কাউখালীতে ছিন্নমুল শিশু ও প্রতিবন্ধীদের বন্ধু খসরু ভাই

৩৬ বার পঠিত

সৈয়দ বশির আহম্মেদ, কাউখালী প্রতিনিধি ॥ ওরা সবাই হতদরিদ্র পরিবারের বাক প্রতিবন্ধী সন্তান। পিরোজপুরের কাউখালীর সন্ধ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ের আমরাজুড়ীর চরে সবার বাস। সপ্তাহের বৃহস্পতি, শুক্র ও শনি চরে ১০ জন বাক প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোর মাধুর বিছিয়ে বসে। ওটাই ওদের পাঠশালা। ইশারায় ইংগিতে চলে ওদের অভিব্যক্তি বিনিময়। প্রায় ৫ বছর ধরে চলে অনানুষ্ঠানিক পাঠশালায় ওদের বর্ণমালা শিখাচ্ছেন কাউখালীর শহরের প্রবীণ বিদ্যোৎসাহী আঃ লতিফ খসরু। শহরের খেয়াঘাট থেকে নৌকায় চড়ে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরের নিভৃত চরের পাঠশালায় যান তিনি। প্রিয় শিক্ষার্থীদের জন্য নিজের টাকায় কেনা খাবার। দুপুর পেরিয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা আসে পাঠশালায়। এরপর সারা বিকেল চলে তাদের পাঠদান। ব্যতিক্রমী এই পাঠশালার উদ্যোক্তা আঃ লতিফ খসরু। ব্যতিক্রমী পাঠশালার উদ্যোক্তা আঃ লতিফ খসরু কাউখালী  মানুষের কাছে এখন বাক প্রতিবন্ধীর বন্ধু নামে পরিচিত। তিনি আশা করেন সীমিত পরিসরে নেওয়া তার এ উদ্যোগ এক সময় বড় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পাবে। লেখাপড়ার সুযোগ পাবে সারাদেশের বাক প্রতিবন্ধী শিশুরা।

যেভাবে শুরুঃ ঘুর্ণিঝড় সিডরের পর আমরাজুড়ী চরে গৃহহীন লোকদের পুনর্বাসনের জন্য আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন নৌ বাহিনীর সদস্যরা। সেখানে কয়েকটি প্রতিবন্ধী পরিবার স্থায়ীভাবে  বসবাস করে। ৭ সদস্য নিয়ে আশ্রয় পান মঞ্জিলা বেগম (৩৮), মঞ্জিলার স্বামী দিনমজুর আশ্রাফ আলী ও তার ৪ সন্তান বাক প্রতিবন্ধী। আঃ লতিফ খসরু এই তথ্য জানার পর ওদের নিয়েই শুরু করেন শিক্ষা কার্যক্রম। আর প্রতিবন্ধী শিশুদের পাশাপাশি এই শিক্ষাকার্যক্রমে যুক্ত হয় ছিন্নমুল শিশুরা।Khosru.01পাঠশালায় একদিনঃ আমরাজুড়ী চরে চটের বস্তা আর মাদুর বিছানো। আঃ লতিফ খসরু সেখানে বসে আছেন। বগল দাবা করে বই আর সিলেট নিয়ে ছুটে আসতে দেখা যায় কয়েকটি শিশু-কিশোরকে।  বর্ণমালা শিখতে ওরা সপ্তাহের তিনদিন পাঠশালায় আসে। আঃ লতিফের পাঠশালায় বর্ণমালা শিখছে মঞ্জিলার চার বাক প্রতিবন্ধী সন্তান শারমিন, রিফাত, রিয়াজ ও রিজাম। দিনমজুর আকুব্ব আলীর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী দুই মেয়ে আসমা ও তানজিলা। বাদশার মেয়ে আরিফা, আমেনার মেয়ে শান্তা, বাক প্রতিবন্ধী রফিক, কালু মিয়ার বুদ্ধিপ্রবন্ধী সন্তান জাহিদ, অনাথ কিশোর রফিক সহ অনেক ছিন্নমুল শিশুরা পাঠশালায় যাচ্ছে নিয়মিত। আঃ লতিফ খসরু এই সব শিশুদের শুধু পাঠদানই নয় বিনামূল্যে শিক্ষাউপকরণ, পরিধেয় বস্ত্র, খাদ্যও যুগিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষার্থীদের কি পড়াচ্ছেন জানতে চাইলে তার সহজ সরল জবাব, জীবনের প্রাথমিক পাঠ বাক প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা দেওয়ার প্রথাগত পদ্ধতী আমার জানা নেই। মানুষ হিসাবে গভীর এক দায়বোধ থেকে ওদের বর্ণমালা লেখা শেখাই। ওদের বিষন্ন জীবনে কিছুটা আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি ক্ষুদ্র উদ্যোগ নিয়েছি। আমার আশা কেউ হয়তো একদিন বড় উদ্যোগ নিবে। আমরাজুড়ী চরের মঞ্জিলা বেগম বলেন, খসরু ভাই একজন দরদী মানুষ, তিনি আমার চাইর বোবা পোলা, মাইয়্যারে লেখাপড়া শিখাইছে, হের কাছে লেখাপড়া শিককা আমার মেয়ে বাক প্রতিবন্ধী মেয়ে শারমিন দত্তের হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এইডা আমাগো কাছে ওনেক আনন্দের।Khosruএকজন সামাজিক উদ্যোক্তাঃ আঃ লতিফ খসরু শুধু বাক প্রতিবন্ধীদের জন্য পাঠশালার উদ্যোগই নেননি। কাউখালী সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে তার অংশগ্রহণ থাকে সবার আগে। তিনি কাউখালীর তথ্য সংরক্ষণের জন্য শহরের উত্তর বাজারে নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন তথ্য সংগ্রহ শালা। সেখাইনেই রয়েছে একটি পাঠাগার। স্থানীয় কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। ভাষার মাসে ভাষা আন্দোলন, বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্য তিনি উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে তথ্য পুস্তিকা বিতরণ করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলার গ্রাম গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হত দরিদ্র প্রতবিন্ধীদৈর মদ্যে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজ উদ্যোগে কাউখালী উপজেলার প্রতিবন্ধী স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। আর সেই স্কুরে তিনি নিজেই পাঠদান করান। পাঠকদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করার লক্ষে কাউখালী উজেলা সদরে আব্দুস সোবাহান স্মৃতি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা। আঃ লতিফ খসরু ৫২ এর ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, অনেক অজানা দুর্লভ তথ্য চিত্র ও সংগ্রহ শালা প্রতিষ্ঠা করা। আঃ লতিফ খসরু প্রতিবছর শিক্ষক দিব, মা দিবস, বাবা দিবস, নারী দিবস উপলক্ষে উপজেলার অনেক গুণী ব্যক্তিদের সম্বর্ধনার আয়োজন করেন। কৃতি ছাত্র-ছাত্রী, অভিভবাক ও শিক্ষকদের সম্বর্ধনার আয়োজন করে থাকেন।

