জাঠেরা পাশে নেই, শংকায় উত্তরপ্রদেশে বিজেপি

৬৩ বার পঠিত

সুকুমার মিত্র, কলকাতা # (আমাদের স্মরণে থাকা উচিত ২০১৪ সালে হিন্দুত্বের জিগির রাজ্যের পশ্চিমাংশ থেকে তা উত্তরাংশেও ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় মুজফ্ফনগরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। আর সেই জিগিরে গত লোকসভায় বিজেপি ক্ষ‌মতায় ফিরে আসে। বিমুদ্রাকরণের ফলে উৎপাদিত ফসল মূলত কৃষকের আখ বিক্রিতে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এই এলাকায় কৃষকদের মধ্যে জাঠেরাই প্রধান শক্তি। উত্তরপ্রদেশ ও হরিয়ানার জাঠেরা মোদির নোটবন্দি নীতির বিরুদ্ধে ‘আরক্ষ‌ণ সংঘর্ষ সমিতি’ গঠন করেছেন। সমিতি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে কোনও জাঠ যেন বিজেপিকে ভোট না দেয়। )

‘চৌবে গয়ে ছব্বে বনানে, দুবে বনকর লউটে’ এর বাংলা তরজমা করলে দাঁড়ায় মুখে বড় বড় কথা বললেও কিছু করতে পারেনি, মুখ ছোট করে ফিরে এসেছে। যাঁরা উত্তরপ্রদেশের কথ্য ভাষা জানেন সেই সব বয়স্ক মানুষরা তাঁরা সহজেই বুঝতে পারবেন এই কথার তাৎপর্য।  যুদ্ধক্ষেত্র উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বর্তমান অবস্থা অনেকটা হাতের পাখি উড়ে যাওয়ার দশা । কারণ আসন্ন উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তাঁর কোর ব্যাঙ্ক হারাতে চলেছে। বর্ণ হিন্দুদের একাংশ বাদ দিলে জাঠ, দলিত, হরিজন, সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের নির্বাচকমণ্ডলী অলিখিত একটা জোট অন্তরালে করে ফেলেছেন। যা ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হবে শুধু না উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি-কংগ্রেস জোটের ক্ষ‌মতায় আসার পথকে ক্রমশ সহজ করে তুলেছে।  

উচ্চ বর্ণের হিন্দু ও জাঠদের ধরে রাখতে দড়ি টানাটানি করলেও যাদবদের মধ্যে যাঁরা ওবিসি নন তাঁদের ভোট ব্যাঙ্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। রাজনৈতিক মহলের মত বিজেপির পকেট ভোট উচ্চ বর্ণের হিন্দু ও জাঠদের দরকষাকষিতেও তাদের ভোট ব্যাঙ্ক ভেঙে ছত্রখান হয়ে গিয়েছে। আর এই ভোট টানতে গিয়ে দর কষাকষির রাজনীতিতে উচ্চ বর্ণের হিন্দু ও জাঠদের ভোটের একটা বড় অংশ বিজেপি হারাতে পারে। ইতিমধ্যেই ব্রাহ্মণ ও বানিয়ারা নির্বাচনে মহাজোট দেখতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে উত্তর উত্তরপ্রদেশে নীচের তলায়। এই এলাকায় দলিতরা বহুজন সমাজ পার্টির তলায় ঐক্যবদ্ধভাবে তাঁদের আস্থা হারাননি। এর ফলে বিজেপির অভ্যন্তরে তিক্ততা বেড়েছে। তবে যাদবদের মধ্যে যাঁরা ওবিসি নন তাঁরা সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজবাদী পার্টি ও বিজেপির মধ্যে ভাগ হলও মূলত সব চেয়ে ক্ষ‌তিগ্রস্ত হবে বিজেপি। কারণ দলিতরা গত দেড় বছর ধরে উত্তর, পশ্চিম এমনকী দক্ষ‌িণ ভারতে তাঁদের উপর বর্বর-পৈশাচিক হামলার ঘটনা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।

উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাংশে বেশির ভাগ এলাকা সংঘ পরিবারের উত্থানে কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন জাঠেরা। নোট বন্দীর যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে তা চাপা থাকেনি।তাঁরা স্লোগান তুলেছেন, ‘মোদি তেরে রাজ মে, মুজি গেয়ি ব্যাজ মে, আউর প্রালি গয়ি শরম-তগপৌ মে’। যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘ মোদি তোমার রাজত্বে, আমাদের উৎপাদিত সমস্ত শষ্য ঋণের সুদ পরিশোধ করতে চলে যাচ্ছে। কেউ আমাদের বিনা সুদে ঋণ দেয়নি।’ এই স্লোগান এখন জাঠ অধ্যুসিত এলাকায় দেওয়ালে,  ট্রাক্টরের পিছনে, ট্রলির পিছনে সর্বত্র দেখা যাচ্ছে।

আমাদের স্মরণে থাকা উচিত ২০১৪ সালে হিন্দুত্বের জিগির রাজ্যের পশ্চিমাংশ থেকে তা উত্তরাংশেও ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় মুজফ্ফনগরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। আর সেই জিগিরে গত লোকসভায় বিজেপি ক্ষ‌মতায় ফিরে আসে। বিমুদ্রাকরণের ফলে উৎপাদিত ফসল মূলত কৃষকের আখ বিক্রিতে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এই এলাকায় কৃষকদের মধ্যে জাঠেরাই প্রধান শক্তি। উত্তরপ্রদেশ ও হরিয়ানার জাঠেরা মোদির নোটবন্দি নীতির বিরুদ্ধে ‘আরক্ষ‌ণ সংঘর্ষ সমিতি’ গঠন করেছেন। সমিতি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে কোনও জাঠ যেন বিজেপিকে ভোট না দেয়। কারণ জাঠেদের মধ্যে সংরক্ষ‌ণ সরকার না মেনে নেওয়ার ইস্যুটিও যুক্ত হয়েছে। এছাড়া দাঙ্গা পরবর্তী মুজফ্ফরনগরে তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের কাজ করা হয়নি। তাঁরা বিজেপিকে নির্বাচনে হারিয়ে চরম শিক্ষ‌া দিতে প্রস্তুত এমনটাই রাজনৈতিক মহলের দাবি।

জাঠেদের মধ্যে চৌধুরিদের সিদ্ধান্ত মুসলিম মৌলবীদের মত সমান গুরুত্ব। ফলে জাঠেদের এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে বিজেপির পক্ষ‌ে ভোট টানা খুবই কষ্টকর। আর এই কারণে বিজেপি বিরোধী দলের বিজয়ী প্রার্থী করার জন্য বহু চেষ্টা চালাচ্ছে। গত ৮ জানুয়ারি কংগ্রেসের প্রাক্তন বিধায়ক বিজেপিতে যোগ দেন। গৌতমবুদ্ধ নগরে জিওর বিধানসভা কেন্দ্রে মনোনয়ন টিকিট দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেসের প্রদীপ চৌধুরি, অজিত পাল ত্যাগি, রোমি সাহনি, বহজন সমাজ পার্টির বিধায়ক বালা প্রসাদ আওসির মত বহুজন  বহুজন সমাজ পার্টির বেশ কয়েকজন বিধায়ককে দলে টেনে নিয়েছে বিজেপি।

ছাড়াও সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা-সহ বহু নির্বাচিত বিধায়ক বিজেপি টেনে নিলও রাজনৈতিক মহলের মত বিধায়ক টেনে নিয়েছে। এমনকী সমাজবাদী পার্টির বিধায়কে অরদিমন সিং-এর স্ত্রী রানি পক্ষ‌ালিকা সিংকে আগ্রার বাহ কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী করা হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন এসব করেও বিজেপির পক্ষ‌ে ভোট ভাঙানো সম্ভব না। কারণ উত্তরপ্রদেশে সম্প্রদায়, জাতপাত ভিত্তিক রাজনীতির ধারা বহুকাল ধরে চলে আসছে। আর সেই কারণে কোনও দলের নেতা চলে গেলে ভোটাররা সদলে চলে যাবেন এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। নিশ্চিতভাবে বলা যায় উত্তরপ্রদেশের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে এই ‘ঘোড়া কেনা বেচা’-র বিপরীত ফলও হয়ে বিজেপির হিতে বিপরীত হতে পারে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com