আজ শুক্রবার, ৭ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ২৯শে জিলহজ্জ, ১৪৩৮ হিজরী, শরৎকাল, সময়ঃ রাত ১:২৩ মিনিট | Bangla Font Converter | লাইভ ক্রিকেট

‘বাহুবলী’ বোধে কী দিয়ে গেল?

বছর তিনেক আগের কথা। সালমান খানের বজরঙ্গি ভাইজান বক্স অফিস মাতাচ্ছে তখন। এরই মধ্যে দক্ষিণী একটি ছবি জানিয়ে দিল, তারাও কম যায় না। কী আশ্চর্য, দুটো ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন একজনই—কে ভি বিজয়েন্দ্র প্রসাদ! তাঁর ছেলে এস এস রাজামৌলি বানিয়েছেন অন্য ছবিটি। বাহুবলী: দ্য বিগিনিং ৬৫০ কোটি রুপি আয় করে জানিয়ে দিল, এ তো কেবল শুরু!

শেষটা যে কেমন হতে পারে, বুঝেছিল কি বাহুবলী ২: দ্য কনক্লুশন দলও? প্রথম দিনেই ১২১ কোটি রুপি আয় করবে এই ছবি, কে ভেবেছিল? সিনেমা হলের বাইরে দর্শক সামলাতে এমনকি পুলিশও লাগাতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসব সিনেমা হলে প্রায় লালবাতি জ্বলে গিয়েছিল, সেসব হলেরও এখন রমরমা অবস্থা। ইতিমধ্যে এ ছবির আয় দঁাড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি রুপি!

একটি আঞ্চলিক ছবির এত ব্যবসা বলিউডে তো রেকর্ড বটেই, এমনকি হলিউডেও। যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র এক সপ্তাহ চলেছিল ছবিটি। সেই এক সপ্তাহের মধ্যে এটি বক্স অফিসে পেছনে ফেলে দেয় ড্রিমওয়ার্কস অ্যানিমেশনের দ্য বস বেবি এবং টম হ্যাংকস-এমা ওয়াটসন অভিনীত দ্য সার্কেল-এর মতো ছবিকে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানাচ্ছে, ওই সপ্তাহে বক্স অফিসে প্রথম হওয়া দ্য ফেট অব দ্য ফিউরিয়াস ৪ হাজার ৭৭টি পর্দা নিয়ে গড়ে প্রতি পর্দায় আয় করে ৪ হাজার ৮৯০ ডলার। আর বাহুবলী ২ মাত্র ৪২৫ পর্দা নিয়েই গড়ে আয় করে ২৪ হাজার ৩৬৪ ডলার!

তাই বক্স অফিসে এ ছবির এমনতর ব্যবসার কারণটা বুঝে দেখা দরকার। একটি ওয়ার-এপিক ছবি এত অস্বাভাবিক ব্যবসা কেন করল? মানছি, ২ ঘণ্টা ৪৭ মিনিটে বাণিজ্যিক ছবির সব মালমসলা ছিল—রোমাঞ্চ, ট্র্যাজেডি, সহিংসতা, প্রেম, সংগীত। কিন্তু সে তো বলিউডের আর দশটা বাণিজ্যিক ছবিতেও থাকে।

এ ছবির সবকিছুই যেন মহাকাব্যিক। বাহুবলী যেন মহাভারতেরই ছায়া! মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্রের সঙ্গে এ ছবির অনেকগুলো চরিত্রের অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। বাহুবলীর অনুগত ‘কাটাপ্পা’ যেন মহাভারতের পিতামহ ভীষ্ম, কর্তৃত্বপরায়ণ ‘শিবগামি দেবী’ যেন রানি সত্যবতী, ক্ষমতার লোভে উন্মত্ত ‘বল্লালদেব’ যেন দুর্যোধন। আর ন্যায়নিষ্ঠ ‘বাহুবলী’ যেন সাক্ষাৎ পঞ্চপাণ্ডব। তাই বুঝি এত ব্যবসা?

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ভারতের প্রায় প্রতিটি চ্যানেলে এখন জনপ্রিয় হচ্ছে দুই ধরনের ধারাবাহিক। এক. ধর্মীয় মহাকাব্য ও পৌরাণিক কথা, দুই. ঐতিহাসিক পটভূমিতে তৈরি কাহিনি। বলিউডেও তো ইতিহাসনির্ভর ছবির জয়জয়কার চলছে। বাহুবলীর সাফল্যের মধ্যেই খবর এল ১০০০ কোটি বাজেট নিয়ে তৈরি হবে মহাভারত। রাজামৌলি নিজেও বড় পর্দার জন্য মহাভারত বানাতে চান।

আবার ভারতের সামাজিক প্রেক্ষাপটও মাথায় রাখা দরকার। পৌরাণিক কাহিনির প্রতি মানুষের স্বাভাবিক একটা আগ্রহ তো আছেই, কিন্তু এর সঙ্গে কি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিরও কোনো যোগ নেই? সমগ্র ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যে জয়জয়কার চলছে, তাতে মানুষের মাথায়-মনে কী চলছে, সেটাও তো বোঝা দরকার।কোনটা মিথ, কোনটা ইতিহাস, কোনটা বিনোদন, কোনটা রাজনীতি—সব মিলেমিশে যাচ্ছে না তো?

বাহুবলী ২ দেখিয়ে দিয়েছে এ ছবির পাইরেটেড কপি দেখে সুখ নেই, আবার টেলিভিশনে বা ইউটিউবে এর ক্যানভাস আঁটে না। ছবি দেখতে হলে প্রেক্ষাগৃহে যেতেই হবে। সেদিক থেকে এটা খুশির খবর। কিন্তু এসব দামামার ভিড়ে দুশ্চিন্তার নতুন বিষয়, তাহলে কি ভারতীয় ছবির ধরনই হতে যাচ্ছে এই? রূপকথার ছবিতে বক্স অফিসের লক্ষ্মী তো সন্তুষ্ট, কিন্তু ভারতীয় ছবির সরস্বতীর কী হবে? বলিউডে সম্প্রতি যে নানা ধরনের ছবি করার চল শুরু হয়েছিল, তার কী হবে? পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা জানাচ্ছে, ‘ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স’ ২০১৭ সালের এক রিপোর্টে বলেছে, ভারতীয় ছবির মোট বাণিজ্য গত কয়েক বছর ধরেই নিম্নমুখী৷ একদিকে সিঙ্গেল স্ক্রিন কমছে, অন্যদিকে মাল্টিপ্লেক্সে হু হু করে বাড়ছে

টিকিটের দাম। অনেক বাজেট, বড় হাঁকডাক, মহাতারকা, বিশাল ক্যানভাস—এই রসায়ন ছাড়া ছবি আর সফল করা যাচ্ছে না। ভাবার কোনো কারণ নেই, দুশ্চিন্তা শুধু বলিউড বা ভারতীয় ছবির। এত দিন মুম্বাই বা কলকাতার ছবি ঢাকাই ছবির বড় প্রতিপক্ষ ছিল, এখন তাতে যোগ হয়েছে দক্ষিণী ছবিও। তামিল, তেলেগু ভাষার বাণিজ্যিক ছবির অনেক দর্শক এখন আমাদের দেশে। সঙ্গে আছে কোরীয় ছবি, তুর্কি ধারবাহিক। বিশ্বায়নের যুগে টেলিভিশনের ভেতর দিয়ে আমাদের ঘরে তৈরি হচ্ছে একেকটা উপনিবেশ। তাকে ঠেকানোর কোনো প্রস্তুতি কি আছে আমাদের?

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
উপরে