আজ বুধবার, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ২৮শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ বিকাল ৫:২২ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

মাহমুদ নোমান-এর ছোট গল্প “মনক্লিপ”

বিড়ালের মতো পুলিশের হাঁটা সাধারণের মনে পড়তে বুকে-পিঠে ধরে যায়, নিঃশ্বাস নেওয়ার পথও থাকেনা  শরীরের কোনো অংশ দিয়ে। এ, এক জিম্মিকর অবস্থা। কথায় আছে-আকাশের যত তারা, পুলিশের তত ধারা। নওশাদের চোখে মুখে বেদনা কিংবা বিস্বাদের স্পষ্ট ছাপ দেখলেও অথবা রাস্তায় রাস্তায় ডঙ ডঙ করতে দেখলেও কারো আফসোস হবেনা। কারণ, সে উঠতি কবি মানে, বিধাতা আলাদা মাটি দিয়ে তৈরি করেছে, তা শুধুও বেদনা সয়বার মাটি।

শীতের পর বসন্ত আসে মানে, ফুল ফুটে, গাছপালায় গা- ঝাড়া দিয়ে নয়া কুঁড়ি তেড়ে ওঠে। পাখি গায় মানে,কোকিলের কুও-কুও, তবে নওশাদের জীবনে হঠাৎ কাল বৈশাখী এসে গেলো। কাল সকালে ছিল সাহেবি বেশে, মানে গৃহশিক্ষক। ঘাড় পেঁচিয়ে সাদা-কালো ডোরার মাফলারটা এখনো গলা পেঁচিয়ে। তবে, চশমাটা পালিয়ে আসার সময় কোথায় পড়ে গেলো নিজেও জানে না।হয়তো সিএনজি তে, তবে প্রিয় জিনিস হারাবার বেদনাও এ মুহূর্তে জাগলো না!

সে দৌড়ের উপরে সারাদিন।দৌড়ে কোথায় যাবে জানেও না,তবে দৌড়ের চেয়ে এদিক -ওদিক ফাঁক-ফোকর খুঁজতে হচ্ছে।যা ছিল পকেটে, কালুরঘাট দিয়ে এ শহরে উঠতে শেষ। বিকেল গড়ানো সময়ে শিশু পার্কের এককোণে ঘাসের উপর বসে পড়ল, না শরীর ঢলে পড়ল অস্তগামী সূর্যের মতো। ছুটির দিনের এ বিকেলে উপচেপড়া ভীড়ে মা- বাবার হাত ধরে ফুটফুটে শিশুদের কলকলা নওশাদের মনে অবসাদ এনে দিল।বাবার হাত ধরা একটা শিশুর হাত থেকে উড়ে গেল প্লেনসদৃশ বেলুন, ছেলেটির কান্না শুরু তো শেষ হয়না। নওশাদের মনে দোলা দিল, কালাসোনার ওরশে আইরিনকে নিয়ে আঁধারিতে এককোণে সযতনে মাথার ক্লিপ গুঁজে দিয়ে বলেছিলো,
ক্লিপটা যতনে রেখো,
: কেন? এ ক্লিপ হারালেও মনে যে ক্লিপ গেঁথেছো তা জানো?
: জানি,
: কি জানো?
: তোমার চুলগুলো অনেক সুন্দর
:আসলে তোমার চোখ সুন্দর
: না, ভালবাসায় সুন্দর
: তাহলে, আমি?
: তুমিই তো ভালবাসা
আইরিন গর্ব নিয়ে হাসল মুচকি। ভীড়ের মাঝে চলতে চলতে হাত ধরে টানছিলো নওশাদ, আইরিনের বোনদের চোখে ফাঁকি দিয়ে। পুরো মাজারের গম্বুজ থেকে নিচ পর্যন্ত মরিচা বাতির ঝলকানিতে ঢোলের বাজনায়, গরু মহিষের হুড়াহুড়িতে আইরিন ভয়ে বারবার নওশাদের বাহু চেপে বুকটাতে মাথা গুঁজাতে চাচ্ছে, একবার বলেও ফেলল, এ মাজারের শপথ!  আমাকে ছেড়ে যাবে না তো…?
: মৃত্যুতে আমরা পৃথক হতে পারি
: তারপর?
: মৃত্যুর পরে পরকালেও তোমাকে চাইব
: সত্যি? তখন তো হুরপরী তোমায় ভুলিয়ে রাখবে আমাকে
: আমার হুরপরী চাই না,
: এখন নাকটা একটু মচকে দিবে?
: এ্যঁ, দিলাম
তারপর হেসে উঠতে আইরিনের ছোট ভাইয়ের জন্য কেনা বেলুনটা উড়ে গেল, তা আকাশে উড়ে যেতে দেখে দুজনের সে কি জোয়ারি হাসি। ভাইটি কান্না মনে পড়তে নওশাদের সম্বিৎ ফিরে এল। দেখল ছেলেটিকে তাঁর মা বাবা আরেকটি বেলুন হাতে দিয়ে ধমকিয়ে বলল- হলো এবার? কান্না থামাও।

