নন্দীগ্রাম নিছকই এক ফালি ভূঃখণ্ড নয় (ভিডিওসহ)

১,০৬৬ বার পঠিত

সুকুমার মিত্র, কলকাতা # ১৪ মার্চ, ২০০৭ নন্দীগ্রামে ছিল বিরুদ্ধ বাতাস, অনন্ত নীরবতা, বাতাসে গোঙানি আর বুকের মাঝে ছলাৎ ছলাৎ…এক কবির ভাষায়, ‘এভাবেই কেটেছে দিন, কেটেছে রাত/ চৌদ্দই মার্চ দু’হাজার সাত। আগামি কাল দশ বছর পূরণ হবে নন্দীগ্রামে পুলিশ ও সিপিএম হার্মাদদের যৌথ গণহত্যা অভিযানের। নন্দীগ্রামে স্বতস্ফুর্ত গণবিদ্রোহের সূত্রপাত কিন্তু ঘটে গিয়েছিল তারও আগে। ২৯ ডিসেম্বর, ২০০৬। নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্তে তৎকালীন সিপিএম সাংসদ ও হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান লক্ষ‌ণ শেঠ প্রকাশ্যে দলীয় সভায় ঘোষণা করেছিলেন নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল(সেজ) গড়া হবে।

সিপিএমের সেই দলীয় সভায় শুরু প্রতিবাদের গুঞ্জন পরে আগ্নেয়গিরির আকার ধারন করে। নন্দীগ্রামে লক্ষ‌ণ শেঠের সভা থেকে ফিরে সোনাচূড়া-সহ প্রস্তাবিত কেমিক্যাল হাবের মৌজাগুলিতে সিপিএম দলীয় কর্মী, সমর্থকদের মধ্যে বিদ্রোহের সৃষ্টি করেছিল। এক বিরাট অংশের মানুষ সেদিন দৃঢ় পণ করলেন সেজের জন্য জমি দেওয়া হবে না। সেদিনের সিপিএম নেতা লক্ষ‌ণ শেঠের অনুগামীরা জমি নিতে মরিয়া হয়ে সশস্ত্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সাধারণ গ্রামের কৃষকদের উপর। ৩ জানুয়ারি, ২০০৭ কালিচরণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে জমি অধিগ্রহণের বিজ্ঞপ্তি লাগাতে এসে স্বতস্ফুর্ত হাজার হাজার কৃষকের গণপ্রতিরোধের মুখে বাধা পায় হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের আধিকারিক ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী।

ভুতার মোড়ে(বর্তমান নাম শহিদ মোড়) বড় বাঁধের উপর জমায়েত হওয়া গ্রামবাসীদের লক্ষ্যর করে টিয়ার গ্যাস ও গুলি ছোড়ে বুদ্ধেদব ভট্টাচার্যের পুলিশ বাহিনী। এর পরের দিন ৪ জানুয়ারি, ২০০৭ নন্দীগ্রামের সকলস্তরের মানুষদের নিয়ে গঠিত হয় ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি(BUPC)। শুরু হয় সংগঠিত শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ আন্দোলন। বহু মানুষ, বহু দল, বহু নেতা থাকলেও একথা অনস্বীকার্য উদার মানসিকতা নিয়ে সেদিন নন্দীগ্রাম আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন সেদিনের দক্ষিলণ কাঁথির বিধায়ক(বর্তমানে রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী) শুভেন্দু অধিকারী। গ্রামের মানুষ পুলিশ ও সিপিএম হার্মাদদের হাত থেকে এলাকাকে বাঁচাতে রাস্তাঘাট কেটে গণ আন্দোলের এক স্বাধীন ভূ-খণ্ড তৈরি করেছিলেন নন্দীগ্রামে। এর প্রত্যক্ষ‌ প্রভাব পড়ে তালপাটি খালের দক্ষি্ণে খেজুরিতে। হলদি নদীর ওপার মহিষাদলে, হলদিয়ায়।১৪ মার্চ, ২০০৭- এর পর গোটা দুনিয়ার মানুষ জেনে গেল নন্দীগ্রামের সাহসী সেজ বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের কথা। আর একই সঙ্গে উন্মোচিত হয়ে গেল বামফ্রন্ট সরকারের বর্বরোচিত পুলিশি অভিযানের নামে গণহত্যায় শাসকদলের ক্যাডারদের নির্লজ্জ হাত ধরাধরির ঘটনা। সফল হল না পুলিশি অভিযানের উদ্দেশ্য। নন্দীগ্রামের মানুষ বশ্যতা স্বীকার না করে প্রতিরোধের পথকে আরও শক্ত করে আগলে ধরলেন। টানা ১১ মাস লড়াই-এর পর সিপিএমের এলাকা দখলের জন্য ফের এলাকা থেকে পুলিশ ক্যাম্পগুলি তুলে নিয়ে নন্দীগ্রাম থানার পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রেখে ঘটনো হল ১০ নভেম্বর শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর হামলা, হত্যালীলা, লাশ পাচার, গুম, অপহরণের ঘটনা। তখনকার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধবাবু ও বামনেতা বিমানবাবু বললেন সূর্যোদয় হয়েছে, সূর্যের তাপে পাওয়া যাবে। হ্যাঁ,সত্যি তাপ পাওয়া গেল বিধানসভার উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামে বামপ্রার্থীর শোচনীয় পরাস্ত হওয়া। তারপর ২০০৮এর পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচন, সর্বোপরি ২০১১-এর বিধানসভা নির্বাচনে বামশাসকদের কোমরটা ভেঙ্গে গেল। রাজ্যে এল পরিবর্তন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর সরকার ক্ষ‌মতায় এল।

