বেদনাসিক্ত ১৫ আগস্ট

৪৩ বার পঠিত

সুব্রত দেব নাথ : ১৯৭৫-এর পর থেকে আগস্ট মাসটি আর অন্য ১১টি মাসের চেয়ে ব্যতিক্রম আবহ নিয়ে বাঙালির দ্বারে এসে হাজির হয়। আগস্ট আসে বাঙালির জন্য ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। এখানে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-সম্প্রদায় একাকার হয়ে যায় মাতমে।

১৯৭৬ সালের আগস্ট থেকে প্রায় দেড় দশক বাঙালি আগস্টে শুধু মাতম করেছে। তারপর শুরু হলো সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাঙালিকে নতুন শক্তিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আন্দোলন। সেই থেকেই বোধকরি বাঙালি আবার নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নতুন স্বপ্ন নিয়ে দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগুচ্ছে।

 

১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের ১৫ তারিখে একদল বিশ্বাসঘাতক কুলাঙ্গারের হাতে রাতের  আঁধারে সপরিবারে নিহত হন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল এদেশেরই কিছু কুলাঙ্গার।

 

খুনিরা সেদিন কেবল বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, হত্যা করেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ প্রেরণাময়ী সর্বংসহা মা বেগম মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল, নববধূ সুলতানা কামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মণি, অন্তঃস্বত্ত্বা আরজু মণি, রোজি জামাল, কর্নেল জামিলসহ অনেককে।

 

খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ভেবেছিল সেদিন থেকেই দেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর দর্শন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ শেষ করে দিয়েছে। খুন করে, জবর দখল করে কি কখনো কোনো দর্মন কোনো আদর্শ কোনো সংগ্রামী ইতিহাস ধ্বংস করা যায়? যায় না। ক্ষণিকের বিরতি হয়তো আসে শোকে বিহ্বল হতভম্ব জাতির সামনে। কিন্তু সময়ের প্রেক্ষাপটে জাতির তার চিরাচরিত ঐতিহ্য নিয়ে ঠিকই জেগে ওঠে। তখন আর শোক করার সময় থাকে না, পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, বেদনা, হতাশা জমাট হতে হতে তা পূর্ণ শক্তি সঞ্চয় করে ঠিকই বিস্ফোরিত হয়। এটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যেমন হয়েছে, তার আগেও সময় সময় হয়েছে। পাকিস্তানবিরোধী বাঙালির আন্দোলন তো সেদিনের ইতিহাস। আর সেই যুগসন্ধিক্ষণেই আবির্ভাব ঘটে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।

 

যুগ যুগ ধরেই আমরা বাঙালিরা পরাধীন ছিলাম । বলতে গেলে সম্রাট অশোকের পর বাঙালির কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তত্বই ছিল না।

 

নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব বলা হয়, তিনি কিন্তু বাঙালি ছিলেন না। পলাশীর আম্রকাননে গুটিকয়েক কুলাঙ্গারের বিশ্বাসঘাতকতায় ভাগীরথী নদীর তীরে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলার শেষ স্বাধীন সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। তারপর পুরোটাই বাঙালির ওপর অত্যাচার, নির্যাতন আর শোষণের দীর্ঘ ইতিহাস। পৌণে ২০০ বছর আমাদেরকে ব্রিটিশদের গোলামি করতে হয়েছে।
আর এই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাংলার বীর সন্তানদের ভূমিকা ছিল সবার আগে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ক্ষুদিরাম বসুকে জীবন দিতে হয়েছে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ব্রিটিশদের তাড়াতে আন্দোলন করেছেন ফকির মজনু শাহ। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছে ফকির বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ। ফরায়েজি আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন হাজী শরীয়তউল্লাহ, দুদু মিয়া। বাঁশের কেল্লা করে বীরদর্পে লড়েছেন মীর নেসার আলী তিতুমীর। এভাবে বহু প্রাণের বিনিময়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশরা ভারত ছাড়লেও আমরা আবার পরাধীন হয়ে গেলাম। আমাদের ওপর আবার সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো ক্ষমতার প্রভু হয়ে গেল এখান থেকে হাজার কিলোমিটার দূরের পশ্চিম পাকিস্তানিরা।

 

বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতে থাকলেন ব্রিটিশদের চেয়েও হাজার গুণ খারাপ শাসক হয়ে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তানিরা। পাকিস্তানিদের শাসন-শোষণ-নির্যাতন থেকে বাঙালিদের  রক্ষায় আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন করতে নিজের জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে পুরো দেশকে স্বাধীনতার মন্ত্রে জাগিয়ে তুললেন বঙ্গবন্ধু। এজন্য জীবনের স্বর্ণময় ১২টি বছর তিনি কাটিয়েছেন কারগারে। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাতে তিনি যেন হেসে হেসে কারাবরণ করেছেন। পাকিস্তানিরা শুধু তার ওপর নয়, তার পরিবারের ওপরও চালিয়েছে নির্মম নির্যাতন। আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ  হাসিনাসহ বঙ্গবন্ধুর ছেলেমেয়েরা বাবার স্নেহ পর্যন্ত পাননি। বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বের হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন আবার সে রাতেই তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে পুলিশ। এভাবে ১২টা বছর তাকে জেলে থাকতে হয়েছে।

 

জেনে হতবাক হই, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নাজেহাল করতে পাকিস্তান আমলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সরকার একটি আইন পাস করেছিল যাতে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ঢাকায় কেউ বাসা ভাড়া না দেয়।

 

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানে বন্দি থাকা অবস্থায় পাকিস্তানিরা তাকে প্রহসনের বিচার করে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল। কারা প্রকোষ্ঠের পাশে বঙ্গবন্ধুর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শুধু বলেছিলেন, ‘আমার লাশটা বাংলার মাটিতে পাঠিয়ে দিও।’

 

যে বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, বাংলার স্বাধীনতার জন্য তার জীবনে এত কষ্ট স্বীকার করেছেন; যিনি চাইলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। যিনি তর্জনী উঁচিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আমি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি আমার মানুষের অধিকার চাই’ সেই মহান নেতাকে তার স্বাধীন দেশেরই কিছু বেঈমান ও কুলাঙ্গার লোক রাতের আঁধারে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করে।

 

শেখ মুজিবের ঘাতকদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে এ মাস। আগস্টকে ঘাতকরা তাদের টার্গেটের মাস হিসেবে বেছে নিয়েছে বারবার। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড ছুঁড়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল জাতির জনকের কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে যান। কিন্তু প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী, আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত ও পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন।

 

যে বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলার স্বাধীনতা আরো বহু দূর ছিল- এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তার কারণেই আজ বাংলাদেশ স্বাধীন, বাঙালির সন্তানরা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, এমপি, মন্ত্রী, সেনাবাহিনীর প্রধান, পুলিশের আইজি। সারা দুনিয়ায় সগর্বে উড়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।

 
  আজ দেশে ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে, নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে আমাদের সবারই উচিত বঙ্গবন্ধুকে সব সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা, যথাযথ সম্মান করা। তাকে হত্যা করে যে মহাপাপ আমরা করেছি, তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেই আমাদের সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। না হলে আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হয়ে যাব।

 

মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু কেবল একজন শেখ হাসিনার বাবা নন তিনি গোটা বাঙালি জাতির নেতা, আমাদের জাতির জনক, বাংলাদেশের স্রষ্টা।

 

পরিশেষে বলতে চাই, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতের নিষ্ঠুরতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বাঙালি এগিয়ে যাবে অভীষ্ট লক্ষ্যে- এটাই হোক আজ শোকের মাসের অঙ্গীকার।

 

লেখক : সংবাদকর্মী

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com