পলাশ, মহুয়া, শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর চোখের জলে আদিবাসীপাড়ায় মহাশ্বেতা স্মরণ

মনিরুল হক, বাইগাছি (অশোকনগর) #  প্রয়াত সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবীর স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হল উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরের বাইগাছি সর্দারপাড়ায়। ১৪ আগস্ট, রবিবার বেলা তিনটেয় হেমাঙ্গ সাংস্কৃতিক সংস্থার উদ্যোগে বাইগাছি সর্দারপাড়ায় স্মরণসভায় এলাকার আদিবাসী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষদের জমায়েত ছিল উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও মহাশ্বেতা দেবীকে স্মরণ করে স্বাধীনতা দিবসে সর্দারপাড়ায় আয়োজন করা হয়েছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা শিবির। মহাশ্বেতা দেবীর কাজের অন্যতম ক্ষে ত্র সুদুর পুরুলিয়া থেকে নিয়ে আসা ১৪টি মহুয়া ও পলাশ গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে সুচনা হয় এদিনের অনুষ্ঠানের।

মহাশ্বেতা দেবীর নামে ১৩টি ও বুধন শবরের নামে একটি গাছ লাগানোর কাজে সকলে অংশ গ্রহণ করেন। গাছ লাগান প্রয়াত সাহিত্যিকের বোন সোমা মুখোপাধ্যায়. ডাঃ দেবপ্রিয় মল্লিক, পীযুষ চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার মিত্র-সহ বিশিষ্টজনেরা।শুধু গাছ লাগানোই নয়, প্রতিটি গাছ রক্ষা৩ করার জন্য অঙ্গীকার করেন এলাকার আদিবাসী মানুষজনেরা। এরপর আনুষ্ঠানিক ভাবে সভার কাজ শুরু হয় ‘মহা অরণ্যের মা’ মহাশ্বেতা দেবীর প্রতিকৃতিতে মাল্যদানের মাধ্যমে। সভায় উপস্থিত বক্তা, অতিথিগণ একে একে তাঁদের প্রিয় ‘দিদি’র প্রতিকৃতিতে মালা দেন। সভার সঞ্চালক ও হেমাঙ্গ সাংস্কৃতিক সংস্থার সম্পাদক তাপস ব্যানার্জি সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য রাখাল মুণ্ডাকে মঞ্চে ডেকে নেন।

বক্তব্য রাখছেন মহাশ্বেতা দেবীর স্নেহধন্যা লেখিকা তহমীনা খাতুন
বক্তব্য রাখছেন মহাশ্বেতা দেবীর স্নেহধন্যা লেখিকা তহমীনা খাতুন

এরপর একে একে এদিনের অতিথি বক্তা প্রয়াত সাহিত্যিকের মেজ বোন সোমা মুখোপাধ্যায়, নন্দীগ্রাম শহিদ স্মৃতি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অন্যতম উদ্যোক্তা চিকিৎসক ডাঃ দেবপ্রিয় মল্লিক, মহাশ্বেতা দিবির হিন্দি ভাষায় জীবনীকার ড. কৃপাশঙ্কর চৌবে, লোধা শবর কল্যাণ সমিতি প্রদীপ রায়, খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতির প্রশান্ত রক্ষিকত, দলিত লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারি, মহাশ্বেতা দেবীর ৩২ বছরের সচিব পীযুষ চট্টোপাধ্যায়, বীরভূমের খাদান বিরোধী আন্দোলনের নেতা কুণাল দেব, শ্রীকান্ত মাইতি, সমাজকর্মী গোলাম কিবরিয়া হোসেন, শ্রমিক নেতা বিশ্বনাথ চক্রবর্তী, লেখিকা তহমীনা খাতুন, সাংবাদিক সুকুমার মিত্রদের মঞ্চে ডেকে নেন।

