আইন বিরোধী কর্মকান্ডের শেষ কোথায় ?

৫৪ বার পঠিত

এম নজরুল ইসলাম নয়ন # বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলায় দিনদিন বেড়েই চলেছে আইন বিরোধী কর্মকান্ড। ব্যাপকভাবে বাড়ছে বাল্য বিয়ের প্রবনতা, জুয়া ও মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন। সরকারি জায়গায় অবৈধ দখলে মেতেছে প্রভাবশালী চক্র। কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। ভ্রাম্যমান আদালত ও পুলিশ প্রশাসনের কঠোরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ আইন বিরোধী কর্মকান্ড কোনো ভাবেই রোধ করা যাচ্ছেনা।

বাল্যবিবাহ, মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন, ইভটিজিং, জমজমাট জুয়ার আসর, অবৈধভাবে সরকারি জায়গা দখল, হোটেলে নোংড়া পরিবেশে খাদ্য সামগ্রী তৈরী ও পরিবেশন, পশুর হাটে অতিরিক্ত খাজনা ও টোল আদায়, লাইসেন্সবিহীন সমিতি গড়ে অটোভ্যান-রিস্কায় অবৈধভাবে টোল আদায়, শিশুদের দিয়ে হোটেলে কাজ করানোসহ আইন বিরোধী কর্মকান্ড দিনদিন ব্যাপকভাবে বেড়েই চলেছে। বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলায় বেড়েছে আইন বিরোধী কর্মকান্ড। ভ্রাম্যমান আদালত ও পুলিশ প্রশাসনের কঠোরতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। থেমে নেই আইন বিরোধী কর্মকান্ড। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চালিয়ে কঠোর আইননানুগ ব্যবস্থা ছাড়াই বিভিন্ন মহলের তদবিরে অপরাধীদের স্বল্প অঙ্কের জরিমানা করায় জনসাধারনের মধ্যে ভ্রাম্যমান আদালতের তদারকি নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের দোহাই দিয়ে কতিপয় কর্মকর্তারা নিমিশেই নিত্য প্রতিদিনের বখরা আদায় করে চলেছেন। যেকারণে উপজেলা ও পৌর শহরের বিভিন্ন চা স্টল, হোটেলে উপজেলা প্রশাসনের ভাবমূর্তি নিয়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে।

তথ্যানুসন্ধান ও সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ছুটিতে থাকার সুযোগে নন্দীগ্রাম উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ ও ইউপি সদস্য শফিকুল ইসলামের নির্দেশে গত ২জুলাই বুড়ইল হিন্দুপাড়ার বিনয় চন্দ্রের শিশু কন্যা ডলির(৯) সাথে একই গ্রামের বিশ্বনাথের ছেলে সুশান্ত’র(১৭) ঢাকঢোল বাজিয়ে ১০লাখ টাকা যৌতুক দিয়ে ধুমধাম করে বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করেছে। বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনকে বারবার মৌখিকভাবে জানানো হলেও আইনী ব্যবস্থা গ্রহন না করায় শেষ রক্ষা পায়নি শিশু ডলি। অবুঝ ছোট্র মেয়েটিকে বাল্যবিয়ে দিয়ে তার জীবন ধংস করা হলো। ৯বছরের শিশু কন্যার বাল্যবিয়ের ঘটনা নন্দীগ্রাম উপজেলার ইতিহাসে বিরল। অথচ এখন পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি। গত ১৩জুলাই উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের রামকৃষ্টপুর গ্রামে কিশোরী কন্যার(১৪) বাল্য বিয়ের প্রস্তুতির অভিযোগে কনের পিতা হরিপদ সরকারকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৭দিনের কারাদন্ড প্রদান করেন উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মোসা. শরীফুন্নেসা।