১৯৭১    সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সব হারানো কাউখালী উপজেলার এক নারী মুক্তিযোদ্ধা উর্মিলা রায়কে তিনি সেবা সুশ্রুষা করছেন ও তার দেখাশুনা করেছিলেন। ভাষার মাসে তিনি ১৮ই ফেব্রুয়ারি প্রতিবছর শহিদ মিনারের পাদদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে ব্যতিক্রমী চিত্রাংকন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকেন এবং নিজের অর্থায়নের তাদেরকে পুরস্কৃত করেন। আঃ লতিফ খসরু প্রতিবছর ভাষার মাসে ভাষা আন্দোলন ও ভাষা সৈনিকদের নিয়ে চিত্র প্রদর্শনী ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মদের কাছে তুলে ধরার জন্য স্বাধীনতার মাসে এলেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চিত্র প্রদর্শনী আয়োজন করে থাকেন।Khosru.02আঃ লতিফ খসরু শিশুদের মধ্যে মানসিক বিকাশ এবং স্কুলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করার লক্ষে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গরীব শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার পৃষ্ঠপোষকতায় শীত বস্ত্র (কম্বল) বিতরণ করেন। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে বর্ষ বরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঈদ উদ্যাপন, ভালোবাস দিবসসহ শিশুদের মানসিক বিকাশ ও বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করার লক্ষে প্রতি বছর ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। তারাই ধারাবাহিকতায় ৯ ই জানুয়ারি ২০১৪ ইং তারিখ কাউখারী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন এবং তার পৃষ্ঠপোষকতায় বিদ্যালয়ের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের খাতা ও কলম দিয়ে বরণ করেছিলেন।

তিনি প্রথমবারের মতো ২০১৩ইং সালে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে বনভোজনের আয়োজন করেন। ২০০৭ সালের সিডরে কাউখালী উপজেলার নদী ভাঙন কবলিত এলাকায় নিজ উদ্যোগে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন। সিডরের ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে থেকে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ প্রতি শুক্রবার অত্র উপজেলার ১০ জন হতদরিদ্র ও দু:স্থ মানুসকে উন্নত মানের খাবার নিজ হাতে পরিবেশন করেন। পিল খানার ট্রাজেডির তথ্য চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন। লিবিয়ায় আটকে পরা বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে আনার জন্য মানব বন্ধন করেন। ভান্ডারিয়া উপজেলার রিক্সা চালক এস.এস.সি তে জি.পি.এ-৫ প্রাপ্ত জাকিরকে সহায়তা করেন।

