আজ বুধবার, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ২৮শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ বিকাল ৫:২১ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

অণুগল্পঃ দ্বন্দ্ব । সুমাইয়া সুলতানা রূপা

ভর সন্ধ্যায় নদীর ঘাটে দু’জনে পাশাপাশি বসে আছে। সারাদিনের ভ্যাপসা গরমের অসহ্য ক্লান্তি যেন নিমিষেই দূর করে দিয়েছে হঠাৎ করে আসা ঠান্ডা হাওয়া। হ্যাঁ সারাদিনের তুলনায় এই অবস্থাকে ঠান্ডা-ই বলা চলে। এ যেন স্বস্তির হাওয়া। হৃদয়ে দোলা দিয়ে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর ছেলেটি আচমকা মেয়েটির চোখের পানে তাকিয়ে একটা প্রশ্ন করলো।
-আচ্ছা এই বৈশাখে তুমি কি চাও আমার কাছে?
মেয়েটি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো,
-আমি যা চাই তা কি তুমি দিবে বা দিতে পারবে? বল পারবে?
ছেলেটি কি বলবে ভেবে না পেয়ে বললো, -আগে বলো কি চাও? তবে চার/ পাঁচ টা অপশন দিবা। যেকোন একটা পাবে। নির্দিষ্ট একটা চাইতে পারবে না।
-না কোন অপশন নেই। একটাই চাইবো। যদি দিবে কথা দাও তবেই বলবো। নয়তো থাক।
-এরকম করছো কেন? আগে চাও তো! তারপর দেয়ার মতো হলে অবশ্যই দেবো। এতো প্যাঁচাও কেন?
-দেয়ার মতোই এবং তুমি চাইলেই দিতে পারো।
ছেলেটি কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে পাশে বসে থাকা শান্ত মেয়েটি কি চাইতে পারে? এটা ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার নেই তার। ছেলেটি ভেবেচিন্তে পরিস্থিতি অনুকূলে এনে বললো,
-তুমি আমাকে ছাড়া বাকি সব চাইতে পারো। আমি এনে দেবো। কিন্তু আমাকে চাইতে পারবে না।
-শর্ত দিচ্ছো?
-শর্ত নয় বাস্তবে ফেরাচ্ছি।
-তুমি কি করে বুঝলে আমি তোমাকেই চাইবো?
-তোমাকে অন্তত এতটুকু তো বুঝি এবং জানি। তোমার চোখ দেখলেই আমি তোমার মনের খবর পড়তে পারি। তাছাড়া আমার মন জানে তুমি আমাকেই চাও। তোমার হৃদয়ের খবর আমার অজানা নয়।
-আচ্ছা একটা ছেলে কখন একটা মেয়ের মনের কথা পড়তে পারে জানো? কখন মেয়েটিকে বুঝতে পারে?
-তুমি আমাকে প্যাঁচাচ্ছো মেয়ে। এভাবে ফাঁদে ফেলে কথা আদায় করতে চাও?
-না। আমি কিছুই করছি না। তোমার কথার প্রসঙ্গেই বলছি। জবাব দাও।
-আচ্ছা বলছি। সময়ের সাথে সাথে একসাথে থাকতে থাকতে অনেক কিছুই বুঝা যায়। এতদিন ধরে তোমায় জানি সে হিসেবেই।
-না। যথার্থ উত্তর হচ্ছে না তুমি এড়িয়ে যাচ্ছো সত্যিটা। তোমাকে আমি খুব ভালো করেই জানি। হাজার বছর একসঙ্গে থাকলেও তুমি কারও মনের কথা ধরতে পারবে না। যদিনা তার প্রতি তোমার আত্মিক টান থাকে! সুতরাং বলে ফেলো আসল কথা। ভয় নেই! তোমাকে চাইতে গিয়ে পাওয়ার ভুল আশা করবো না। নিশ্চিন্তে বলতে পারো।
-আসলে হ্যাঁ তুমি ঠিকই ধরেছো। তোমাকে ভালোবাসি বলেই তোমার মনের কথা বুঝেছি। কারণ এটা তো জানি, কেউ কাউকে ভালোবাসলেই কেবল মনের কথা বুঝতে পারে। বুঝার ক্ষমতা অর্জন করে। তাই আমি বুঝেছি তুমি আমাকেই চাইবে। পৃথিবীতে তোমার আর দ্বিতীয় কোন চাওয়া নেই।
-চাইলে ক্ষতি কি? খুব বেশি কঠিন কিছু চেয়েছি? হ্যাঁ তোমাকেই চাই আমি। প্রথম এবং শেষ চাওয়া আমার কেবল তুমিই। দোষ কোথায়?
-কারণ আমরা জানি বিশেষ করে আমি জানি এ হয় না। হবে না। আমরা একে অপরকে ভালোবাসলেও কখনো এক হতে পারবো না। সম্ভব না।
-ধরে নিলাম সম্ভব না। মেনে নিলাম তোমার সব কথা। কিন্তু যতদিন আমরা একসাথে আছি, যতদিন আমরা এভাবে আছি ততদিন কি আমরা এক হতে পারি না? ততদিন কি তুমি পরিপূর্ণ ভাবে আমার হতে পারো না? ভালোবাসতে পারো না? তোমাকে ভালোবাসার পূর্ণ অধিকার দিতে পারো না? বুঝলাম আমরা একে অপরকে পাবো না। কিন্তু যতদিন এভাবে আছি ভালোবেসে মুহূর্তগুলো কি আমরা ভালোভাবে কাটাতে পারি না?
-না। পারি না। এতে কেবল কষ্টই বাড়বে দু’জনের। বিশেষ করে তোমার। সম্পর্কের মাঝে এক্সপেক্টেশন চলে আসলেই সেখান থেকে সরে যাওয়া অনেক কঠিন হবে তোমার জন্য। আমরা জেনেশুনে এই ছেলেমানুষি করতে পারিনা।
-তবে জিজ্ঞেস করলে কেন কি চাই? যেখানে জানো কি চাইতে পারি। যেখানে জানো তা দেয়া অসম্ভব! কেন কষ্টের ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করছো হৃদয়? কেন? কে বলেছে আমার ইচ্ছে পূরণ করতে?
আমি তোমাকে চাইবো না। কখনোই না। তবে জেনে রেখো আর কোনদিন এমন প্রশ্ন করবে না। যেখানে তুমি ছাড়া দ্বিতীয় কোন চাওয়া নেই আমার।

