উত্তরপ্রদেশে প্রথম দফা ভোটে জাট, মুসলিম, গুজ্জর ও দলিতরা এগিয়ে দিল অখিলেশকে

২৭০ বার পঠিত

সুকুমার মিত্র, কলকাতা # উত্তরপ্রদেশের নির্বাচকমণ্ডলীর উপর বিজেপির যে ভরাস নেই তা প্রথম দফার ভোটেই স্পষ্ট হয়ে উঠল।শনিবার বিতর্কিত বলে পরিচিত বিজেপি বিধায়ক সঙ্গীত সোমের ভাই গঙ্গন সোম বুথে পিস্তল নিয়ে ঢুকতে গিয়ে আটক। শনিবার উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ চলাকালে মিরাটের সারধানা বিধানসভা কেন্দ্রের এক বুথে সকাল ৯টা নাগাদ পৌঁছলে নিরাপত্তাকর্মীরা ভিতরে ঢোকার মুখে তাঁর শরীর তল্লাসি করেন। ধরা পড়ে তাঁর কাছে পিস্তল আছে। তখনই তাঁকে আটক করে পুলিশ। এলাকায় চাঞ্চল্য দেখা দেয়। আয়োজনের কোনও ত্রুটি রাখেনি বিজেপি। তবুও এদিন প্রথম দফায় ভোট গেরুয়া শিবিরের কাছে খুব স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়নি। এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। সেই আঁচ পেয়ে এদিন রাজনীতির কথা নেই মোদির মুখে। উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী প্রচারে রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদবকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা, মসকরা ছাড়া নির্বাচনী প্রচারে রাজ্যের উন্নয়নের কোনও দিশা নেই বিজেপির কার্যত সুপ্রিমো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদির কন্ঠে। প্রথম থেকে এই ধারার প্রচার চললেও রাজ্যের ১৫টি জেলায় প্রথম দফার ৭৩টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটের ইঙ্গিত বুঝে বিজেপি নেতাদের স্নায়ুর চাপ বেড়ে গিয়েছে। প্রথম দফায় ভোট দিলেন ২ কোটি ৬০ লক্ষ‌ ভোটার। তবে ভোট প্রথম তিন ঘন্টায় অত্যন্ত ধীর গতিতে চললেও পরে ভোটের লাইন বাড়তে শুরু করে। তবে প্রথম তিন ঘন্টায় মন্থর গতির ভোট বিজেপির পক্ষেি ছিল অস্বস্তিকর।

