আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারা রাজ্যে মৌ মৌ গন্ধ, প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও হিমাগার

এই সংবাদ ৩৭ বার পঠিত

মামুনুর রশীদ নোমানী, আটঘর কুরিয়ানা পেয়ারার নৌকা থেকে # পিরোজপুরের স্বরুপকাঠি ও বরিশালের বানারীপাড়ার ৩৬ টি গ্রাম জুড়ে দক্ষিনাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পেয়ারা বাগান অবস্থিত। তাই দক্ষিণাঞ্চলের হাট-বাজার আর বাগান এলাকা জুড়ে পাকা পেয়ারার মৌ-মৌ গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পরেছে। পাইকার এবং পেয়ারা চাষিদের বেচা কেনার ধূম চলছে পেয়ারার মোকাম (হাট-বাজার) গুলোতে। এ পেয়ারা বাগানে প্রায় ৩১ হাজার একর জমির উপর এ পেয়ারার রাজ্য। বাংলার আপেল খ্যাত পেয়ারার ভর মৌসুম শুরু হয়েছে।এশিয়ার বিখ্যাত এ পেয়ারাকে স্থানীয় ভাষায় গৈয়া কিংবা সবরী বলা হয়। তবে জাতীয় ভাবে এটি পেয়ারা নামে পরিচিত। আর পুষ্টিমানের দিক থেকে একটি পেয়ারা ৪ টি আপেলের সমতুল্য বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছে। তাই পেয়ারাকে ভালবেসে ‘বাংলার আপেল’ আবার কেউ ‘গরিবের আপেল’ হিসাবে গণ্য করে।এখানে প্রতিবছর পেয়ারার মৌসুমে বিপুল পরিমানে সুস্বাদু পেয়ারা ফল উৎপাদন হয়ে থাকে। বাংলার আপেল নামে খ্যাত এ পেয়ারা এখানে প্রচুর উৎপাদন হলেও সংরক্ষণের অভাবে চাষীদের লোকসানের মুখে পড়তে হয় প্রতিবছরই। কারন পেয়ারা দ্রুত পেকে যায়। তাই দ্রুত বিক্রি না করতে পারলে চাষিদেও পড়তে হয় লোকসানের মুখে।এ বছর পেয়ারায় দেখা দিয়েছে এনথ্রাকনোস নামক এক ধরনের ভাইরাস। যা স্থানীয়ভাবে ছিটপড়া রোগ বলে সনাক্ত করা হয়। এছাড়া বর্ষায়ও পেয়ারা সংগ্রহ ও বিক্রিতে সমস্যা দেখা দেওয়ায় উৎপাদিত পেয়ারা বাগানেই নষ্ট হতে শুরু করেছে। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ থাকলে মৌসুমী এ ফল পেয়ারা বছর জুড়ে ভোক্তাদের চাহিদা মিটিয়ে চাষীরাও আর্থিকভাবে লাভবান হতো। কিন্তু দীর্ঘদিনেও উদ্যোক্তার অভাবে হিমাগারসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে না উঠায় এবংউৎপাদন খরচ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষীরা পেয়ারা চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছে। আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্রের অর্ধেক এই আড়াই মাস জমে উঠে পেয়ারা বেচা-কেনা।পেয়ারা চাষ ও ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে ২০ টিরও বেশি ছোট বড় ব্যবসা কেন্দ্র। স্থানীয়ভাবে বলা হয় পেয়ারার মোকাম। এ মোকাম গুলোর মধ্যে উল্লে¬খ যোগ্য হচ্ছে আটঘর, কুড়িয়ানা, ভিমরুলী, ডুমুরিয়া, শতদশকাঠি, বাউকাঠি। প্রতিদিন সকালে এসব মোকামে চাষিরা ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় সরাসরি বাগান থেকে পেয়ারা নিয়ে আসে পাইকারদের কাছে। তা কিনে ট্রলার যোগে নৌ পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ বছর ফাল্গুনে পেয়ারা গাছে ফুল ধরার পর অতিরিক্ত খড়ায় পানির অভাব দেখা দেয়ায় ফুল ঝড়ার পাশাপাশি অনেক গাছও মারা যায়। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে পেয়ারা চাষিরা গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত সার এবং মাটি দিতে পারেনি। কিন্তু তার পরেও এবার পেয়ারার ভাল ফলন হয়েছে। কেটে গেছে চাষিদের দু:শ্চিন্তা।ঝালকাঠির কাঁচাবালিয়া গ্রামের পেয়ারা চাষি জাহিদ মিয়া জানান, আমাদের ভাগ্য ভালো খড়ার কারণে ফলন ভালো না হওয়ার ভয় ছিলো। উপরওয়ালা সহায় থাকায় পেয়ারার ফলন এবার ভালই হয়েছে। এইবার মৌসুমের শুরুতেই ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে প্রতি মন পেয়ারা ৮শ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পেয়ারার দাম কমে গেছে। প্রতি মণ ২ শ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। প্রতিবছর পেয়ারার মৌসূমে বিভিন্ন স্থান থেকে নৌ পথে পেয়ারা বাগানে আসে পর্যটকরা। পেয়ারা বাগানে এসে দেখে মুগ্ধ হয়ে এখান থেকে পেয়ারা কিনেও নিচ্ছেন পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য।

