হারানো সন্তানকে খুঁজতে টানা ২৯ বছর বৃদ্ধা মা

৮৪ বার পঠিত

মাতৃস্নেহের হাজারো দৃস্টান্তকে পেছনে ফেলে সবার উপরে স্থান পেতে পারে অসহায় এই বৃদ্ধা মায়ের গল্প!

ঘটনাকাল ১৯৮৮।  ইতিহাসে সবচে বড় বন্যার কবলে সেবার পড়েছিলো বাংলাদেশ। মুল গল্পের শুরুটাই সেই বন্যাকে ঘিরেই।  হাজারো- লাখো মানুষের স্বপ্ন নিমিষেই ভেসে যাচ্ছিলো বানের পানিতে। আজ থেকে প্রায় ২৯ বছর আগে আকস্মিক একবেলায় নিজের কোলে ঘুমিয়ে থাকা শিশুকন্যাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো সর্বগ্রাসী বন্যার পানি।  বিরসমুখে অনেকের কাছেই নিজের  সন্তান হারানোর অক্ষত সেই বুকফাটা যন্ত্রণা আর ফিরে  পাবার আকুলতায় চোখ ভেজান এই বৃদ্ধা নারী। কল্পনার হিসেবে ঐ বয়সী কোন মেয়ে দেখলেই সেই বৃদ্ধা মায়ের চকিত চোখ খুজে ফেরে বুকের হারানো ধন।

সিনেমার  গল্প অথবা কোন উপন্যাসেও হয়তো দেখা মেলেনি এমন ‘বিরল দৃস্টান্তের’ ।

নোয়াখালী জেলার দেয়ালীয়া এলাকার ফেলু মন্ডলের স্ত্রী জমিরন বেগম। বয়সের ভারে ন্যুজ, মুখে স্পস্ট যন্ত্রণার ছাপ। বয়স  আনুমানিক ৭০ বছর।  এই মায়ের কন্ঠে এখনও সেই হারানো সন্তানকে ফিরে পাবার আকুলতা হয়তো ছুয়ে যাবে কোন পাষণ্ডের মনেও

বার্ধক্যের কারনে ছানি পড়ে প্রায় ঘোলাটে হয়ে যাওয়া মায়ের চোখ এখনও প্রতিদিন-প্রতিক্ষন খুজে ফেরে তার আদরের দুলালীকে। বুকের অন্ধকার গহীনে কোন একচিলতে আশার আলোকে জিইয়ে রেখে  একমাত্র সন্তানের খোঁজে অসহায় গর্ভধারীনি বৃদ্ধ মা ঘুরে ফিরছেন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম, এক শহর থেকে অন্য শহর ছাড়িয়ে  দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই । এখন অবধি এই দীর্ঘ খোঁজে কোথায়ও পাননি তার সন্তানের কোন খোঁজ! তবুও কেন জানি এই মায়ের বিশ্বাস, হয়তো ফিরে পাবে সেই হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে।

কোন শিক্ষিত অথবা বুদ্ধিমান লোকের সাথে কথা বলার সুযোগ পেলেই কাতর কন্ঠে নিজের সন্তানের খোঁজ নিয়ে পরামর্শ চান জমিরন বেগম।

এমনি কারো কাছে থেকে হয়তো এই অসহায় মা জেনেছিলেন, ‘এখন ফেসবুকে  তথ্য দিলে খুজে পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া মানুষ’ । সেই কথায় হয়তোবা কিঞ্চিত জন্মানো আশায় তিনি ছুটে আসেন কালকিনি উপজেলার স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার অনুরোধ নিয়ে।

বুধবার দুপুর। কালকিনী বাজার।  স্থানীয় সাংবাদিকদের ক’জন বসে আলোচনা করছিলেন নানা বিষয়ে। এগিয়ে এলেন এই বৃদ্ধা মা। হাতে ভিক্ষার ঝুলি। চোখে জিজ্ঞাসা … কিছু বলতে চান বৃদ্ধা ?

একজন বলেই বসলো, ‘চাচী এখন নাই পড়ে আসেন’! ঠায় দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে চোখ রেখে দুপাশে মাথা দুলিয়ে এবার অসম্মতির কথা জানালেন বৃদ্ধা।

নাহ! ভিক্ষে নয়, তাহলে কি ? ।

চাচী অন্যকিছু বলতে চান?

এবার হুট করেই সবার সামনে বাধভাঙ্গা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন বৃদ্ধা । আমরা আগ্রহ দেখাতেই এবার শুরু করে বৃদ্ধা । আমরা শুনছি, চোখের সামনে বৃদ্ধা মায়ের স্মৃতিচারণ আর আকুতিতে যেন জানান দিচ্ছে মাতৃস্নেহের এক অভুতপুর্ব ও বিস্ময়কর ভালোবাসার ইতিহাস!