ভোটের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে বিজেপির অভ্যন্তরে ক্ষোগভের ফলেই নাকি ভোট গ্রহণ কেন্দ্রে ভোটারদের একটা অংশকে টেনে আনতে বেশ বেগ পেয়েছেন বিজেপি কর্মীরা। পাশাপাশি রাজ্যের বাকি ছয় দফায় যে ভোট হবে সেখানে অখিলেশ যাদব ও রাহুল গান্ধিদের প্রচার চলছে তুঙ্গে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও রায়বেরেলি ও আমেঠিতে প্রচারে যাচ্ছেন। যুব নেতৃত্বের এই উদ্যোগে হতদ্যোম হয়ে পড়েছে বিজেপি। উত্তরপ্রদেশে রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনা চলছে সর্বত্র। উত্তর পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে এদিনের ভোট কার্যত অস্বতি বাড়িয়েছে মোদি-অমিত শাহদের। কারণ জাটেরা সংরক্ষ‌ণের দাবি জানিয়ে এলেও বিজেপি সেই ব্যাপারে কোন আশার আলো দেখাতে পারেনি। আর তাই শেষ মুহুর্তে শুক্রবার বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ জাট নেতাদের সঙ্গে পৃথক আলোচনায় বসেছিলেন। তবে সেই বৈঠকের পর ভোটের সমীকরণ যে আকাশ-পাতাল পরিবর্তন ঘটাবে এমনটা মনে করছেন না সংঘ নেতারা।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে মুজফ্ফর নগরে দাঙ্গার পর জাটেরা বিজেপির পক্ষের ভোট দিয়েছিল। যদিও এই ৭৩টি কেন্দ্রে ২০১২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র ১১টি কেন্দ্র ছাড়া ৬২টি কেন্দ্র সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাজী পার্টির মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছিল। আর তাই সমাজবাদী পার্টি সরকার গড়তে সক্ষ‌ম হয়েছিল। প্রসঙ্গত, উত্তরপ্রদেশের ৪০৩ টি বিধানসভা কেন্দ্রে যে সব রাজ্যে ভোট নেই সেই সব এলাকার নেতাদের বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য দায়িত্ব দিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ ভোটে জেতার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছে বিজেপি। বিজেপি একই কারণে সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ উত্তরপ্রদেশে প্রচারে পড়ে থাকলেও তেমন আসর জমাতে পারছেন না। তাই রাজ্যবাসীকে একরকম বাংলায় যাকে বলে ‘রকের আড্ডা’ অনেকটা মোদির সভায় বক্তব্য সেই রকমই। ভোট প্রচারে জোকস্-এর উপর প্রথম থেকেই জোর দিয়েছেন তিনি। আর তার কারণ উত্তরপ্রদেশে দলিত, সংখ্যালঘু মুসলিম ও জাটদের ভোট বিজেপির ঝুলিতে যাচ্ছে না এটা বুঝেই বিজেপির বক্তাদের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। তাই কখনও উচ্চবর্ণ-এর হিন্দু ভোট ধরার জন্য রাম মন্দির ইস্যু কখনও বা কালাধন উদ্ধারের জন্য নোটবন্দি নিয়ে সওয়াল করলেও মানুষের মন যে গলছে না তা সংঘ পরিবারের পক্ষ‌ থেকে বিজেপি নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আর এই বার্তা পেয়ে বিজেপি নেতারা লাস্ট মিনিট সাজেশনের মত জাট ভোট টানতে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চরণ সিং-এর নামে কৃষক কল্যাণ তহবিল চালু করার প্রতিশ্রুতি দিতে শুরু করেছেন। উল্লেখযোগ্য যেটা তা হল উত্তরপ্রদেশ ভোটকে বিজেপি মেগা ইভেন্ট হিসেবে দেখেছে। তাই অঢেল অর্থ ব্যয় করেছে মোদির দল। অর্থ ব্যয়ের তুলনায় সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি বিজেপি থেকে অনেক দূরে। রাজনৈতিক মহলের মতে বিমুদ্রাকরণের ফলে জাট-সহ উত্তরপ্রদেশের আপামর মানুষ যে ক্ষ‌তিগ্রস্ত হয়েছেন তা চরণ সিং-এর নামে প্রকল্প চালুর প্রতিশ্রুতিতে জাটদের মন গলবে না এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল। তাঁদের মতে, সমাজবাদী পার্টির মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের বিগত সরকারের উন্নয়নের প্রশ্নে সাধারণ মানুষ সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস জোটকে ভোট দিতে বদ্ধপরিকর। তবে রাজ্যের বেশ কিছু কেন্দ্র থেকে মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি বিজেপিকে পরাস্ত করে জয়ী হবেন। এমনকী গুজ্জর সম্প্রদায়ের ভোট মায়াবতীর বহুজম সমাজ পার্টির পক্ষে্ই গিয়েছে বলে অনুমান রাজনৈতিক মহলের। বিশেষত দাঙ্গা পীড়িত এলাকায় দলিত ভোট মায়াবতীর দিকে যাবে।

ফলে এককভাবে না হলেও মায়াবতীর সমর্থন নিয়ে সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস উত্তরপ্রদেশে বিজেপি বিরোধী সরকার গড়বেন। এই সম্ভাবনা রাজনৈতিক মহল নস্যাৎ করতে পারছেন না। তবে একাংশ মনে করছেন জাট, দলিত, গুজ্জর ও সংখ্যালঘুরা ভোট ভাগাভাগির সুযোগ দিয়ে বিজেপিকে ক্ষ‌মতায় ফিরতে পরোক্ষ‌ সাহায্য করবেন না। এটাই অখিলেশ যাদব ও রাহুল গান্ধির জোটের পক্ষেে বড় অ্যাডভান্টেজ। উত্তরপ্রদেশের মোট ভোট ১৪ কোটি ৫ লক্ষ‌। পুরুষ ভোটার ৭.৭ কোটি মহিলা ভোটার ৬.৩ কোটি। বিধানসভার মোট আসন ৪০৩টি। সরকার গড়তে গত লোকসভা নির্বাচনের মতই এবার বিজেপি-র স্লোগান ‘অব কি বার ৩০০কে পার’। ‘সাথ আয়ে, পরিবর্তন লায়ে, কমল খিলায়ে’। নির্বাচনী স্লোগানে দলগতভাবে বিজেপি-রে পক্ষেক ভোটের কথা না বলে মোদির পক্ষে’ ভোট চাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত লোকসভা নির্বাচনের মত এবারও স্লোগান ‘দো বাতে কভি না ভুল-নরেন্দ্র মোদি ঔর কমল কা ফুল।’ আর এই ধরনের স্লোগান সংঘ পরিবারের মধ্যে বির্তকের সৃষ্টি করেছে। দল থেকে ব্যাক্তি মোদিকে বড় করে দেখানোটা আরএসএস ভাল ভাবে দেখছে না। তবে প্রথম দফার এবার ভোটে এই এলাকায় বিজেপির ঝুলিতে কটা আসন আনবে তা জানতে গণনার দিন পর্যন্ত অপেক্ষার করতে হবে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com