০২.

সন্ধ্যায় যখন দোকানের বাত্তিগুলো জ্বলে উঠল,টের পেল সে সারাদিন কিছুও খায়নি।পেটে কি বাজে আন্দোলন,তাতে শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ লুটিয়ে পড়তে চাচ্ছে। সন্ধ্যা হতেই ঘর খুঁজছে থাকার।একটু শরীর এলিয়ে দেবে শরীরের ইচ্ছেতেই।এ শহরে আত্মীয় নেই,তেমন না।কিন্তু নানান প্রশ্ন উসখোখুসকো চুলের বিভ্রান্ত চোখে মুখের দিকে তাকিয়ে কারবালার তীরের মতো ছুটে আসবে নির্ঘাত।আর এমন লজ্জাকর সময়ে আত্মীয়দের সামনে দাঁড়ানো মানে, পরাজয় মেনে নেওয়া। তাই হাঁটছে।

সারি সারি দোকানের বাত্তিগুলো ভেতরে খুঁচিয়ে দিচ্ছে। ফলের দোকানের সুতোয় লটকানো লাল আপেল, হলুদ মুসাম্বি জিহ্বাগ্রে জল খসিয়ে যাচ্ছে, তা গিলে গিলে হাঁটছে নওশাদ। তবে কোথায় হেঁটে যাচ্ছে, নিজেও জানেনা। হাঁটতে হাঁটতে পা দুটো আর চলছে না, সম্মুখে। একটা মসজিদ দেখতে পেয়ে ঢুকে গেল সেখানে, কিন্তু মসজিদে তালা ঝুলানো দেখে নিজেকে গুনগুনিয়ে গালি দিল-শালার, আল্লাহর ঘরও বন্ধ হয়ে গেল আজ ! যার নেই, মেজবানি বাড়িতেও নেই।

নিজের পেঠ বাম হাতে চেপে অসহ্যের চেঁচানিতে মসজিদের তালার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল- তুমি ঘুমাচ্ছ আল্লা, ঘুমাও ঘুমাও কথাগুলো বলতে বলতে মসজিদের ঘাটে নেমে মাথায় পুকুরের পানি দুইহাতে ছিটিয়ে বিরক্তি দমিয়ে হাত মুখ ধুয়ে, দু’ঢোক পানি গিলে একটু আড়ালে ঘাটের কোণায় বসে পড়ল নিরুপায় হয়ে। চারদিকে দালানকোঠা থেকে ভেসে আসছে ভুনা মাংসের ঘ্রাণ, আহ্ ঘ্রাণ!  নাকে টানতে টানতে বুকে বিঁধে যাচ্ছে যেন।নওশাদ বুঝে উঠল,ক্ষুধার পেঠে সব সুস্বাদু। নওশাদ আনমনে বলে উঠে- আল্লা মসিবতও দিলে, ক্ষিধেও দিলে! তোমার মানবিকতা বলতে নেই, সব মানবতা কি বান্দার?

কাছের দালানের ব্যালকনির আলো-আঁধারির মায়াতে দু’দেহের খুনসুটি চোখে পড়তে চোখ ফিরিয়ে নিল।দেহে ঝংকার বেজে উঠে এ ক্ষুধাতেও, একটু জোড়া খুঁতখুঁতি  হাসিও ভেসে এলো সেখান থেকে। ভেসে আসছে কোনো ঘর থেকে বাংলা-হিন্দী সিরিয়ালের শব্দ, ঝুপড়ি মার্কা চায়ের দোকানের দিক থেকে ভেসে এলো ইংরেজী সংবাদ পাঠ। নওশাদ বুঝে গেল, দশটা বেজে গেছে এ দুনিয়ার। রাস্তায় গাড়িগুলোর তির্যক আলো হঠাৎ হঠাৎ চোখে মুখে ধেয়ে আসছে, দোকানের দালানবাড়ির লাইটগুলো পুকুরের জলে যেন দোল খাচ্ছে । এমন সময় হেঁটে যাচ্ছে একজন, মনে হল পরিচিত কেউ! ভেতরে হঠাৎ মোচড় দিল।

