কবি ও সাংবাদিক প্রান্ত পলাশের মুক্তি চাই

৭০ বার পঠিত

প্রান্ত পলাশ নামে একটি কবিকে র‍্যাব ধরে নিয়ে গিয়েছিল গত রবিবার রাতে। একটু আগে ওর আপনজনদের একজন জানালেন যে আজকে নাকি ওর বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা করেছে। সত্যি কথা বলি, মামলা হয়েছে শুনে স্বস্তি পেয়েছি। কেরম মামলা যখন হয়ে গেছে এখন তো সে খাতাকলমে সরকারের হেফাজতে আছে। আইনত তার নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন সরকারের। মামলা হবার আগে পর্যন্ত ভয় পাচ্ছিলাম- বুঝতেই পারছেন কিসের ভয় পাচ্ছিলাম। এই একটা অন্যায় কাজ শুরু হয়েছে এখন, পুলিশ র‍্যাব এরা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার না করেই লোকজনকে তুলে নিয়ে যায়।
এই যে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার না করে কজন লোককে তুলে নিয়ে যাওয়া, এটা নেহায়েতই অপহরণ। পুলিশের বা র‍্যাবের এই ক্ষমতা নাই যে কোন লোককে এইরকমভাবে তুলে নিয়ে যাবে। আর এইরকমভাবে তুলে নিয়ে যাবেই বা কেন? কোন অপরাধের অভিযোগে বা সন্দেহের কারণে বা তদন্তের প্রয়োজনে যদি কাউকে প্রয়োজন হয়, তাইলে তাকে আপনারা গ্রেফতার করবেন। গ্রেফতার করে আপনাদের খাতাপত্রে লিখবেন কেন কখন কি অবস্থায় তাকে গ্রেফতার করলেন। এরপর আইনানুগভাবে যা হয় হবে। কিন্তু কাগজে কলমে গ্রেফতার না দেখিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া সে তো অপহরণ আরকি।
এখন যেহেতু ওর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এখন ওর জামিনের চেষ্টা করা যাবে। মামলা লড়া যাবে। কিন্তু এগুলি তো গেল আপাতত এই ছেলেটির নিরাপত্তা ইত্যাদির বিষয়। নীতিগতভাবে এই যে সরকার এইসব মাস্তানি করেই যাচ্ছে তার কি হবে?

প্রান্তকে ওরা কেন ধরেছে? প্রান্ত বাংলামেইল নামে একটা অনলাইন সংবাদপত্রে কাজ করে। সেই অনলাইন পত্রিকাটির একটি প্রতিবেদন নিয়ে ঘটনা। আমি যেটা শুনেছি, সেই প্রতিবেদনটিতে ওরা আরেকটা পোর্টালে প্রকাশিত একটা খবরকে মিথ্যা এই কথা জানিয়ে সকলকে অনুরোধ করেছিল সেই খবরটিতে গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য। যে খবরটির সত্যতা নাই বলে প্রান্ত’র পোর্টালে রিপোর্ট করেছে, সেটা আসলেই মিথ্যা। র‍্যাব ওরা এসে নাকি এখন গুজব ছড়ানোর অভিযোগে প্রান্তকে ধরে নিয়ে গেছে। প্রান্তকে একা ধরেনি, প্রান্ত’র সম্পাদক আর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ওদেরকেও ধরেছে।
প্রথমত, সংবাদ প্রকাশের জন্য চট করে কাউকে গ্রেফতার করা তো ভাই ঠিক না। সংবাদ যারা প্রকাশ করেন ওদের আর এখানে যে ঘটনা শুনেছি সেটা যদি সত্যি হয় তাইলে তো ওরা অন্যায়ও কিছু করেনাই। এরা বরং গুজবের বিপরীতে সকলকে সত্যি কথাটা জানিয়ে দিচ্ছিল। ভাল কাজটাই তো করেছে ওরা। যারা গুজবটা ছড়াতে চাচ্ছিল দোষ তো ওদের। বাংলামেইল তো ঠিক কাজটিই করেছে। ওদেরকে কেন ধরবেন।
আরেকটা ব্যাপার আছে। এই ছেলেটা কবি। কবিদেরকে কি গ্রেফতার করা যায়? কবিরা হচ্ছে ঈশ্বরের মত- সৃষ্টি করে। কবিদেরকে কেন গ্রেফতার করবেন? কবিদেরকে কখনো গ্রেফতার করতে হয় না, এমনকি তিনি যদি মন্দ কবিতা লিখে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলেন, তবুও কবিকে জেলে পোরা যায়না। এই কথাটা যে আমি নেহায়েত আবেগের বশে বলছি তা নয়। এর যুক্তিও আছে।
কবি আর শিল্পী এরা হচ্ছে স্রষ্টা, এরা কেন আমার আপনার মত দেশের আইন কানুন মেনে চলবেন। আইন কানুন মানবে আপনার আমার মত সংসারী লোকেরা। কবি একন আইনকানুনের বিধিনিষেধ মানবে? মানবে না। আর যদি মানেন তাইলে তিনি পর্যাপ্ত কবি না। এই কারণে কবিদেরকে, নেহায়েত কাউকে জানে মেরে না ফেললে, গ্রেফতার আইন আদালত এইসবের বাইরে রাখা উচিৎ। না, সিরিয়াসলিই বলছি। সৃজনশীল প্রতিভাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে না পারেন অন্তত ওদের প্রতি তো একটু সংবেদনশীল আচরণ করা উচিৎ আরকি।