মহাশ্বেতা দেবী এবং সর্দারপাড়ার বাসিন্দা হেমাঙ্গ সাংস্কৃতিক সংস্থার কর্মী চিরবালা মুণ্ডার প্রয়াণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী মালা বসু কর রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন। মহাশ্বেতা দেবীর স্মৃতিচারণা প্রসঙ্গে তাঁর বোন সোমা মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘দিদি যে প্রান্তিক মানুষের কত আপনজন ছিলেন তা প্রত্যন্ত বাইগাছি সর্দারপাড়ায় তাঁর স্মরণসভাই প্রমাণ। এই সভায় এসে আমি আপ্লুত। কলকাতায় ফিরে সব আপনজনদের সভার কথা বলব। প্রান্তিক মানুষ, অবহেলিত মানুষ, অত্যাচারিত, নিপীড়িত মানুষের কথা শুধু লেখা নয়, যতক্ষ‌ণ সমস্যার সমাধান না হচ্ছে ততক্ষ‌ণ সেই ইস্যু থেকে দিদি কখনও সরে আসতেন না। সরকারি আধিকারিক,পুলিশ আধিকারিক আর মণ্ত্রীদের চিঠি লিখে, ফোন করে প্রয়োজন পথে নেমে প্রতিবাদ করে সমস্যার সমাধান করার আন্তরিক চেষ্টা করে গিয়েছেন।সব কিছু শেষ দেখে ছাড়ার প্রবনতা তাঁর ছিল।

বক্তব্য রাখছেন মহাশ্বেতা দেবীর বোন সোমা মুখোপাধ্যায়
বক্তব্য রাখছেন মহাশ্বেতা দেবীর বোন সোমা মুখোপাধ্যায়

দিদিই প্রমাণ করেছেন অসি থেকে মসী ঢের শক্তিশালী। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম পর্বের পর রাজ্যে যে ক্ষ‌মতার পরিবর্তন সম্ভব হল তা তো আমরা নিজেরাই দেখলাম। তিনি সম্পর্কে আমার দিদি হলেও আসলে আমাদের সকলের মা ছিলেন।’ নন্দীগ্রাম শহিদ স্মৃতি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অন্যতম উদ্যোক্তা ডাঃ দেবপ্রিয় মল্লিক বলেন, উত্তাল আন্দোলনের দিনগুলিতে রাষ্ট্রশক্তি ও তখনকার শাসকদলের হামলায় জখম মানুষদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নন্দীগ্রামে মহাশ্বেতা দেবীর উদ্যোগে নন্দীগ্রাম শহিদ স্মৃতি স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়া হয়েছিল। একাজে দিদির সাহসী ও আত্মত্যাগী উদ্যোগ তিনি বিশদে ব্যাখ্যা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, জরুরি ভিত্তিতে শহিদ স্মৃতি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য তিনি দিল্লিতে একটি সভায় বক্তব্য পেশ করে যে টাকা সাম্মানিক হিসেবে সেদিন পেয়েছিলেন তা সঙ্গে সঙ্গেই দান করে দিয়েছিলেন।সেই টাকা ওই অ্যাম্বুলেন্স কিনতে সাহায্য করেছিল। আর সেটাই ছিল নন্দীগ্রামে প্রথম অ্যাম্বুলেন্স। আর মানুষের কল্যাণে দান করতে তাঁকে কোন সময় কুণ্ঠিত হতে দেখিনি।

