লক্ষ্মীপুরের উপকুলীয় বাতাসে নবান্নের হাওয়া, হরিয়ে যাচ্ছে পিঠাপুলির আয়োজন

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি: লক্ষ্মীপুরের দিগন্তজুড়ে এখন আমন ধানের সোনালী রংঙের আভায়। বয়েছে শীতের আবহাওয়া। শীত তার বার্তা নিয়ে ধরা দিয়েছে কারন অগ্রহায়ণন এসেছে। রাতে কুয়াশা, সকালে শিশিরকণার ঝলকানি। ঋতুর এই সন্ধিক্ষনে প্রকৃতির স্বর্ণরাজ্যে যোগ হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ধান। উপকুলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের গ্রামাঞ্চলে শুরু হচ্ছে নবান্ন উৎসব। গ্রামীণ এই জনপদে বাঙালি জাতির বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে ‘নবান্ন’ ধান কাটার প্রধান উৎসব। অগ্রহায়ণে বাংলার প্রধান কৃষিজ ফল কাটার সময়। নবান্নে নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি করা হয় পিঠা, পায়েস, ক্ষীরসহ হরেক রকমের খাবার।

বাড়ির আঙিনা নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে। দেশের দক্ষিনাঞ্চল উপকুলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে নতুন ধানের আতপ চালের ক্ষীর রান্না করে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। উপজেলাগুলোতে জামাই-মেয়েকে নিমন্ত্রণ করে পিঠা-পায়েস খাওয়ানো হয়। নাইওর আনা হয় মেয়েকে। অন্যদিকে মাঠের পর মাঠে নতুন সোনা ধান। তবে দিন দিন জেরার বিভিন্ন গ্রাম থেকে মুছে যাচ্ছে গ্রামবাংলার শাশ্বত অনুষ্ঠান ‘নয়াখাওয়া’ বা নবান্ন। অগ্রহায়ণের প্রথম দিনে জেলার রামগতি উপজেলায় পালন করে থাকে কৃষাণ-কৃষাণির কৃষি সংস্কৃতি ‘নয়াখাওয়া’। আত্মীয়-স্বজন দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হয়। নতুন ধানের চালের গুঁড়ায় তৈরি পিঠে-পায়েস, শিরনি। দেশি ধানের জাত হারানো ও আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে নবান্ন উৎসব হারাতে বসেছে।

নবান্নের পিঠা পায়েস তৈরি করতে দেশি জাতের কালোজিরা ধান ছিলো উত্তম। গেল কয়েক বছর আগেও গ্রামে গ্রামে দেশি জাতের আমন কালোজিরা ধান কাটার পর নবান্ন উৎসব পালিত হতো। এই ধানের জায়গা উফশী জাতের ধান দখল করে নিয়েছে। ধান কাটার সময় তাই পরিবর্তন হয়েছে, উৎসবেও পড়েছে ভাটা। নবান্নের সঙ্গে এ অঞ্চল থেকে ইতোমধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় জাতের ধান। গ্রামগুলোতে আগের মতো এখন আর ধান কাটার পর নতুন ধানে পিঠাপুলি, গুড়ের ক্ষীর দিয়ে নবান্ন পালিত হয় না।

এ অঞ্চলের মানুষের মনে নতুন আমন ধান কাটার মানে ‘নবান্ন’ উৎসব। এখানে ধানের তিনটি প্রধান মৌসুম হলেও অগ্রহায়ণে নতুন আমন ধানকে বরণ করতে নবান্ন উৎসব পালন করা হয়। আমন ধান কাটার আগে কার্তিকের কোজাগরি লক্ষ্মী পুজো। তবে সব সম্প্রদায়ের উৎসব নবান্ন। এটি আগে জেলার জমিদাররা কৃষি অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অন্যতম বড় উৎসব হিসেবে পালন করতো। তাদের কাছে নবান্ন ছিলো এক ধরনের খাবারের নাম। নতুন চালের গুঁড়া, নারিকেলের রস, দুধ, ঘি, মধু দিয়ে তৈরি এই ধরনের খাবারের নামই ‘নবান্ন’। তবে জমিদাররা না থাকরেও দক্ষিণের উপকূলের এই জেলাতে এখনও কিছু কিছু গ্রামে এই খাবারে নবান্ন পালন প্রচলিত আছে।

নবান্নকে ঘিরে কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায়, ‘আবার আসিব ফিরে ধান সিড়িটির তীরে এই বাংলায়, হয়তো মানুষ নয় হয়তো শঙ্খচিল শালিখের বেশে, হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে। প্রকৃতি রূপ-রসে ভরে ওঠে চারপাশ, কুয়াশায় আচ্ছন্ন চারদিক আর কৃষকের গোলায় উঠছে পাকা ধান। তবে অঞ্চলভেদে সুনির্দিষ্ট ধানে নবান্ন তৈরি করে মানুষ।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
৫৪ বার পঠিত

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি #

কিশোর কুমার দত্ত, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি। মোবাইলঃ 01714-953963, ইমেইলঃ kkumar3700@gmail.com

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com