হতচকিয়ে উঁকি মেরে দেখল, সুনীল। মানে, কলেজের বন্ধু সুনীল দত্ত। নিজের শার্ট প্যান্ট ঝেড়েঝুড়ে, মাথার চুলগুলো ঠিকঠাক করে ডাক দিল, এ সুনীল, ছেলেটি ঘাড় ঘুরিয়ে, কাছে এসে আশ্চর্য মুখে বলল, নওশাদ তুই!, এখানে? কি করছিলি? নিজের এহেন অবস্থা লুকিয়ে বলল, না। এদিকে একটা কাজে, সুনীল নওশাদের কথা শেষ না হতেই কাঁধ চাপড়াতে চাপড়াতে বলল, আয়। আজ দু’বন্ধু একসাথে থাকব। জানিস, তোর আর করিমের কথা আজো ভীষণ মনে পড়ে, ভুলি নাই, কিন্তু জীবন এক জায়গায় থেমেতো নাই, পিছে থাকানোর সময় নেই, সময় আমাদের পিছে দিয়ে ঠেলছে, আমরা পুরুষরা বুঝলি মালগাড়ি, মালগাড়ি, 

নওশাদের ভিতরে অবচেতনের বাতাস খেলে গেল, সুনীলের বাড়ানো পায়ের দিকে পা মিলাল। সুনীল নওশাদের মুখের দিকে তাকাতে জোর করে হেসে বোঝালো, তাই তো। বাড়ি ও নিজের কুশলাদি জানাজানিতে হেঁটে চলছে দুজন। হাইওয়ে রাস্তা পেরিয়ে অনেক ভিতরে হেঁটে যাচ্ছে তারা। হঠাৎ সুনীল জিজ্ঞেস করল, ভাত খেলি?
: হুম, তুই?
: লজিন থেকে খেয়ে আসছি। জানিস, রান্না করা একটা শিল্প। অনেক খাটুনি, এক চিমটে লবণের জন্য বিরাণীও মাটি।

নিজেকে নিজের অচেনা করে এগিয়ে মোবাইলটি হাতে নিতে রিংটোন বেজে উঠল, এতে মোবাইলটি ফেলে দিতে চায়লো তবুও দুই হাতে চেপে যখন আওয়াজ কমানো যাচ্ছে না, তাড়াতাড়ি গলার মাফলারটা দিয়ে মুড়িয়ে নিতে রিংটোন বন্ধ হল অথচ সে ঘেমে উঠল যেন, এ মাত্র তোয়ালে ছাড়া গোসল করে আসল। তাড়াতাড়ি রিক্সার প্যাডেল মেরে একটা নির্জন এলাকায় এসে মোবাইলটি হাতে নিতে আবারো রিংটোন, এবার অজিরানি আর প্রতিবারে তার বুক কেঁপে উঠছে। কভার থাকায় মোবাইলের উপরে গ্লাসটা ভেঙ্গেছে। তবে মোবাইলের কিছু ফাংশন সে বুঝে উঠছে না, কিভাবে মোবাইলটি অফ করা যায়। শালার মোবাইল ‘ বলে বলে গালিগালাজ ছাড়া আর কিছুও পারছে না। রিংটোন বেজেই যাচ্ছে। অতঃপর মোচড়ামোচড়ির একপর্যায়ে কোথায় হাতের স্পর্শে কলটি রিসিভ হলো নিজেও জানেনা। মোবাইলের ঐ পাশে কান্নাকাটির কণ্ঠে আকুতিভরা ডাক-জান, জান রিক্সাচালকটি কৌতূহলে মোবাইলটি কানে ধরে রাখল। ঐ দিকে বলে যাচ্ছে- প্লিজ কথা বলো, প্লিজ জান কথা বলো। আমি যা বলেছি, মা বাবার জন্য বাধ্য হয়ে, প্লিজ আমি ফিরে আসছি। পাঁচ কলেমার শপথ বাদ দাও আমার দেহ মন সব তো দিয়ে দিয়েছি তা কি ফেরত পাবো? আমি এখন ফুল নেই, তোমার হাতে সে কবে চলে গিয়েছি আমার অস্তিত্ব আমাকে পরিহাস করছে, প্লিজ কথা বলো, প্লিজ তোমার পায়ে পড়ি। জান, দুজন এ সমাজ ফেলে অনেক দূরে যাবো গিয়ে, মানুষ প্রেমে বাঁচে, প্রেমে মরে। প্লিজ কথা বলো, বিশ্বাস হারায়ো না, প্লিজ প্লিজ প্লিজ কথা বলো। জান, না হয় আমিই বিষ নিয়ে রেখেছি। প্রেম বারবার আসে না, একবারেরটা আগলে রাখতে হয় প্লিজ জান- মোবাইলের ওপাশে কান্নাতে রিক্সাচালকের চোখও অজান্তে ভিজে এলো, বিষের কথা শুনে নড়েচড়ে উঠে মুখ খুলে-