   
এমনিই দেশে একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। যে কোন সময় যে কাউকে র‍্যাব পুলিশ এরা ধরে নিয়ে যেতে পারে। কখনো কখনো আবার দেখা যায় ধরে নিয়ে গিয়ে পুলিশ বেমালুম অস্বীকার করে। কিরকম ভয়াবহ অবস্থা চিন্তা করেন- পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে অথচ পুলিশ বলছে আমাদের কাছে নাই। এইরকম অবস্থায় মানুষ কার কাছে যাবে? কোন সভ্য দেশে কি এইরকম হওয়া উচিৎ? ন্যুনতম এইসব আইনি অধিকারও যদি মানুষের না থাকে তাইলে সেই রাষ্ট্র কি আর কার্যকর আছে বলা যায়? বলেন।
এইরকম একটা আতঙ্কজনক অবস্থায় পুলিশ র‍্যাব এরা যদি আবার সংবাদকর্মী কবি এদেরকেও হয়রানী করা শুরু করে তাইলে তো মহা বিপদ। এই যে এখন ওদের বিরুদ্ধে একটা মামলা হয়ে গেল, এই মামলার ঘানি ওরা কতদিন ধরে টানবে কে জানে! এইরকম হয়রানীর কি মানে আছে? এইসব করে সরকার কি সুনামটা অর্জন করছে? আইনের শাসনের কথা বললেও আওয়ামী লীগের লোকেরা ধমক দেয়। লিবার্টির কথা বললে বলে যে এইসব কথা নাকি আমাদের দেশে প্রযোজ্য না। আবার উনারা বলেন যে দেশে নাকি উন্নয়ন হচ্ছে।
উন্নয়ন কি রে ভাই? আমাকে একটু মানেটা বোঝান- উন্নয়ন কাকে বলে? আপনি সড়ক সেতু এইসব বানিয়ে দেশ চকচকে করে ফেলবেন আর দেশের মানুষ মুক্তভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারবে না এটা কিসের উন্নয়ন? এটা তো পশ্চাৎপদতা। একদিকে মুসলিম জঙ্গির ভয় আবার পুলিশকেও যদি ভয় পেয়ে চলতে হয় তাইলে আমার এইসব সড়ক সেতু বিল্ডিং দিয়ে কি হবে। জেলখানা সুন্দর হলেই কি আর ময়লা হলেই কি- জেলখানা তো জেলখানাই। দেশটাকে জেলখানা বানিয়ে কিসের উন্নয়ন? এই ঘণ্টার উন্নয়নে আমার কি হবে?

 

ইমতিয়াজ মাহমুদ  (আইনজীবি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট)

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত দেব নাথ

সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com