২০১৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচন ও ২০১৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী ভোট এক জায়গায় আনার নানা চেষ্টা করেও শক্তি খুইয়েছে রাজ্যের বামফ্রন্ট। কংগ্রেস, বিজেপি সকলেই পর্যুদস্ত হয়েছে। এসবই সকলের জানা। এসব তো গেল নিছক কালপঞ্জী। কিন্তু আন্দোলনে নন্দীগ্রামের আত্মত্যাগ, আবেগ, ক্ষ‌য়-ক্ষ‌তি, মিথ্যা মামলার ঝুঁকি নিয়েও পিছু না হঠার ঘটনাকে ভুলে যাওয়া যায় না। সেদিনের খুনে, ধর্ষক, লুঠেরা অপরাধীরা প্রকাশ্যে আজও ঘুরে বেড়াচ্ছে। অপরাধী পুলিশ আধিকারিকদের শাস্তি হয়নি, হয়েছে পদোন্নতি। এসব তিলে তিলে নন্দীগ্রামের আন্দোলনকারীদের মধ্যে, নির্যাতিতাদের মধ্যে প্রশ্ন থেকে চাপা ক্ষোিভ না হলেও অসন্তোষের যে সৃষ্টি করেছে তা অস্বীকার করা যাবে না। আর এই অসন্তোষ থেকে তাঁদের মধ্যে আজ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। শহিদদের কথা ৩ জানুয়ারি, ৭ জানুয়ারি, ১৪ মার্চ, ২৭ অক্টোবর ও ১০ নভেম্বর ক্যালেন্ডারে এই দিনগুলি দেখে অনুষ্ঠান পালনের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

সারা বছর কোনও দেখা নেই, আন্দোলন নেই, শুধু এই দিনগুলি এলে তা উদযাপন করা। তবে প্রাক্তন সাংসদ বর্তমানে রাজ্যের মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ব্যক্তিগত উদ্যোগে শহিদ পরিবার ও নির্যাতিতাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে শুরু করে নানা ভাবে নিয়মিত সাহায্য করে থাকেন। ১৪ মার্চের গণহত্যার ঘটনার তদন্তের ভার সিবিআই-এর উপর থাকলেও বর্ষব্যাপী আরও ২০ জন আন্দোলনকারীর খুনের ঘটনার শাস্তি হয়নি দুষ্কৃতীদের। এসব খুনের তদন্ত ভার ছিল রাজ্য পুলিশের উপরই। কি হল সেই সব খুনের মামলার? পরিহাসের বিষয় কলকাতা হাইকোর্ট থেকে নন্দীগ্রাম গণহত্যা মামলার ফাইলটি এক সময় খোওয়া যায়। পরে অবশ্য পাওয়াও গিয়েছিল। সিবিআই চার্জশিটে দোষী পাঁচ পুলিশ অফিসারকে বাঁচিয়ে চার্জসিট জমা দিয়েছে। সংসদীয় ক্ষ‌মতার রাজনীতির বিন্যাসে নন্দীগ্রাম গণহত্যা মামলা এখন এক প্রশ্ন চিহ্নের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। নন্দীগ্রামের ভাঙাবেড়া, সোনাচূড়া, গড়চক্রবেড়িয়া, তেখালি, গোকুলনগর, ওসমানচক, সাউদখালি, কেন্দেমারি, হাজরাকাটা, সাত নম্বর জালপাই, সাতেঙ্গাবাড়ি, রানিচক, পারুলবাড়ি, মহেশপুর, জামবাড়ি, আমগাছিয়া, সামসাবাদ, জৈরুর মোড়, নন্দীগ্রাম, হাসপাতাল, থানার মোড়, বিডিও অফিস আর পথে নামা, ত্রাণ শিবিরে কাটানো, হাসপাতালের বেডে মাসের পর মাস শুয়ে থাকা মানুষগুলো আর স্বজনহারা পরিবারগুলির মুখ আজও স্মৃতিতে মোটেই ধূসর নয়।

সিপিএমের সূর্যোদয়ের পর কত শুক্লপক্ষ‌, কৃষ্ণপক্ষ‌ কেটে গিয়েছে। হয়ে গিয়েছে আটটি নির্বাচন। এসবই আছে সবই থাকবে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। নেই শুধু মেজর সুবেদার আদিত্য বেরা সহ ১১ জন নিখোঁজের কোনও সন্ধান। কে বা কারা গুম করল সেই প্রশ্নের উত্তর নেই। নেই শাস্তি গণহত্যা ও গণধর্ষণকারীদের। নন্দীগ্রাম গণহত্যায় সিবিআই-এর পক্ষ‌পাতদুষ্ট রিপোর্ট-এর বিরুদ্ধেও নেই আন্দোলন। সুবিচারের দাবি, এটা আন্দোলনের দায়। অস্বীকার করতে পারেন না কেউ। অস্বীকার করতে পারেন না সেদিনের ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্ব। আমরা যেন ভুলে না যাই যে, নন্দীগ্রাম নিছকই এক ফালি ভূঃখণ্ড নয়। রাজ্যে পরিবর্তনে বহু আন্দোলনের প্রভাব রয়েছে। সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে সেই প্রক্রিয়া শুরু হলেও পরিবর্তনের ভরকেন্দ্রে ছিল নন্দীগ্রাম। লেখক- বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com