ধূমপানঃ ক্ষতিকর পরোক্ষ প্রভাব ।। সোহেল আহমেদ পরান

এই সংবাদ ৬২ বার পঠিত

প্রাক-কথাঃ

 ‘ধূমপান‘ শব্দটি ‘ধূম’ এবং ‘পান’ শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত। ধূম হলো ‘ধোঁয়া’ বা বাষ্পের প্রতিশব্দ। যেহেতু তামাকজাতীয় পদার্থের ধোঁয়া গ্রহণ করা হয় বা পান করা হয়, তাই একে ‘ধোঁয়া পান’ করা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, সে হিসেবে ধূমপান শব্দটি গঠিত। ধূমপান হচ্ছে তামাক জাতীয় দ্রব্যাদি বিশেষ উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে শ্বাসের সাথে তার ধোঁয়া শরীরে গ্রহণের প্রক্রিয়া। সাধারণ যেকোনো দ্রব্যেরপোড়ানো ধোঁয়া শ্বাসের সাথে প্রবেশ করলে তাকে ধূমপান বলা গেলেও মূলত তামাকজাতীয় দ্রব্যাদির পোড়া ধোঁয়া গ্রহণকেই ধূমপান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ধূমপানের প্রকারভেদঃ

 ধূমপান দুই ধরনের হতে পারে। যথা-

সক্রিয় ধূমপান :ধূমপায়ী যে অবস্থায় জলন্ত সিগারেট বা বিড়ি বা চুরুট থেকে উদ্ভুত ধোঁয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে টেনে সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করায় তাকে সক্রিয় ধূম্পান বলে।

নিস্ক্রিয় ধূমপান :ধূমপানের সময় ধোঁয়ার যে অংশ চারপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনৈচ্ছিকভাবে মানুষের দেহে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করে নিস্ক্রিয়/পরোক্ষ ধূমপান বলে।

ধূমপানের অপকারিতা – পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাবঃ 

 গবেষণায় দেখা গেছে সিগারেটের ধূমপানে নিকোটিনসহ ৫৬টি বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বিরাজমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের ১৯২টি দেশে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের ধূমপানের (পরোক্ষ ধূমপান) প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৬,০০,০০০ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১,৬৫,০০০-ই হলো শিশু। গবেষণায়ও এও বেরিয়ে এসেছে যে, পরোক্ষ ধূমপান পুরুষের তুলনায় নারীর উপর বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৮১,০০০ নারী মৃত্যুবরণ করেন। এর আগে ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে পরিচালিত এজাতীয় আরেকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিলো যে, পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ৪০% শিশু, ৩৩% অধূমপায়ী পুরুষ এবং ৩৫% অধূমপায়ী নারী রয়েছেন।

তাতে এও ফুটে ওঠে যে, পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির স্বীকার হচ্ছেন ইউরোপ ও এশিয়ার মানুষ।গ্লোবাল এডাল্ট টোবাকো সার্ভে অনুসারে, বাংলাদেশে ৪ কোটি ১৩ লাখ লোক পরোক্ষভাবে ধূমপানের শিকার। এর মধ্যে ১ কোটি নারী। কর্মক্ষেত্রে ৬৩%, পাবলিক প্লেসে ৪৫% মানুষ ধুমপান করছে। আরও জানা যায়, শুধুমাত্র দেশের সকল রেস্তোরাঁ ও হোটেলে ২ কোটি ৫৮ লাখ মানুষ ধূমপান করছে। চিকিৎসকরা বলেছেন- ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য সেবনের ফলে ২৫টি প্রাণঘাতী রোগের প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। তামাক বলতে শুধু বিড়ি বা সিগারেট সেবনকে বুঝায় না। পানের সাথে জর্দ্দা, সাদা, গুল, খৈন, নার্সি ইত্যাদিকেও বুঝায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়- বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ধূমপায়ী চিহ্নিত দেশ।

শিশুর জন্য সমস্যাঃ 

পরোক্ষ ধূমপানের জন্য শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়। শিশুরা সাধারণত নিন্মলিখিত স্বাস্থ-ঝুঁকিতে পড়েঃ
– ফুসফুসে নানা ধরনের সংক্রমণ;
– ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা;
– শিশুর কানে সংক্রমণ;
– শিশু শ্বাসকষ্টে ভোগা
– দীর্ঘদিন কাশি;
– অ্যাজমা
– গলাব্যথা, নাক দিয়ে পানি ঝরা।
– রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে ফেলা
এমনকি শিশু Sudden infant death syndrome (SIDS) এর শিকারও হতে পারে এই পরোক্ষ ধূমপানে।

নারীর জন্য সমস্যাঃ 

নারীর উপরও পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাব অত্যন্ত উদবেগজনক। বিশেষকরে গর্ভবতী নারীর খুবই ঝুঁকিতে থাকে এর প্রভাবে। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে পরোক্ষ ধুমপানে যা ঘটতে পারেঃ]