মেয়েটির গলা ধরে এসেছে। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ঝাপসা চোখে নদীর জলের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখছে অথচ দেখছে না। চুপচাপ বসে আছে দু’জনে। ছেলেটি জানে তার পাশে বসা চাপা স্বভাবের মেয়েটি কাঁদছে। তাকে কাঁদাতে চায়নি সে। কিন্তু কি করবে হঠাৎ করে কি যে হলো এমন প্রশ্ন করে বসলো! যা দেয়া তার পক্ষে অসম্ভব। সে যে পরিস্থিতি, সময়, অর্থ, পরিবার, সমাজ নামক গন্ডিতে বন্দী। বড়ই অসহায় সে। সেও তো চায় তার ভালোবাসাকে আপন করে পেতে। সেও কি কম ভালোবাসে মেয়েটিকে! মুখে বলে না তাতে কি? মেয়েটিও জানে তার না বলা মনের কথা। এবং বুঝে তার অসহায়ত্ব। তাদের সীমাবদ্ধতা।
পরিস্থিতি কিংবা সময় এভাবে কত ভালোবাসার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানে। দু’টো হৃদয় এক হয়েও সময়ের ফেরে চলে যেতে হয় যোজন-যোজন দূরে। মানসিক দূরত্ব নয় বাহ্যিক বা সামাজিক দূরত্বই সম্পর্কগুলো কে কুড়ে কুড়ে খায় প্রতিনিয়ত।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com