ম্যাগসাইসাই হোক আর জ্ঞানপীঠই হোক যে কোনও পুরস্কারের টাকা পিছিয়ে পড়া এলাকার উন্নয়নের কাজে দান করেছেন। অত্যন্ত বড় মাপের মন ছিল তাঁর। মহাশ্বেতা দেবীর অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত মেদিনীপুর লোধাশবর কল্যাণ সমিতির কর্ণধার ও কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী প্রদীপ রায় বলেন, দিদির কথা মনে রেখেই কাজ করে যেতে হবে মানুষের কল্যাণে। মানুষের স্বার্থে লড়াইয়ে আমি আছি, থাকব, প্রয়োজনে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলাও করব। যে কোনও আইনি সহায়তা বা এলাকায় আইনি সচেতনতা শিবির করতে আমি সব সময়ে আপনাদের সঙ্গে আছি। প্রসঙ্গত, বুধন শবর হত্যার পর মহাশ্বেতা দেবী আনীত মামলায় হাইকোর্ট তাঁকে আদালত বান্ধব নিয়োগ করে। তাঁর নিরলস প্রয়াসে বুধন শবর হত্যা মামলায় বুধন শবরের পরিবার সুবিচার পেয়েছিল শুধু তাই নয়, এটি একটি দিশা নির্নায়ক রায় হিসেবে আমাদের দেশে বিখ্যাত হয়ে আছে। তারপর থেকে দিদির সঙ্গে নানাকাজে তিনি জড়িয়ে থেকেছেন। তাঁর সংস্পর্শে তাঁর পরিবারও দিদির বৃহৎ পরিবারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছেন।

পশ্চিমঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতির প্রশান্ত রক্ষিঁত সুদুর পুরুলিয়া থেকে ছুটে এসে স্মৃতিচারণায় বলেন, খেড়িয়া শবরদের অপরাধপ্রবন জাতির তকমা ঘুচিয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী।দিদির সঙ্গে কাজ করতে করতে তাঁরই অনুপ্রেরণায় খেড়িয়া শবরদের সঙ্গেই তিনি রয়ে গিয়েছেন। খেড়িয়া শবরদের কল্যাণে সমস্ত কাজের হিসেব কমিটিতে নয়, প্রকাশ্যে জনসভা ডেকে হাজারো মানুষের মাঝে জানিয়ে দেওয়ার প্রথা দিদি চালু করেছিলেন। যা আজ সোস্যাল অডিট হিসেবে সরকারি পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় আইন হিসেবে গৃহীত হয়েছে। বিশিষ্ট লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারি বলেন, ‘মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে আমার পরিচয় যাদবপুর-গড়িয়া এলাকার একজন রিক্সাচালক হিসেবে। আমার বই পড়ার আগ্রহের কথা জানতে পেরে তিনিই আমাকে প্রথম বর্তিকাতে লিখিয়েছিলেন। আজ রাজ্যের গণ্ডি ছাপিয়ে আন্তর্জাতিকস্তরে লেখক হিসেবে আমার পরিচিতির নেপথ্যে মহাশ্বেতা দেবীর অবদানের কথা কিভাবে ভুলব? মহাশ্বেতা দেবীর স্নেহধন্যা তহমীনা খাতুন বলেন, মানুষের সমস্যার কথা জানতে পারলেই জানানোর একটাই লোক ছিলেন দিদি।

যখনই মানুষের বিপদ দেখেছি দিদিকে প্রথমে ফোনে জানিয়েছি, পরে বিস্তারিত লিখেছি, অনেক সময় গিয়ে বলেছি। দিদি সব জেনে প্রতিকারে উদ্যোগী হতেন। এমন মানুষ এই রাজ্যে বিরল। স্মরণসভায় সমাপ্তি ভাষণ দেন হেমাঙ্গ সাংস্কৃতিক সংস্থার সম্পাদক তাপস ব্যানার্জি। তিনি বলেন, ‘এই আদিবাসী সর্দারপাড়ায় মহাশ্বেতা দেবীর স্মরণসভা করতে পেরে আমরা গর্বিত। তিনি আরও বলেন, তাঁর ডাকে আমরা বারবার পথে নেমেছি। তাঁর ডাকে ছুটে গিয়েছি। আসলে তিনি তো ছিলেন জনজাতি, প্রান্তিক, অবহেলিত, সংগ্রামী মানুষের একজন। তিনি আমাদের সবার মা, মহা অরণ্যের মা।’ এরপর আদিবাসী মহিলাদের ঝুমুর নৃত্য পরিবেশিত হয়। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনী নিয়ে রাজা সেনের তৈরি তথ্যচিত্র প্রদর্শিনীর মাধ্যমে দীর্ঘ সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন সভাপতি রাখাল মুণ্ডা।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
৬৬ বার পঠিত
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com