মা, সে তো এক্সিডেন্ট করেছে

: হ্যালো, হ্যালো! কে বলছেন?

: আমাকে চিনবে না, আমি মোবাইলটা কুড়িয়ে পেয়েছি।

: আংকেল,সে কোথায়?

: আমি জানি না,তাকে সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে

: আংকেল,  ঐ পাশে আইরিন অঝোর কান্নায় আর কথা বলতে পারছে না। রিক্সাচালক অনুনয়ের স্বরে বলে- মা, কেঁদো না, আমার সহ্য হচ্ছে না

: আপনি আমার ধর্মস্ত বাপ, ওনাকে কোন হাসপাতালে নিলো জানেন?

: সে তো জানি না মা,  আইরিনের মুখ থেকে আর কথা বেরুচ্ছে না, শুধু কাঁদছে। রিক্সাচালক মিনতি করে বলল- মা, কেঁদো না আল্লাহ আছে। প্রেম মরতে পারে না, প্রেমকে আল্লায় হেফাজত করে, তোমাকে ঠিকানা বলছি, এ ঠিকানায় এসে যাও পারলে ওর মা বাবাকে বলো

: আচ্ছা

০৫.

পরেরদিন সকাল বেলা। হাসপাতালে নওশাদের বেডের পাশে উবু হয়ে আছে আইরিন। হঠাৎ একটা মেয়েলি কণ্ঠে বুক চাপড়ানো কান্নায় পিছন ফিরে দেখল, এটা নওশাদের মা। আইরিন তড়িঘড়ি করে দাঁড়াল। অথচ অপরাধীর মতো নিজেকে গুটিয়ে রেখে এককোণে নিজেকে দাঁড় করালো তার চোখে মুখে রাজ্যের বিমর্ষতা, অপরাধবোধের গ্লানি কোনো সাহসেও নওশাদের মায়ের সামনে গেলো না। হঠাৎ, নওশাদের হুঁশ ফিরে এলো মায়ের আহাজারিতে। চোখ খুলে মায়ের দিকে চেয়ে ডাক দিল- মা, মা; ছোটকালের শিশুটির মতো নওশাদের দুই হাতে চুমু দিয়ে যাচ্ছে, যেন আজ কারো বাঁধা মানবেই না। আগত সবার চোখগুলো ভিজে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। আইরিনের একটু উচু স্বরে কান্নাতে মায়ের দৃষ্টি ও নওশাদের ফিরে দেখল আইরিন! পাশে রিক্সাচালকের মুখে মৃদু বিজয়ের হাসি। আইরিন গাঁদা ফুলের মালা হাতে অপরাধীর মতো হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে। নওশাদের মা হাতের ইশারায় বলল- আয় মা, কাছে আয়।

সবার চোখে মুখে আনন্দ। নওশাদের পাশে এসে আইরিন মালাটি হাতে নওশাদের মাথার পাশে মাথাটি ফেলে কেঁদে উঠল- আমায় ক্ষমা করো, নওশাদ আইরিনের মাথায় হাত বুলাতে সেদিনের সে ক্লিপটা হাতে লাগতে উঠে বসে মৃদু হেসে বলে, ক্লিপটা তো এখনো গেঁথে আছে, তাকাও তো, নাকে তো আমার দেওয়া সে নাকফুল। সবাই একযোগে হেসে উঠল।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com