ফরমালিন যুক্ত মৌসুমী ফল কি মুক্ত হবে? ।। আবুল বাশার শেখ

৫১ বার পঠিত

আমাদের ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশের মাটি নানা রকমের হওয়ায় এই দেশে এক এক ঋতুতে একেক ফল ফলাদি পাওয়া যায়। বিশেষ করে জৈষ্ঠ্য মাসে এ দেশে মৌসুমী ফল আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। গ্রামের হাট বাজারগুলো ফলে ফলে ভরে উঠে। এই ফলগুলোই বিভিন্ন যান বাহনের মাধ্যমে এক জেলা থেকে অপর জেলায় চলে যাচ্ছে। কোনটা দ্রুত আবার কোনটা ধীরগতিতে যার ফলে ফলগুলো যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য ব্যবসায়ীরা এতে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ফরমালিন মিশিয়ে বাজারজাত করছে। দেশে বছরের বিভিন্ন সময় অভিযান হয় এবং বিশেষ করে প্রতি বছরেই মধু মাসে অভিযান হয়। হাজার হাজার মন আম, কাঁঠাল, লিচু গুড়িয়ে দেয়া হয়।

ফল ফলাদির অপরাধ কি? প্রয়োজন পড়লে আইনের সংশোধনী আনতে হবে ঐ সমস্ত অসাধু ব্যবসায়ী ও বিষাক্ত রাসায়নিক ও ফরমালিন আমদানিকারক ব্যক্তিদের জন্য। আইনের কঠোরতম অবস্থান এবং যথাযথ প্রয়োগ করতে পারলে বছরে এই টনকে টন সুমিষ্ট ফল নষ্টও হবে না আর যেগুলো ক্রেতা সাধারণ ক্রয় করছেন সেগুলোও বদ হজম হবে না। এতে একদিকে যেমন আমাদের অর্থনীতি ক্ষতির মুখোমুখি হবে না তেমননি রক্ষা পাবে সাধারণ জনগণ। শহুরে বাজারগুলোতে গেলে দেখা যায় বিক্রেতাদের কাছে থরে থরে সাজানো আছে চোখ ধাধানো বহুবিধ ফলফলাদি। এই চোখ জুড়ানো ফল ফলাদির মধ্যে মিশিয়ে রাখা হয়েছে জীবনঘাতি বিষাক্ত রাসায়নিক ও ফরমালিন, যা ক্রেতা সাধারণ অনেকটা মনের অজান্তে কিংবা জেনেই বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছে।

এই ফলগুলোতে অভিনব পদ্ধতিতে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। যা দেখলে কিংবা সচিত্র প্রতিবেদন দেখলে শিউরে উঠতে হয়। এর বিরুদ্ধে আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রচার, প্রতিরোধ ও পর্যাপ্ত জনসচেতনমূলক কোন অনুষ্ঠান না থাকায় এই বিষাক্ত রাসায়নিক ও ফরমালিনের কুফল সম্পর্কে সাধারণ জনগণ পুরোপুরিভাবে জ্ঞাত নয়। বিষাক্ত রাসায়নিক ও ফরমালিনের বিরুদ্ধে আমাদের দেশে প্রতিটা মিডিয় প্রায়শই তাদের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পদক্ষেপ অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়াও আমাদের দেশে অনেক ভেজাল বিরোধী সংগঠন আছে যারা সীমিত কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ খুব একটা চোখে পড়েনা। এ ক্ষেত্রে আমার মনে হয় তাদের আরও সচেতন হতে হবে।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আসলে আমরা কি খাচ্ছি? ভাল নাকি মন্দ এ বিষয় নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকার চিত্র তুলে ধরে অসংখ্যবার খবরের কাগজে রিপোর্ট হয়েছে। অভিযানও হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জরিমানাও করা হয়েছে। এমন কি ভেজালকারী প্রতিষ্ঠানকে সীলগালা করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা যায় ‘যেই লাউ সেই কদু’। অসাধু ব্যবসায়ীরা ঠিকই তাদেও ব্যবসায়ীক কারবার বীরদর্পে চালিয়ে যাচ্ছেন। এক সময়কার ভেজাল বিরোধী আন্দোলনের আলোর দিশারী হিসেবে পরিচত ম্যাজিস্ট্রেট রুকন উদ দৌলা যখন বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্যের উপর ভেজাল বিরোধী কার্যক্রম চালু করলেন তখন চারদিকে তার জয়গানের রব উঠে। কিছুদিন পর কি হলো উনাকে তার কর্মস্থল থেকে বদলী করা হলো। প্রতিবাদ হয়েছে কি ?

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আমার মনে হয় ভেজাল খেতে খেতে আমাদের দেহ ভেজাল সহনীয় হয়ে গেছে। আর তাই ভেজাল নিয়ে আমাদের আর মাথা ব্যাথা নেই। যা পাই তা মজা করেই খাই। বিশেষজ্ঞদের মতামত আমাদের দেহের সমস্ত অর্গানগুলো ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, যার কারণে দেখা দিচ্ছে নতুন নতুন রোগ বালাই। দেহে দিনের পর দিন বিষাক্ত রাসায়নিক ও ফরমালিন প্রবেশ করলে ক্যান্সার হওয়ার আশংঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। শিশুদের ক্যান্সারের পাশাপাশি অন্যান্য জটিলতাও দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া ফরমালিনের কারণে কিড্নী ও লিভার নষ্ট হওয়ার আশংকাও থাকে অনেক বেশি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন গর্ভবতী মায়েরা। কারণ বর্তমান সময়ে মৌসুমি ফল, কলা, মাছ-মাংস, শাক্-সবজিসহ প্রায় প্রতিটি খাদ্য ভেজালযুক্ত।

যারা দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছেন তাদের প্রতি ফরমালিন ও বিষাক্ত রাসায়নিক শুধু দেশের নিরীহ জনগণকে অসুস্থ করবেনা অসুস্থ করবে গোটা দেশ ও জাতীকে। ফরমালিন ও বিষাক্ত রাসায়নিকের কোন দল নেই, ওরা কোন কোন সরকার বা বিরোধী দল চিনেনা। একবার ভাবুন তো প্রকৃতির এই মহা নেয়ামত ফল ফলাদি কতই না সুন্দও আর কতই না সুস্থাধু। এই ফলগুলোতে যখন ফরমালিন ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করা হয় তখন এগুলোর অবস্থা কি হয়? অতএব আপনারা এভাবে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন না করে দেশের স্বার্থে, এ দেশের নিরীহ জনগন ও বিশেষ করে আগত অনাগত প্রজন্মের স্বার্থে হলেও জেগে উঠুন এবং গ্রহণ করুন বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ। দলমত নির্বিশেষে খোজে বের করুন মানুষরূপী জানুয়ারদের।

এদের শায়েস্তা করার জন্য মৃত্যু দন্ডের চেয়েও যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেই আইন পাশ করুন এবং তা যথাযথ ভাবে প্রয়োগ করুন। তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশে একটি নজির বিহীন আইন সারা বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং গোটা জাতি এক ভয়াবহ বিষাক্ত ছোবল থেকে রক্ষা পাবে। সে সাথে রক্ষা পাবে প্রকৃতির মহা নেয়ামত এই ফল ফলাদি। আর যা অল্প খেলেই পাওয়া যাবে আসল স্বাদ ও কার্যকারিতা।
পরিশেষে জাতি কিংবা জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই- ফরমালিন যুক্ত মৌসুমী ফল কি মুক্ত হবে?

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com