বছরের পর বছর ধরে পেয়ারা উৎপাদিত এসব এলাকার চাষিদের একমাত্র সমস্যা হিমাগার ও সড়ক পথে যোগাযোগের যথোপযোগী ব্যবস্থা না থাকা।এ ব্যাপারে ঝালকাঠির জগদীশপুর গ্রামের পেয়ারা চাষি বিমল মিস্ত্রি জানান, প্রতি বছর হিমাগারের অভাবে এসব এলাকার কয়েক কোটি টাকার পেয়ারা নষ্ট হয়ে যায়। কারণ পেয়ারা পচনশীল ফল। তাই দ্রুত পেকে যাওয়ায় তা সংরক্ষণ করে রাখার কোন ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরিশালের উৎপাদিত পেয়ারা সড়ক পথে নেয়ার কোন সঠিক ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত গড়ে উঠেনি। পেয়ারা চাষিরা জানিয়েছে, এ অঞ্চলের সাথে সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে পেয়ারা দ্রুত বাজারজাত করা যেত। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা হলে পেয়ারা চাষিদের বাগান থেকে সরাসরি ট্রাক যোগে প্রতি বছর মৌসুমের শুরুতেই ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেয়ারা পৌঁছে দেয়া এবং পচন রোধ করা সম্ভব হত।আড়তদার লিটন হালদার বলেন, ভিমরুলী দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পেয়ারার মোকাম। মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মন পেয়ারা বিক্রি হয়। তবে বাউকাঠি থেকে ভিমরুলী হয়ে কীর্তিপাশা পর্যন্ত সড়ক পথ হলে দ্রুত প্রতি দিনের পেয়ারা প্রতিদিন বিভিন্ন জেলায় পৌঁছানো সম্ভব হতো। ভিমরুলী মোকাম থেকে নৌ পথে খুলনা, ফেনী, ঢাকা, সিলেট, পটুয়াখালি, ভোলা, মাদারিপুর, নাটোর, বরিশাল হাজার হাজার মন পেয়ারা যাচ্ছে।কিন্তু সড়ক পথের যোগাযোগ থাকলে তাৎক্ষনিকভাবে এসব জেলায় পেয়ারা নেয়ার জন্য পাইকাররা চাষিদের আরো বেশি দাম দিয়ে পেয়ারা কিনত। পেয়ারা বাগান ঘুরে জানা গেছে, পিরোজপুরের স্বরুপকাঠি উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, আদমকাঠী, ধলহার, কঠুরাকাঠি, আন্দাকুল, জিন্দাকাঠি, ব্রাহ্মণকাঠি, আতা, জামুয়া, মাদ্রা, ঝালকাঠি, শশীদ, পূর্ব জলাবাড়ী,আদাবাড়ি ও জৌসার গ্রাম এবং ঝালকাঠি ও বরিশালের বানারীপাড়ার মোট ৩৬টি গ্রামের কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষাবাদ হয়।

কয়েক হাজার পেয়ারা বাগানে হাজার হাজার চাষী এ পেয়ারা চাষাবাদ করে আসছে। আর পেয়ারার চাষাবাদ ও বিপণন ব্যবস্থার সাথে ওই সমস্ত এলাকার প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার শ্রমজীবী মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থেকে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। ব্রাক্ষ্মণকাঠি গ্রামের চাষী সুভাষ মজুমদার জানান, এ বছর পেয়ারায় ছিট পড়া রোগ পুনরায় দেখা দিয়েছে। ফলে পেয়ারা বড় হওয়ার আগেই ঝরে পড়ছে। পেয়ারা বাগান পরিচর্যাসহ শ্রম মজুরি বেশি হওয়ায় চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তবু পূর্ব পুরুষদের এ পেশাকে আগলে রেখেছে চাষীরা।কুড়িয়ানার পেয়ারা চাষী বিশ্বজিত্ চৌধুরী জানান, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে বড় সাইজের পেয়ারা প্রসেসিং করে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।কুড়িয়ানার পেয়ারা হাটে বিভিন্ন গ্রামের পেয়ারা চাষীরা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর পেয়ারার ফলন কম কিন্তু উত্পাদন ব্যয় বেশি আবার দামও কম। অনাবৃষ্টির কারণে উৎ্পাদিত পেয়ারাগুলো আকারে কিছুটা ছোট এবং ফলও এসেছে বিলম্বে। হেক্টর প্রতি ৫ থেকে ৬ মে.টন উৎপাদিত পেয়ারা থেকে বছরে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা আয় হয়। অপর পক্ষে স্থানীয় পর্যায়ে অপর এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরাও প্রতিদিন শত শত মণ পেয়ারা এখান থেকে লঞ্চ, ট্রলার ও ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান দেয়। স্বরূপকাঠির উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, সংরক্ষণসহ কৃষি ভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে চাষীরা আর্থিকভাবে লাভবান হতো। যুগ যুগ ধরে পেয়ারা চাষাবাদ করে আসলেও উদ্যোক্তার অভাবে হিমাগারসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে না ওঠায় দিন দিন চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছে পেয়ারা চাষীরা।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com