বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান

এই সংবাদ ৯৯ বার পঠিত

আদিত্ব্য কামাল: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবেগময় গান ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান/আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান’; কিংবা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সেই ধ্রুপদী পঙিক্ত ‘গভীর গর্জন করে সদা জলধর/উথলিল নদ-নদী ধরনীর উপর’—মনে করিয়ে দিল আবারও সবুজ সমারোহে হাজির হয়েছে বর্ষাকাল। আজ বুধবার আষাঢ়ের প্রথম দিন। বর্ষার এ সময়ে পুষ্প-বৃক্ষে, পত্র-পল্লবে, নতুন প্রাণের সঞ্চার করে সব কিছুর মধ্যে। কদম ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ গ্রাম কিংবা নগরবাসী সবাইকে মুগ্ধ করে এ সময়ে।

ষড়ঋতুর এই দেশে আষাঢ়কে বলা হয় ঋতুর রানী। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘ঐ আসে ঐ ঘন গৌরবে নব যৌবন বরষা, শ্যাম গম্ভীর সরসা…’। রবীন্দ্রনাথ ও মধুসূদনের মতো বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যে মোহিত অনেক কবিই বাংলা সাহিত্য ঋদ্ধ করেছেন। বর্ষা ঋতু তার বৈশিষ্ট্যের কারণেই স্বতন্ত্র। বর্ষা কাব্যময়, প্রেমময়। বর্ষার প্রবল বর্ষণে নির্জনে ভালোবাসার সাধ জাগে, চিত্তচাঞ্চল্য বেড়ে যায়। শত ঘটনার ভিড়েও কোথায় যেন মেলে এক চিলতে বিশুদ্ধ সুখ।

বর্ষার আগমনী বার্তা পাওয়া গেল আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসেও। সংস্থাটি বলছে, আজ বুধবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত হলেও মূলত বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশেই শুরু হবে আষাঢ়ের বৃষ্টিপাত। সে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে শুক্র ও শনিবার পর্যন্ত। জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকৃতির নিয়মে আবার বর্ষার আবহ তৈরি হয়েছে। তবে সারা দেশেই বর্ষাকালের বৃষ্টিপাত শুরু হবে বৃহস্পতিবার থেকে। অবশ্য গতকাল মঙ্গলবারও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

তাতে দেখা গেছে, টেকনাফে ১৪ মিলিমিটার, ফেনীতে দুই মিলিমিটার ও ঢাকাতে তিন মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আষাঢ়েই শোনা যায় রিমঝিম বৃষ্টির ছন্দ। নবধারা জলে ভিজে শীতল হওয়ার আহ্বান এখন প্রকৃতিতে। সব রুক্ষতাকে বিদায় জানিয়ে নরম কোমল হয়ে উঠবে বাংলার মাটি। নতুন প্রাণের আনন্দে অঙ্কুরিত হবে গাছপালা, ফসলের মাঠ। মাঠে মাঠে কৃষকের মুখে ফুটে উঠবে হাসি।

বৃষ্টি হচ্ছে কদিন ধরেই। গ্রীষ্মের ধুলোমলিন জীর্ণতাকে ধুয়ে ফেলে গাঢ় সবুজের সমারোহে প্রকৃতি সেজেছে পূর্ণতায়। নদীতে উপচে পড়া জল, আকাশেও ঘন মেঘের ঘনঘটা। কেউ কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই। গ্রীষ্মের দাবদাহে মানুষ যখন পুড়ছে তখন ব্যাপক আয়োজনে বর্ষার এই ঝুম ঝুম বৃষ্টির বরণডালা মাঝে মাঝেই মনে করিয়ে দিচ্ছে বর্ষা তো এসেই গেছে। বর্ষার সতেজ বাতাসে জুঁই, কামিনী, বেলি, রজনীগন্ধা, দোলনচাঁপা আরো কত ফুলের সুবাস। লেবু পাতার বনেও যেন অন্য আয়োজন। উপচে পড়া পদ্মপুকুর রঙিন হয়ে ফোটে বর্ষাকে পাওয়ার জন্য। কেয়ার বনেও কেতকীর মাতামাতি। রবিঠাকুরের ভাষায়, ‘আবার এসেছে আষাঢ় আকাশও ছেয়ে…আসে বৃষ্টিরও সুবাসও বাতাসও বেয়ে…।’

প্রতিবছরের মতো এবারও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং গানের দল আয়োজন করছে বর্ষাবরণের। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও থাকবে বর্ষা নিয়ে নানা আয়োজন। দেশের নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে বর্ষাকে নিয়ে নানা ‘মিথ’ বা গল্পগাথা। কক্সবাজারের রাখাইন সম্প্রদায় বর্ষাকে বরণ করে ভিন্ন মাত্রায়। প্রতিবছর তারা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে মাসব্যাপী বর্ষাবরণ উৎসবের আয়োজন করে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা এ বর্ষাবরণ উৎসবে যোগ দেয়।

তবে বর্ষা যেমন আনন্দের, বর্ষার নির্মম নৃত্য তেমনি হঠাৎ বিষাদে ভরিয়ে তোলে জনপদ। তবুও বর্ষা বাঙালি জীবনে নতুনের আবাহন। সবুজের সমারোহে, মাটিতে নতুন পলির আস্তরণে আনে জীবনেরই বারতা। সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা বাংলা মায়ের নবজন্ম এই বর্ষাতেই। সারা বছরের খাদ্যশস্য-বীজের উন্মেষ তো ঘটবে বর্ষার ফেলে যাওয়া অফুরন্ত সম্ভাবনার পলিমাটি থেকে।

বর্ষা তার ঝরঝর নির্ঝরণীতে আমাদের মনকে সিক্ত করে তোলে। মানুষের মনের কথাই শুধু বলি কেন, বর্ষা প্রাণরসে জাগিয়ে তোলে আমাদের প্রকৃতিকে। গ্রীষ্মের দাবদাহে মানুষের মন যখন অস্থির হয়ে ওঠে, মানুষ ব্যাকুল বর্ষা বন্দনায় মত্ত হয়। যেন ‘কখন আসবে বর্ষা কখন জুড়াবে প্রাণ’ কাব্যিক ব্যঞ্জনার মতো।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আদিত্ব্য কামাল, ব্রাক্ষণবাড়ীয়া প্রতিনিধি #

Adithay Kamal House#412, Alhampara, Bhadughar 3400 Brahmanbaria, Bangladesh Mobile : 01713-209385

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com