অপরদিকে, উপজেলার স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ গৃহবধুরা রাস্তায় বের হতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ইভটিজিং এর শিকার হচ্ছে। রাস্তাঘাটে বখাটে ছেলেদের অত্যাচারের স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বিমুখ হয়ে পড়ছে। ১৪জুলাই উপজেলার ভাটগ্রাম ইউনিয়নের কুচমা গ্রামের মাহাবুবর রহমানের স্কুল পড়–য়া কন্যার(১৩) কে দীর্ঘদিন ধরে কুপ্রস্তাব দিয়ে খ্যান্ত না হয়ে পাশ্ববর্তী নিনগ্রামের আব্দুল মান্নানের বখাটে ছেলে শামীম রেজা(২৪) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ওই স্কুলছাত্রীর অশ্লীল ছবি ছড়ানোর হুমকি দেয়। ওই ঘটনায় থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়।
এদিকে, উপজেলা ও পৌর শহরের বিভিন্নস্থানে অবাধে চলছে জমজমাট জুয়ার আসর। বারবার পুলিশ প্রশাসন জুয়ারুদের গ্রেফতার করে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে কারাদন্ড প্রদান করলেও বেড়েই চলেছে জুয়ার রাজত্ব।

প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উপজেলার সিমান্তবর্তী অন্য উপজেলার মাঝপথে জমজমাট জুয়ার আসর চলছে। উপজেলার হাটলাল, দোহার, ধুন্দার, বুড়ইল, দাসগ্রাম, কহুলী, কুন্দারহাট, রনবাঘা পাশ্ববর্তী সিংড়া উপজেলার সিমন্তবর্তী গ্রামের বাড়ি, জঙ্গল ও পুকুর পাড়সহ পৌর শহরের নামুইট ও সিধইল সুখনাগাড়ি গ্রামে দেদারছে চলছে জুয়ার আসর। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে প্রতিটি জুয়ার আসরের চলাচলের রাস্তার প্রায় ২কিলোমিটারজুড়ে পাহারাদার রাখা হয়। প্রশাসনের আনাগোনা পেলেই খবর পেয়ে যায় জুয়ারুরা। তবে একটি বিশ্বাস্থ্য সূত্র জানিয়েছে, ভ্রাম্যমান আদালত ও থানা পুলিশ গন্তব্যস্থলে পৌছাঁনোর পূর্বেই অপরাধীরা আলাদিনের চেড়াকের মত খবর পেয়ে যায়। প্রশাসনের কতিপয় কিছু কর্মকর্তরা ও নামধারি কিছু সাংবাদিক নিয়মিত বখরা নিয়ে অপরাধীদের ছত্রছায়া দিয়ে চলেছে। থানার ওসি’র প্রচেষ্টায় বিভিন্ন পয়েন্টে জুয়া খেলার সময় অর্ধশত জুয়ারুকে গ্রেফতার করে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে। তবুও থেমে নেই জুয়ার আসর।

এছাড়া পৌর এলাকায় মাদকের প্রবনতা কমলেও উপজেলার বুড়ইল, ভাটগ্রাম, কুন্দারহাট, নিনগ্রাম, কুচমা, সিংজানী, বীজরুল, বীরপলী, বাংলা বাজার, মুরাদপুর, ভাগবজর, চাতরাগাড়ি বাজার, সোনাকানিয়া বাজার, ধুন্দার, রনবাঘা, ওমরপুর, কদমা, গুছইন, দোহারসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিনত। পুলিশ প্রশাসন গত তিনমাসে শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার ও বিপুল পরিমান মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, থানার ওসি হাসান শামীম ইকবাল নন্দীগ্রাম থানায় যোগদানের পর পৌর শহর এলাকার মাদকের স্বর্গরাজ্য গুড়িয়ে দিয়েছেন। থানার সেকেন্ড অফিসার মনিরুল ইসলাম, এসআই শাহিন কাদির, এসআই ইনামুল ইসলাম, এএসআই আইউব আলী, এএসআই ফরিদ হোসেন ও এএসআই আতাউর রহমান উপজেলা ও পৌর এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে সম্প্রতি বিপুল পরিমান মাদকদ্রব্য উদ্ধার করাসহ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছেন। তারপরেও মাদকের আগ্রাসন রোধ করা যাচ্ছেনা। বর্তমানে উপজেলাজুড়েই কথিত ইয়াবা ট্যাবলেট (এ্যাম ভিটামিন) ও হিরোইনের প্রবনতা বেশী। নারীরাও মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন স্কুল কলেজের কিশোর থেকে শুরু করে যুবকেরা মাদকের ভয়াবহ ছোবলের শিকার হচ্ছে। ধীরে ধীরে আগামীর দেশ গড়ার ভবিশ্যত ধংসের দারপ্রান্তে। এর দায় কে নেবে? প্রশ্ন সচেতন মহলের।

