আজ বুধবার, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ২৮শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ বিকাল ৫:২১ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

অণুগল্পঃ আইজ ভরা পূন্নিমা

সুমাইয়া সুলতানা রূপা # – কাজলের বাপ ওও… কাজলের বাপ! আইজ নাও বাইতে না যাইলে অই না। একদিন না অয় মহাজনেরে বুঝাইয়া কইবা। পরের বার মাছ বেশি অইলে কিছু মাছ বাড়াইয়া দিবা। আইজ যাইয়ো না। আমার মনের ভিতরে কিরম জানি কু ডাকতাছা। আইজ ভরা পূন্নিমা। দরিয়ায় জোয়ারের পানি বেশি অইবো তার উপ্রে হাওয়াই মারতেছে হটাৎ হটাৎ।

-আরে ধূর আমেনা! চিল্লাইস না তো। আমার কিচ্ছু আইবো না। এইরম কত পূন্নিমাতেই তো মাছ ধইরা আনছি। কই তহন তো কিছু অই নাই। এইডারে খারাপ অবস্থা কইতাছোস? দরিয়ার অবস্থা এর চাইতে কত্তো খারাপ আছিলো। কত্তোবার ডুবতে ডুবতে বাঁইচা গেছি তার হিসাব আছে! মাঝ দরিয়ায় নাও ডুইবা গেছিলো একবার। কোন রকম পরানডা লইয়া অন্য নাওয়ে উইঠা পড়ছিলাম। তাছাড়া পূন্নিমার সময় তে মাছ বেশি পাওন যায়। মহাজনের তন মাছের বিনিময়ে নাও লইছি। পইত্তেকদিন মাছ দিতেই হইবো যেমনে পারি। এহন মাছ ধরতে না গেলে কি চলবো? তাছাড়া আইজ না গেলে কাইল খামু কি তার চিন্তা করছোস? চাল পুরাইছে, বাজার সদায় নাই। আমাগো একখান মাইয়া অইলো তার খরচাপাতি আছে। আম্মার ওষুধের খরচা বাইড়া গেছে। কতদিন হইয়া গেলো অথচ তরে একখান নয়া শাড়ি তো দূরের কতা পেটপুরে খাওন পর্যন্ত দিবার পারি নাই। এইবার মাছ বেশি পাইলে তোর লাইগা একখান শাড়ি আনমু। দরিয়াতেও এহন মাছ কইমা গেছে। আগের মতন ধরবার পারি না। যা পাই তার অর্ধেক মহাজনের পেটে। আইচ্ছা দেরি অইয়া যাইতেছে। আমি যাই। তুই চিন্তা করিস না। আমার আইতে আইতে তুই বরং মাইয়ারে লইয়া চান্দের যৌবন দেখ। আমি জলদি আইসা পরমু। বেশিদূর নাও ভিড়ামু না।

তারপর বৃদ্ধ মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে সাবের চলে গেলো মাছ ধরতে। জেলে পরিবারে জম্ম তাঁর। মাছ ধরা-ই তাঁর পৈত্রিক পেশা। ভরা পূর্ণিমা রাতে জোসনার আলোয় উঠোন পেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সাবের। ক্রমশ তাঁর ছায়া হারিয়ে যাচ্ছে আমেনার দৃষ্টির সীমানা থেকে। পনেরো দিনের শিশু কন্যা কাজল কে কোলে নিয়ে সাবেরের চলে যাওয়া দেখছে আমেনা। কিছুতেই সে তার ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। বিয়ের পর আর কখনো এমন মনে হয়নি তাঁর। তাঁর মনের ভেতরটা বারবার বলছে আজ কিছু একটা ঘটতে চলেছে।

মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে, শাশুড়ি কে খাইয়ে উঠোনে বসে আছে আমেনা। জোসনার আলোয় কি কোমল আর মায়াবী দেখাচ্ছে তাঁর মুখ! মনে হচ্ছে পৃথিবীর বুকে এই উঠোনে আরেকটি জোসনা সে। কি স্নিগ্ধ আর অপরূপ লাগছে তাঁকে! রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ধমকা হাওয়া বইছে। ভয় আরো গভীরভাবে আঁকড়ে ধরেছে তাঁকে। এখন মধ্যে রাত। জোসনার আলো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। অথচ সাবের ফিরছে না। এতক্ষণে তাঁর ফিরে আসার কথা। কিন্তু আসছে না কেন? হঠাৎ উঠোনে কার যেনো ছায়া পড়তে দেখলো আমেনা। বুকের ভেতরটা আনন্দে ভরে গেছে তাঁর। যার ছোপ পড়েছে তাঁর চোখেমুখে। আমেনা দৌড়ে গেলো তাঁকে জড়িয়ে ধরতে। জোসনার ক্ষীণ আলোয় হঠাৎ জন্তুর মতো এক চেহারা তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালো। ঝাপিয়ে পড়লো আমেনার নাজুক শরীরের উপর। যার গায়ে এখনো লেগে আছে সদ্য মা হওয়া প্রসব যন্ত্রণার গন্ধ । ” আমারে ছাইড়া দেন ” এতটুকুই শোনা গিয়েছিলো কেবল। তারপর সব নিস্তব্ধ! কেবল ঝিঁঝিঁরা ডেকে চলেছে অবিরাম।

এরপর জোসনার প্লাবন ভেঙে স্নিগ্ধ ভোর এলো পৃথিবীর বুকে। কিন্তু সেদিনের পরে আর ভোর আসেনি আমেনার জীবনে। লাশ হয়ে পড়ে রইলো সদ্যজাত শিশু কন্যার মা। উঠোনে পড়ে আছে সাবেরের প্রিয়তমা স্ত্রী। পড়ে রয়েছে গরীবের ঘরে বউ হয়ে আসার এক অভিশপ্ত স্ত্রী। সেদিন সাবের ফিরেছিলো হ্যাঁ! ফিরেছিলো তবে সকালে । মাছ ধরতে ধরতে কখন সকাল হয়ে গেছে তা বুঝে উঠতে পারেনি সে। সেদিন অনেক মাছ পেয়েছিলো সাবের। মহাজনের ভাগ দেয়ার পরেও অনেক লাভ হলো সাবেরের। মায়ের ওষুধ, মেয়ের জন্য দুধ আর সংসারের টুকিটাকি বাজার করার পর বাকি টাকা দিয়ে বউয়ের জন্য উপহার হিসেবে একটা খয়েরী রঙের শাড়ি আর চুড়ি এনেছিলো সে। কিন্তু হায়! তার সন্তানের মা, তার ভালোবাসার মানুষটির আর এসব পরার যোগ্যতা নেই। তার বদলে শাদা কাফন- ই উপযুক্ত পোশাক তার এখন।

সেদিনের পর থেকে সাবের আর কোনদিন মাছ ধরতে যায়নি। পাগলপ্রায় সাবের আমেনার একমাত্র স্মৃতি শিশুকন্যা কাজল কে নিয়ে দিনাতিপাত করছে। প্রতি পূর্ণিমা রাতে মেয়েকে নিয়ে উঠোনে বসে ঝাপসা চোখে একদৃষ্টিতে যৌবনবতী চাঁদ দেখে সারারাত কাটিয়ে দেয় সে।
এভাবে পনেরো টি বছর কেটে গেছে। আজ পনেরো দিনের শিশুকন্যাটির বয়স পনেরো বছরে এসে ঠেকেছে। কি আশ্চর্য আজও ভরা পূর্ণিমা! ঠিক ওইরকম সেই রাত্তিরের মতোই । অসুস্থ সাবের বিছানায় পরে আছে ঘরে। তবে আশ্চর্যের বিষয় আজ আর সে মেয়ের সাথে পূর্ণিমা দেখতে উঠোনে আসেনি। তার পনেরো বছরের কিশোরী কন্যা উঠোনে বসে যৌবনবতী চাঁদের রূপালি জোসনা দেখতে দেখতে তার বাবাকে চিৎকার করে বলছে, ” বাবজান! ওও… বাবজান! জানো …. আইজ ভরা পূন্নিমা !

পরে শোনা যায় মহাজন তার ধার দেয়া মাছ ধরা নৌকাটি সাবের কে দান করে দেয়। কিন্তু সাবের নৌকাটি আর ছুঁয়েও দেখেনি। এখনো ঘাটে বাঁধা রয়েছে ঠিক সেইভাবে। দান করার সময় মহাজন এ ও বলে আমেনার মৃত্যু নিয়ে যাতে আর ঘাটাঘাটি করা না হয়। এতে উল্টো আমেনার -ই বদনাম হবে। পুলিশ -আইন সে সামলে নিবে। কিন্তু এতে তার কি স্বার্থ তা আজো সকলের অজানা-ই রয়ে গেছে!

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com