– মিসকেরেজ (miscarriage)
– stillbirth
– জন্মকালীন শিশুর স্বল্প ওজন

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ও প্রতিপাদ্যঃ

 ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বজুড়ে তামাকের ব্যবহার কমানোকে উৎসাহিত করার জন্য তামাকমুক্ত দিবস পালন করে আসছে। এ বছর বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘তামাকের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ কর’ (Stop illicit trade of tobacco products)। তামাকের অবৈধ বাণিজ্যের ফলে সরকার প্রতিবছর বিপুল অংকের রাজস্ব হারায়। সংঘবদ্ধ চোরাকারবার, মাদকপাচার ও মানবপাচারের মত ভয়াবহ ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টিতেও সহায়তা করে তামাকের এই অবৈধ ব্যাণিজ্য। এছাড়াও এ কারণে সরকার গৃহীত তামাক নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন: ছবিসহ সতর্কবাণী ইত্যাদির প্রভাবও অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর বাড়িয়ে বিদেশি তামাকপণ্যের সাথে দাম-পার্থক্য কমানো, শক্তিশালী কর-প্রশাসন এবং সর্বপরি রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছাই পারে তামাকের অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে।

নিয়ন্ত্রণ বিধিমালাঃ

 দেশে তামাকজনিত ক্ষতি হ্রাসে সরকার ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে গৃহীত আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)’-এ স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তির বিধানাবলি প্রতিপালনে এবং ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন, ব্যবহার, ক্রয়-বিক্রয় ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫’ প্রণয়ন করে সরকার। ২০০৬ সালে প্রণীত হয় এ সংক্রান্ত বিধিমালা। কিন্তু কিছু দুর্বলতার কারণে আইনটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় ২০১৩ সালের মে মাসে আইনটি যুগোপযোগী করে সংশোধিত আকারে পাস করা হয়। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২৩ মাস পর সংশোধিত আইনের আলোকে প্রণীত বিধিমালাটি গত ১২ মার্চ গেজেট আকারে পাস হয়েছে।

সংশোধিত আইন ২০১৩ ও বিধিমালা ২০১৫-তে নারী, শিশুসহ সব অধূমপায়ীকে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার থেকে রক্ষায় কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী ‘পাবলিক প্লেস’ ও ‘পাবলিক পরিবহনে’ ধূমপান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনে ২৪ ধরনের স্থানকে ‘পাবলিক প্লেস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে যার মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট, আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভবন, আদালত ভবন, বিমানবন্দর ভবন, সমুদ্রবন্দর ভবন, নৌবন্দর ভবন, রেলস্টেশন ভবন, বাস টার্মিনাল ভবন, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদর্শনী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপণি ভবন, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার নির্দিষ্ট সারি, খেলাধুলা ও অনুশীলনের জন্য নির্ধারিত আচ্ছাদিত স্থান, জনসাধারণ কর্তৃক সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য অন্য কোনো স্থান অন্তর্ভুক্ত। আর ‘পাবলিক পরিবহন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ৮ প্রকার যানবাহনকে যার মধ্যে মোটরগাড়ি, বাস, রেলগাড়ি, ট্রাম, জাহাজ, লঞ্চ, যান্ত্রিক সব রকম জনযানবাহন, উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত। এসব ‘পাবলিক প্লেসে’ ও ‘পাবলিক পরিবহনে’ ধূমপান করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি অনধিক ৩০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

আইনের ধারা ৮ অনুযায়ী পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনের মালিক বা ব্যবস্থাপককে সংশ্লিষ্ট স্থান বা যানবাহনের এক বা একাধিক জায়গায় ‘ধূমপান হইতে বিরত থাকুন, ইহা শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ সংবলিত সতর্কতামূলক নোটিশ বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনের এ ধারা লঙ্ঘন করলে অনধিক ১ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ধারা ৭ক অনুযায়ী প্রতিটি পাবলিক প্লেস বা পাবলিক পরিবহনের মালিক বা ব্যবস্থাপককে তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাকে ধূমপানমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে বিধিমালায় উল্লিখিত দায়িত্ব পালন করার কথা বলা হয়েছে। এসবের মধ্যে ধূমপানমুক্ত এলাকায় কোনো ছাইদানি না রাখা, কেউ ধূমপান করলে তাকে বিরত থাকার অনুরোধ করা, অনুরোধ সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তি ধূমপান করলে ওই ব্যক্তিকে ধূমপানমুক্ত এলাকা ত্যাগে বাধ্য করা অথবা সেবা প্রদান হতে বিরত থাকা, প্রয়োজনে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সহায়তা গ্রহণ অন্যতম। আইনের এ বিধিবিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ৫০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

শেষকথাঃ

 প্রতিপাদ্য যাই থাকুক আর বিধিমালা গ্রন্থে, সন্দেহ নেই- ধূমপান জনস্বাস্থের জন্য ঝুঁকির অন্যতম কারণ। আর ধূমপান না করেও যারা এর শিকার হচ্ছেন- তাদের বাঁচাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ আর সচেতন-শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। তথ্যসূত্রঃ

http://www.bn.wikipedia.org

http://www.webmd.com

http://www.dainikamadershomoy.com

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com