ডক্টর ভীমরাও রামজি আম্বেডকর ১২৬ তম জন্মদিন পালনের প্রাসঙ্গিকতা

৯৮ বার পঠিত

সুকুমার মিত্র, কলকাতা # আজ ডক্টর ভীমরাও রামজি আম্বেডকর ১২৬ তম জন্মদিন। তাঁর প্রতিও আমি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ভারতের গরীব “মহর” পরিবারে (তখন অস্পৃশ্য জাতি হিসেবে গণ্য হত) জন্ম গ্রহণ করেন। আম্বেদকর সারাটা জীবন সামাজিক বৈষম্যতার অর্থাৎ অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছেন। তিনি হিন্দু ধর্মের জাতপাত অস্পৃশ্যতার প্রতিবাদে বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। তাঁকে অনুসরণ করে বহু দলিত মানুষ বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন।

১৯৫৫ সালে তিনি ভারতীয় বৌদ্ধ মহাসভা গঠন করেন। অস্পৃশ্যতা আজও সমাজে রয়ে গিয়েছে। তার ডালপালা বিস্তার করার চেষ্টা চলছে পরিকল্পিতভাবে। সেই কথাই পরে আসব। আম্বেদকরকে মরণোত্তর “ভারতরত্ন” – সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় উপাধি’তে ভূষিত করা হয়। বহু সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে, ভারতের মহাবিদ্যালয় শিক্ষা অর্জনে আম্বেদকর প্রথম “সমাজচ্যুত ব্যক্তি”। ১৯০৭ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম অস্পৃশ্য হিসেবে বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বিভাগের স্নাতকোত্তর ছাত্র হিসেবে যোগ দেন। ১৯২২ সালে আম্বেডকর ব্যারিস্টার হন। আম্বেদকর ১৯৩৫ সালে মুম্বাইয়ের সরকারি আইন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন।

১৯৪৮ সালে আম্বেদকর হিন্দুবাদকে কর্কশ ভাষায় সমালোচনা করেন তাঁর “দ্য আন্‌টাচেব্যলসঃ এ থিসিস অন দ্য অরিজিনস অব আন্‌টাচেব্যলিটি” তে বলেন যে, “হিন্দু সভ্যতা হচ্ছে মানবতাকে দমন এবং পরাভূত করতে একটি পৈশাচিক কৌশল।” তিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী। তাঁকে স্বাধীন ভারতে সংবিধান খসড়া সমিতির সভাপতি করা হয়। আম্বেদকর নারীদের অধিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন। ৬ই ডিসেম্বর ১৯৫৬ সালে তাঁর নিজ বাড়ি দিল্লীতে ঘুমন্ত অবস্থায় চির নিদ্রায় শায়িত হন। অস্পৃশ্যতা, জাত-পাত যা আজও সমাজের ব্যাধি তা থেকে আম্বেদকরের মৃত্যুর পর ৬১ বছর কেটে গিয়েছে। কিন্তু আমরা জাতপাত থেকে মুক্ত হতে পারিনি।

গত এক বছরে গোটা দেশে নিম্ন বর্ণের দলিতদের উপর হামলা শুধু না খুন করা হয়েছে সাধারণ দলিত মানুষ থেকে দলিত সাহিত্য নিয়ে গবেষকদেরও। বরোদা কলেজে আম্বেদকরের ক্লাস বয়কট থেকে তাঁকে কলেজের স্টাফ রুমে কলসী থেকে জল দেওয়ার জন্যও আপত্তি তুলেছিলেন সহকর্মী অধ্যাপকরা। ১৯২০ সালে নিম্নবর্ণের জাতিদের উপর অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশ করার জন্য ‘মুক নায়ক’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ওই বছর নাগপুরে হিন্দুধর্মীয় বৈষম্যনীতির কঠোর সমালোচনা করে অস্পৃশ্যদের সর্বভারতীয় প্রথম সম্মেলন হয়। তারপর বহু বছর কেটে গেছে দেশের গঙ্গা, কৃষ্ণা, কাবেরি, গোদাবরী, ব্রহ্মপুত্র দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গেলেও এখনও অস্পৃশ্যতা আমাদের দেশে থেকে গিয়েছে। বাংলায় এই সমস্যা তুলনামূলক কম হলেও এখন অনেকে বাঁকা চোখে দেখেন দলিত সম্প্রদায়কে। অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে অবশ্য আম্বেদকরের অনেক আগেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি। অত্যন্ত আক্ষেণপের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি আমাদের দেশে এখন কেন্দ্রে ও কয়েক রাজ্যের শাসক দল উচ্চবর্ণের দ্বারা প্রভাবিত। আর তাই রাজ্যে রাজ্যে বেশ কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে দলিতদের উপর হামলা করে। দলিত নেতা ও গবেষকদের খুন করে।

উনাও-এ দলিতদের প্রকাশ্যে দিনের বেলায় ঘিরে লাথি মারা হচ্ছে, লাঠি পেটা করা হচ্ছে তারপর মোটর গাড়ির পিছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে প্রকাশ্য রাস্তায় টেনে হেচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এবং এই ছবি ক্যামেরায় তুলে তা পোস্ট করে গর্ব বোধ করছে এক শ্রেণীর বর্ণহিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা। যাঁরা মারছেন ও ছবি তুলছেন তাদের দেখা গেলেও সেই রাজ্যের পুলিস তাদের গ্রেফতার করেনি। ২০১৭ সালে যখন মহাকাশ নিয়ে গবেষণা চলছে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে এমনকী ভিন্ন সৌর জগতের সন্ধান নিয়ে তখনই মধ্য যুগকে হার মানায়এমন পশ্চাদপদতা নিয়ে আমরা চলেছি। আর এই পশ্চাদপতাকে মদত দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় শক্তি। ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব। তবে শুধু মুখ্যমন্ত্রী সরব হলেই চলবে না সর্বস্তরের মানুষকে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা আমরা এক অন্ধকার যুগের দিকে এগিয়ে যাবো। আম্বেদকর জয়ন্তী পালন তখনই সার্থক হবে যখন সমাজ থেকে আমরা এই সমস্ত রোগ, ব্যাধি দূর করতে পারব।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com