কাউখালী উপজেলার কেউন্দিয়া গ্রামের রিক্সা চালকের ছেলে মেহেদি এইচ.এস.সিতে জি.পি.এ-৫ পাওয়ায় তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিকরা সহ বিভিন্ন উপায়ে সহযোগিতা করেন। এবং একই উপজেলার ১নং সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নের ধাবড়ী গ্রামের মৎস্যজীবি ইয়াকুবের মেয়ে ২০১৬ সালের এস.এস.সি পরীক্ষায় রঘুনাথপুর ই.জি.এস শিক্ষানিকেতন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে জি.পি.এ-০৫ প্রাপ্ত মঞ্জিলা ও এস.বি.সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী খায়রুন্নাহার ও আমরাজুড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জে.এস.সি তে জি.পি.এ-০৫ পাওয়া দিনমজুরের মেয়ে কারিমা ও কাউখালী উপজেলার সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চল শ্রেনি সমীপনী পরীক্ষায় এ+ পাওয়া আলামিন কে শিক্ষায় সহায়তা করেন। চট্রগ্রামের মিরসরাই ট্রাজেডিতে নিহতদের স্মরণে শোক বন্ধন করেন।  কাউখালী মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিসৌধ নির্মানের দাবিতে মানব বন্ধন করেন। এছাড়ও তিনি মরণোত্তর চক্ষু দানের ঘোষণা করেন। তিনি লতিফ খসরুর উদ্যোগ ২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কাউখালীতে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বরে প্রথম বারের মতো বই মেলার আয়োজন করেন।

এলাকার সন্ত্রাস দমন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, বাল্য বিবাহ, নিরক্ষরতা দূরীকরণসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে রয়েছে তার অক্লান্ত প্ররিশ্রম।
অর্জন ঃ আঃ লতিফ খসরু পিরোজপুর জেলাধীন কাউখালী মহাবিদ্যালয়ের ২০০১ সালে অনুষ্ঠত গভর্নিং বডির নির্বাচনে সর্বাধিক ভোট পেয়ে নির্বাচত হন। ২০০৪ সালে একই কলেজে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে একই কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচনে পুনরায় শ্রেষ্ঠ্য বিদ্যোৎসাহী সমাজসেবক নির্বাচিত হন। তিনি পুনরায় ২০১১ সালে পিরোজপুর জেলার শ্রেষ্ঠ্য বিদ্যোৎসাহী সমাজসেবক নির্বাচিত হন।

তিনি বরিশাল বিভাগে বিভাগীয় শিক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসন কর্তৃক বরিশাল বিভাগে শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী সমাজসেবক নির্বাচিত হন। তিনি বিভাগীয় পর্যায় জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০১৩ লাভ করেন। খসরু বি.এস.বি ফাউন্ডেশন ক্যামব্রিয়ান স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ শিক্ষা উদ্যোক্ত এ্যাওয়ার্ড ২০১১ এ ভূষিত হন। ২০০৯ সালের ১২ জুন শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য আঃ লতিফ কসরু কে বলেশ্বর পদকে ভূষিত করা হয়। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ঢাকা এটিএন বাংলা স্টুডিওতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার হাতে পদক তুলে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক। এর আগে পিরোজপুর জেলায় পর পর ২ বার বিদ্যোৎসাহী সমাজসেবক নির্বাচিত হওয়ায় কাউখালী উপজেলার উত্তরায়ন খেলাঘর আসর কর্তৃক আঃ লতিফ খসরুকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

উপজেলা পরিষদের ভাইস মোঃ কামরুজ্জামান মিঠু বলেন, খসরু একজন সামাজিক উদ্যোক্তা, তিনি সংস্কৃতিসেবী সমাজসেবক হিসেবে এলাকায় পরিচিত। এই বয়সেও তিনি সমাজ উন্নয়নে যেসব উদ্যোগ নিচ্ছেন তা আমাদের সবার জন্য অনুকরণীয়। বাক প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার আলো দেয়ার জন্য খসরু ভাইয়ের নেয়া উদ্যোগে আমরা অভিভূত। সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্থ এই মানুষটির কর্মকান্ড থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। নতুন প্রজন্মের জন্য তিনি পথ প্রদর্শক। কাউখালী সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সুব্রত রায় বলেন,  তার এই সামাজিক উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই, সকলের একটু সহযোগিতা পেলে নতুন প্রজন্ম এইসব কাজ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে বলে আমি মনে করি।
 

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com