মফস্বল সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপট ।। আবুল বাশার শেখ

১৯২ বার পঠিত

একজন সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে ততটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি তারপরও যেহেতু লেখালেখি করি সেহেতু সংবাদকর্মী হিসেবে দায়বদ্ধতা মনে করে ‘মফস্বল সাংবাদিকতা বর্তমান প্রেক্ষাপট’ নিয়ে দু’কলম লেখার দুঃসাহস করলাম। ইংরেজী ‘জার্নাল’ এবং ‘ইজম’ থেকে জার্নালিজম বা সাংবাদিকতার উৎপত্তি। ‘জার্নাল’ শব্দের অর্থ কোন কিছু প্রকাশ করা এবং ‘ইজম’ শব্দের অর্থ অনুশীলন বা চর্চা করা। সে হিসেবে কোন কিছু জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য যে চর্চা বা অনুশীলন তাকে সাংবাদিকতা বলা হয়। সাধারণ অর্থে বলতে গেলে যিনি সংবাদপত্রের জন্য সংবাদ সংগ্রহ করেন ও লিখেন তিনিই সাংবাদিক। তবে তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বিশালতায় সীমিত গন্ডির মধ্যে সাংবাদিকাকে আটকে রাখা যায় না। মার্কিন সাংবাদিক আর ডি ব্লুমেনফ্রেল্ডের মতে, ‘যিনি সংবাদ সংগ্রহ করে তা প্রকাশ উপযোগী করেন এবং সংবাদ সংক্রান্ত কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনিই সাংবাদিক।’

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। এটাকে কেউ কেউ আবার নেশা হিসেবে মানতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর ও ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপান্তরের যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে তাতে প্রিন্ট ও ইলেট্রনিক্স মিডিয়ায় মফস্বল সাংবাদিকতার অবদানও কম নয়। এ বিষয়টি স্পষ্ট হবে যদি একটু মনোসংযোগ করি। প্রতিনিয়ত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি তাঁর কর্ম এলাকার অবহেলিত, অনুন্নত, উন্নয়ন বঞ্চিত জনপদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। খুন, ধর্ষণ, বাল্য বিবাহ, ইভটিজিং, অশিক্ষা, অপচিকিৎসা, যৌতুক, গ্রামের সরল মানুষদের নানাভাবে প্রতারিত হওয়া, জবর দখল, সন্ত্রাস, দলাদলি, অগ্নিকান্ড, পাহাড়ধস, বিদ্যুতের লোডশেডিং ইত্যাদির শিকার হওয়া মানুষগুলোর পক্ষে কথা বলেন।

দূর্ঘটনা, উন্নয়ন, অনিয়ম, খেলাধুলা, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন প্রকার সংবাদ পরিবেশন করে থাকেন। পত্রিকার হেড অফিসগুলোতে বিভাগ ভিত্তিক আলাদা আলাদা রিপোর্টার থাকলেও মফস্বল সাংবাদিকদের মধ্যে কোন বিভাগ ভাগ করা নেই তাই তাদের প্রতিটি বিষয়েই সংবাদ ও প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। এতে করে তার দক্ষতাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। মফস্বল সাংবাদিকগণ চর্তুরমুখি যে শ্রম দেন তার বিনিময়ে তারা তেমন কিছুই পাননা। যারা সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে বেতন ভাতা পান তাদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি ও যাদের বেতনভূক্ত করা হয়নি তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম এইচ এস সি হওয়া উচিত। কেননা সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় তাহলে অপসাংবাদিকতা রোধ হবে।