বৃদ্ধা মা জমিরন বেগম তার স্থানীয় ভাষায় জানান, বিয়ের দীর্ঘবছর কেটে গেলেও কোন সন্তানের মুখ দেখেনি তারা। কতো মানত, কতো পীর-ফকিরের পানি পড়া আর তাবিজ ধারণ করেছিলেন তার হিসেব নেই।  স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একটি সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে হাজারো ফরিয়াদ করেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। একদিন আল্লাহ দোয়া কবুল করেন তাদের। কোল জুড়ে আসে ফুটফুটে একটি মেয়ে সন্তান।  জমিরনের বয়স তখন প্রায় ৩২ । পরিবারে অবস্থাও তখন ছিলো বেশ সচ্ছল।  মেয়ের নাম রাখা হয় কোমেলা বানু। সারাদিন হাসি-খুশি চেহারায়  মিষ্টি হাঁসি লেগেই  থাকতো কোমেলার।

তবে অচিরেই স্বামী-স্ত্রীর আরাধ্য সেই  সাতরাজার ধন হারিয়ে যায় এক বেদনাদায়ক গল্পের জন্ম দিয়েই। সেবার সর্বগ্রাসী বন্যা কেড়ে নিয়েছিলো নিজের কোলে ঘুমিয়ে থাকা শিশুকন্যাকে। নিমিষেই সব স্বপ্ন ভাসিয়ে শুন্য করে দিয়েছিলো ঐ সন্তানহারা পিতা-মাতার বুক।

যেদিন কোমেলা হারালো সেদিন থেকেই তাকে খুজতে আশে পাশের সব গ্রাম চষে বেড়াতে শুরু করে দুজনেই। দিন যায়, মাস ঘুরে বছর। কোন কোন দিন আশার সব আলো নিভে নিভে হতাশায় ভোগে দুজনেই । ফের নতুন আশায় খুজে ফেরে কোমেলাকে তারা । প্রথমদিকে  সন্তানকে খুজতে গ্রামের কিছু জমি ভিটে-মাটি বেঁচে চলে খোঁজ । এর ক’বছর  পর সন্তানের শোকে কাতর হয়েই কিছুদিন অসুখে ভুগে মারা যান বৃদ্ধার স্বামী ফেলু মন্ডল। এবার একেবারে একা হয়ে যান জমিরন বেগম।  শুরু করেন একাই। জীবনের তাগিদে জমিরন বেগমের বেছে নিতে হয় ভিক্ষাবৃত্তি। প্রায় ২৯ বছর ধরে চলে আসা  সেই খোঁজ চলছেই এখনও।

বৃদ্ধা মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আজ কোমেলা বেঁচে থাকলে আনুমানিক ৩৫/৩৬ বছর বয়স হতো তার। এতদিন কোন বিশ্বাসে খুজছেন আপনি? সরলচোখে এই মা জানালো, তার বিয়ে হয়েছিলো মাত্র ১২ বছর বয়সে। বিয়ের প্রায় ২০/২২ আল্লাহর কাছে  অনেক ফরিয়াদে তার কোলজুড়ে এসেছিলো কোমেলা। হয়তো আল্লাহ ফের কোন পরীক্ষা নিচ্ছেন তার। একদিন না একদিন অবশ্যই কোমেলাকে ফিরে পাবেন তিনি।

এবার কাতর কন্ঠে এই অপারমমতাময়ী মায়ের কাতর অনুরোধ, ‘আপনারা ফেসবুকে দেন আমার কোমেলার ঘটনা’ । উনার বিশ্বাস কেও না কেও খোঁজ দেবে তার নারী ছেড়া ধনের।

মৃত্যুর আগে একবার, মাত্র একবার হলেও কোমেলার মুখ দেখতে পারার শেষ আকুতি ছিলো মায়ের।

প্রতিবেদকের কথা- টানা ২৯ বছর ধরে হারানো সন্তান ফিরে পাবার এমন প্রবল আকুতি নিয়ে এই বৃদ্ধা মায়ের গল্পটা শুনে মেলাতে পারছিলামনা বেশ কিছু বিষয়। প্রথমদিকে একবার মনে হয়েছিলো, সন্তান হারানোর শোকে ‘মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ হয়েছেন কী না ?

তবে এই প্রতিবেদন পাঠানোর আগেই বৃদ্ধার কথার ধরন যাচাই-বাছাইয়ে পরবর্তীতে সেই সন্দেহ ‘মিথ্যে’ প্রমাণিত হয়েছে । বৃদ্ধার দেয়া ঠিকানার সুত্রধরে কথা হয়েছে দেয়ালীয়ার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সহ পরিচিত বেশ কজনের সাথে। এদের মধ্যে অধিকাংশরাই (অন্তত ৫জন )এই বৃদ্ধামায়ের ঘটনা সত্য বলেই জানিয়েছে। অন্তত দুজন ব্যক্তিগতভাবে এই বৃদ্ধার সম্পর্কে  জানাতে পারেনি কিছুই। সময়ের কণ্ঠস্বর

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্টাফ রিপোর্টার

Bogra Offce

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com