে। এটা আজ সমাজের রীতি হয়ে গেছে”।

মানু কিছু না বলে চলে আসে। আর চিন্তায় পড়ে যায় কোথায় থেকে এতটাকা সংগ্রহ করবে। আর কতটাকা ফল ফলাদি দিলে বাড়ীর সবাইকে বেয়ান সাহেব দিতে পারবে। কয়েকদিন পরে মানু কিছু টাকা সংগ্রহ করে তা দিয়ে ফল ফলাদি নিয়ে ছুটে বেয়ান বাড়ীতে। পথে ছোট ছেলে সজীব একটা আম খেতে চায়। মানু বলে ” মিথিলার শাশুড়ি আমাদের কেটে দিলে খেতে পারবি”।

যাহি হোক কোন রকমে বাঁচলেন মানু। সবাই তিপ্তিমত না হোক একটু করে হলেও খেতে পেরছে। দুপুরবেলা খাবার খেয়ে চলে আসতে হবে মানুর। কারণ কাল থেকে রোজা শুরু হতে পারে। তাই তাড়াহুড়ো করতে শুরু করেছে মানু। খাবার শেষে আসার সময় মিথিলার শাশুড়ি বলে “রোজার মাঝে ছেলের শশুর বাড়ী থেকে ইফতারি আসে তা কি আপনারা জানেন’”।

মানুর মাথার উপর আকাশ পড়েছে। কারণ ফল ফলাদির টাকা জোগড়া করতে মানুর সর্বত্র গেছে এবার ইফতারের আয়োজন কি দিয়ে করবে। আসার সময় মানু চুপচাপ। ছেলের সাথে কোন কথা নাই। সজীব ছোট মানুষ তবুও বাবার অবস্থা সবিই বুঝে। তাই সে চুপ করে হেঁটে চলছে বাবার পিছুপিছু। মেয়ের সুখের জন্য যাহ করার মানু করতে পারে কিন্তু হাতে এক টাকা কুঁড়ি নাই।

গ্রামের সবার থেকে ধার দেনা করছে মানু। এখন কেউ তাকে ধার দিতে চায় না। শেষমেশ পিতা হিসাবে সম্মান রাখতে হলে তাকে কোন কিছু ত্যাগ দিতে হবে। তাই নিজের বাড়ীর পাশের ছোট এক টুকরা জমি বিক্রি করে দিবে যা দিয়ে এতদিন সংসার চলতো। বিক্রি করে মেয়ের জন্য ইফতার নিয়ে যায়। জমির যে টাকা তা দিয়ে কয়েকজনের কর্জ আর মেয়ের বাড়ীর ইফতারের আয়োজনে শেষ।

এদিকে মিথিলা বাবার সবকিছু বুঝতে পারে। সে জানে বাবার পরিবারে হয়তো ঠিকমতো রান্না হয় না। মিথিলা পরিবারের চিন্তায় ঠিক মতো খেতে পারছেনা। মিথিলা চিন্তা করে আমি যতদিন এই বাড়ীতে থাকবো ততদিন বাবাকে এমন অনেক কিছু দিয়ে যেতে হবে। রমযান শেষ দিকে। ঈদ হাতে কাছে এসে গেছে। পরিবারের কারো জন্য কিছু কেনাকাটা করতে পারেনি মানু। ঠিক সে সময় মিথিলার শুশুর বাড়ীতে ঈদের কাপড় দেওয়ার প্রস্তাব আসে। মানু চিন্তায় অস্থির। মেয়ের বাড়ীর সব কিছু দিয়েছে সে ঈদে যদি কাপড় না দিতে পারে মেয়েকে বোধ হয় অনেক কষ্ট দিবে।

কাল ঈদ কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা করতে পারে নাই মানু। চুপচাপ বসে আছে গাছ তলায়। দিনের শেষ বেলায় কাল ঈদ তাই গ্রামের সবাই আনন্দে মেতে উঠছে। আজ সারাদিন মানুকে দেখা যাচ্ছে না।ছেলে মেয়রা অনেক খুঁজে হাতাশ। অতঃপর তারা মনে করে বড় বোনের বাড়ীতে গেছে। রাত দশটা। বাড়ীর সবাই হাতে মেহেদী অংকন করছে। শুধু চুপচাপ হয়ে ঘরের সামনে বসে আছে মানুর ছেলে মেয়ে। হঠাৎ উত্ত পাড়ার জসিম এসে চিৎকার করে বলে, মানু চাচা গাছ তলায় মারা গেছে, স্টক করে।

হতাশার কালো অধ্যায় আর কালো হতে লাগে মিথিলার পরিবারের। বাবা ছিল একমাত্র আশা আর সে আশা আজ থেকে স্বপ্ন হয়েগেছে। জীবনের প্রদীপ আজ নিবে গেছে। কান্নাকাটি ভরে উঠে বাড়ী। রাতের দাপন কার্য সম্পাদন করে গ্রাম বাসী। ঈদের দিন আজ। কোন আনন্দ নেই। কোন হাসি ঠাট্টাতামাসা নেই। চুপচাপ মানুর ছেলে মেয়রা। নতুন করে বাঁচতে হবে তাদের। এবাবে হাজার মানু রয়েছে সমাজে। মেয়ের বাড়ী থেকে ফল ফলাদি, ইফতার, ঈদের কাপড় এগুলা কোনো সভ্য সমাজ কমনা করেনা। আজ থেকে মিথিলা হচ্ছে তার ছোট ভাইবোনের স্বপ্ন।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com