তবে এটাও ঠিক যে সঠিক প্রশিক্ষণ, পেশাদারিত্বের অভাব, অধিক টাকার লোভ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সাংবাদিকদের মাঝে বিভক্তি বাড়ছে। অপরদিকে অনেক সময় সাংবাদিকদের কাউকে কাউকে সাংঘাতিক, হলুদ সাংবাদিক, চাঁদাবাজ সাংবাদিক, সিন্ডিকেট সাংবাদিক, বিজ্ঞাপন সাংবাদিক, রাজনৈতিক সাংবাদিক, গলাবাজ সাংবাদিক, এমনি এমনি সাংবাদিক, ক্রেডিট পরিবর্তন সাংবাদিক, দালাল সাংবাদিক ইত্যাদি অসুন্দর অভিধায় ভূষিত করা হয়। এর অবসান হওয়া জরুরী। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা ও মিডিয়াগুলোর কর্তৃপক্ষের স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা পরিত্যাগ করে কর্মদক্ষতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে মনে করি। পাশি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারী বাড়াতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে সাংবাদিকতার আড়ালে তথ্য বানিজ্যের বদলে তা তথ্য সেবায় যেন নিবেদিত হয়। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়কে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে তা হলো মফস্বল সাংবাদিকদের সাংবাদিকতার বূনিয়াদী প্রশিক্ষনসহ বেশি বেশি প্রশিক্ষনের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা করা।

মফস্বল সাংবাদিকদের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করতে হলে এ পেশার প্রতি হতে হবে নিবেদিতপ্রাণ, কঠোর পরিশ্রমী, সময়ানুবর্তী, সাহসী, কৌতুহলী, বুদ্ধিদীপ্ত, ক্ষিপ্র, প্রখর স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন, দল নিরপেক্ষ, সৎ, ধৈয্যশীল, ভদ্র, সৌজন্যবোধ সম্পন্ন, কুটবুদ্ধিসম্পন্ন, রস ও সাহিত্যবোধ সম্পন্ন। তাছাড়া, বিভিন্ন ধরনের বই পড়া ও লেখার অভ্যাস সাংবাদিকদের জন্য অতিরিক্ত গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাংবাদিকতাকে পেশা কিংবা নেশা হিসেবে নেওয়া সাংবাদিক বা সংবাদকর্মীরা এসব গুণাবলী চর্চার মাধ্যমে সফল সাংবাদিক হওয়ার পথে এগিয়ে যান। এছাড়া, পেশাদারিত্ব অর্জনের জন্য দেশ-বিদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে খোঁজখবর রাখাটা জরুরী। দেশ-বিদেশের সংবাদপত্র পড়া, টিভির নিউজ দেখা, ইন্টারনেটে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো ব্রাউজ করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিচরণ করা ভালো সাংবাদিক হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অপসাংবাদিক গোত্রের সদস্য নেহায়েতই কম-বিশ্বাস করতে ভাল লাগে। আমরা চাই, ভাল সাংবাদিকদের সাহচর্যে হলুদ সাংবাদিকবৃন্দের অবসান হোক। ‘একটি ভাল সংবাদপত্র নিজেই দেশের কন্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে’ সাংবাদিক আর্থার মিলারের এ কথা আমরা বিশ্বাস করতে চাই। আমরা চাই, সাংবাদিকদের লেখনি সমাজের আয়নায় পরিনত হোক, যা দেখে মানুষ সচেতন হবেন। তাঁদের লেখা পড়ে মানুষ ভাল কিছু শিখবেন, উৎসাহিত হবেন, ভাল কাজ করতে অনুপ্রেরণা পাবেন। পাশাপাশি অপরাধমূলক সংবাদ পড়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন যাতে সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়। আমরা চাই, এলাকার অন্যায়, অত্যাচার, বঞ্চনা, শোষণের বিপক্ষে সাংবাদিকের কলম ও ক্যামেরা যথাযথ কাজ করুক ও ভাল কাজের প্রশংসার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠুক, মফস্বল সাংবাদিকতার দ্বারা সমাজ উপকৃত হোক।