অন্যদিকে, বগুড়া-নাটোর মহাসড়কের দু-পাশসহ পৌর শহর, উপজেলার দাশগ্রাম ও রনবাঘা হাট-বাজার, কুন্দারহাট বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় সরকারি জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। এতে করে কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বিষয়গুলো উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট বারবার মৌখিক-লিখিত অভিযোগ করা হলেও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে হোটেলে পুরোনো খাবার নতুনের সাথে মিশিয়ে পরিবেশন করায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে জনসাধারন। ফ্রিজে আইসক্রিম, ড্রিংসের পাশাপাশি রাখা হয় মাংস, মাছ ও পুরানো খাবার। খোলামেলা ও নোংড়া পরিবেশে তৈরী করা হচ্ছে খাবার সামগ্রী। দই-মিষ্টি থেকে শুরু করে সকল খাবার সামগ্রী এখন মৃত্যুফাঁদ। পৌর শহরের ওমরপুর সপ্তাহের প্রত্যেক শুক্রবার জেলার বৃহত্তর হাট বসে।

সেখানে খোলামেলাভাবে শতাধিক হোটেল বসে ফুটপাতে। খাবারের সাথে ধুলাবালি ও হোটেলের আশপাশে নোংড়া পরিবেশ লক্ষ করারমত যেনো কেউ নেই। কম মূল্যে গরুর মাংস ভূনা, মাছ ও ভাত বিক্রির মহোৎসব চলে ওমরপুর হাটে। এই খাবার আসে কোথায় থেকে। সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহকালে উপজেলা ও পৌর শহরের বিভিন্ন হোটেলে পঁচা ও বাঁশি খাবার পরিবেশনের ভয়াবহ সত্যতা পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, ভ্রাম্যমান আদালতের নাম ভাঙিয়ে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বেনসন সিগারেটের প্যাকেট গ্রহন করছেন কতিপয় কর্মকর্তা। এমন অনেক তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।

অভিজ্ঞরা বলছেন, যুবসমাজকে মাদকের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে দ্রুত আইনী পদক্ষেপ আবশ্যক। শতশত মাদক সেবনকারিদের ফেলে মাদক ব্যবাসায়ীদের গ্রেফতার করুন। জনসাধারনকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে হলে অচিরেই ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চালিয়ে অসাধু হোটেল ব্যবসায়িদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন। সরকারি জায়গায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ভ্রাম্যমান আদালতের কঠোরতা, বাল্যবিবাহ ও ইভটিজিং প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উর্ধতন কতৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন উপজেলাবাসী। উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি আনোয়ার হোসেন রানা অভিমত দিয়েছেন, ভ্রাম্যমান আদালত ও পুলিশ পশাসনের তদারকি বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপকভাবে। অপরাধী যেই হোক, প্রশাসন তাদের ছাড় দিয়ে কথা বলছেনা। মাদকের আগ্রাসন ও বাল্য বিয়ে রুখতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে জনসাধারনের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিটি অপরাধের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী চক্র। এদেরকে প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্টাফ রিপোর্টার

Bogra Offce

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com