গ্রাম বাংলার কল্যাণে মফস্বল সাংবাদিকদের ভুমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশ গ্রাম প্রধান দেশ। তাই গ্রামীণ তথা মফস্বল সাংবাদিকদের উপেক্ষা করে কোন সংবাদপত্রই সফল অবস্থানে পৌছতে পারবেনা। আগে ঢাকার বাইরের খবর মফস্বল কবর হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু এখন সে যুক্তি অচল। সব খবরই খবর। এখন পত্রিকাগুলো ঢাকার বাইরের খবরও হেড লাইন করে থাকে। কিন্তু যে সকল মফস্বল সাংবাদিকগণ দেশের ৮৫ ভাগ মানুষের লঞ্চনা, বঞ্চনা ও অভাব অভিযোগের খবর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে পত্রিকায় পাঠিয়ে থাকে তাদের খোঁজ খবর পত্রিকার মালিক/সম্পাদক একটু কমই রাখেন! আবার এমন কিছু সংবাদ আছে যা সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের পরোক্ষ হুমকি, প্রভাবশালীদের চোখ রাঙানি, এমনকি প্রাণ নাশের হুমকিও আসে।

তার পরও থেমে নেই মফস্বল সাংবাদিকদের পথ চলা। এতো সব সত্ত্বেও মফস্বলে কোন সাংবাদিক হাল ছেড়েছেন এমন নজির নেই। তবে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে লাঞ্চিত বা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। আমার সাংবাদিকতা জীবনে দেখেছি অনেক সাংবাদিক লাঞ্চিত/আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এখন সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের মানোন্নয়ন হয়েছে নিঃসন্দেহে। আগে মফস্বল সাংবাদিকদের সংবাদ পাঠাতে ৩০/৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো ফ্যাক্স করার জন্য। আর এখন হাতের মুঠোয় সব যোগাযোগ! তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে সাংবাদিকতা অনেক সহজ হয়েছে। কদর বেড়েছে সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের।

বর্তমানে সাংবাদিকতার ধরন পাল্টেছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যানে। এখন আর প্রিন্ট হওয়া সংবাদপত্রের খবরের জন্য কেউ বসে থাকে না সংবাদপত্র প্রিন্ট হওয়ার আগেই মানুষ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো মূহুর্তের মধ্যে হাতের মুঠোয় পেয়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রেও কিন্তু মফস্বল সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। সাংবাদিকরা বের করে আনেন খবরের ভেতরের খবর। এ কারনে সংবাদপত্রগুলো মফস্বল সংবাদের গুরুত্ব অনুধাবন করছেন। যার প্রেক্ষিতে রাজধানীর বাইরের খবরে আজকাল বেশ বৈচিত্র এসছে। মফস্বল সাংবাদিকরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষনের সুযোগ পাচ্ছেন। সাংবাদিকদের এ সুযোগ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ প্রেসইনষ্টিটিউট (পিআইবি) আশাকরি পিআইবি এই ধারা অব্যাহত রেখে আরো প্রসারিত করবে।

রাজধানী এবং বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরে আজকাল জেলা শহরগুলো থেকে অনেক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তাদের উদ্যোগ সত্যিই প্রসংশনীয়। এরা মূলত পাঠক নির্ভর নিজ শহরে ও আশ পাশের মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছে। সাংবাদিকদের ঐক্যে বিবেদ ঘটানোর জন্য অনেকেই চেষ্টা করে থাকে, সফলও হয়। একটি উপজেলায় ৬০/৭০ জন সাংবাদিক থাকলে দল উপদলে ভাগ হয়ে গ্রুপ হয় ৫/৭ টি! এটা কখনোই কাম্য নয়। এতে করে পেশার মান কমে এবং জীবনের ঝুকি বেড়ে যায়। অনেক সময় সাংবাদিকরা বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকেন। তবে ভুক্ত ভোগী কেউ হলেই বুঝা যায় ঐক্যের যে কত প্রয়োজন ছিল। আশা করি প্রবীন সাংবাদিকগণ বিষয়টি উপলব্দি করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে নবীনদের প্রতি অভিভাবকের দায়ীত্ব পালন করবেন। নবীনরা খুঁজে পাবে আপন ঠিকানা এবং অভিভাবক। তাই আসুন গ্রাম বাংলার মানুষ ও জাতীর কল্যানে সাংবাদিকদের এক মাত্র সংগঠন প্রেসক্লাবকে শক্তিশালী করে মফস্বল সাংবাদিকদের টিকে থাকার সংগ্রামকে অধিকতর শানিত করি।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com