আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ

১২৫ বার পঠিত

আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অনন্য  দিন। সুদীর্ঘকালের আপসহীন আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। এ দিন লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষের উপস্থিতিতে জাতির অবিসংবাদিত মহান নেতা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

‘গণ সূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে/ কবি শোনালেন তার/ অমর কবিতাখানি/এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সেদিন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে আরোহণ করেন বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে। ফাগুনের সূর্য তখনো মাথার ওপর। মঞ্চে আসার পর তিনি জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন। তখন পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান লাখ লাখ বাঙালির ‘তোমার দেশ, আমার দেশ—বাংলাদেশ বাংলাদেশ; তোমার নেতা, আমার নেতা—শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু দরাজকণ্ঠে তার ভাষণ শুরু করেন, ‘ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি…।’
তারপরই ১৯৭১-এর উত্তাল দিনটিতে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ১০ লাখ মানুষের উদ্বেল সমুদ্রে দাঁড়িয়ে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের সেই অমর কবিতা-‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম-আমাদের মুক্তির সংগ্রাম-এবারের সংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম’ পাঠ করেন বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তার এই উদ্দীপ্ত ঘোষণায় বাঙালি জাতি পেয়ে যায় স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা। এরপরই দেশের মুক্তিকামী মানুষ ঘরে ঘরে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর এই বজ্রনিনাদে আসন্ন মহামুক্তির আনন্দে বাঙালি জাতি উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত মুক্তির লক্ষ্যে।

১৯৪৭ সালে ধর্মীয় চিন্তা, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তা, জাতীয়তাবোধ ও জাতিরাষ্ট্র গঠনের যে ভিত রচিত হয়, তারই চূড়ান্ত পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের বাঙালি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

পৃথিবীর হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম রাজনৈতিক ভাষণে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ১৮ মিনিটের ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের যে দিক নির্দেশনা প্রদান করেন-তা বাঙালি জাতি ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। বাঙালি যুগ যুগ ধরে যে ঘোষণাটি শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো-যে স্বপ্ন নিয়ে ফাঁসির মঞ্চে জয়গান গেয়ে ছিলেন ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, যে স্বপ্ন নিয়ে বাঁশের কেল্লা তৈরি করে জীবন উৎসর্গ করেছিল তিতুমীর, যে স্বপ্ন নিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন সিরাজউদ্দৌলা, বহু কাঙ্ক্ষিত সেই ঘোষণা, সেই স্বপ্নের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি ধারণ করে ১৯৭১-এর ৭ মার্চ রমনার পড়ন্ত বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চারণ করেছিলেন স্বাধীনতার কথা।

১৯৭১-এর ১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি স্বাধীনতার দাবিতে যে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন-তারই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে আসে ১৯৭১-এর ৭ মার্চ ১০ লাখ মানুষের জনসমুদ্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনানুষ্ঠানিক ও পূর্ব ঘোষণা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ স্থান পেয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহান নেতা আব্রাহাম লিঙকনের দুনিয়া কাঁপানো গেটিস বার্গ অ্যাড্রেস, মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ এবং এডমন্ট বার্গের বিশ্বখ্যাত ভাষণের কাতারে।

মুজিব একটি নাম-মুজিব একটি ইতিহাস

১৯৭১-এর ৭ মার্চ। দিনটি ছিল রোববার। সকাল থেকেই ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দান অভিমুখে এগিয়ে আসতে থাকে একের পর এক মিছিল। কারো হাতে বাঁশের লাঠি, কারো হাতে নৌকার বৈঠা, কারো হাতে লাঙ্গল ও জোয়াল এবং কারো মাথায় মাথাল। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসে, লঞ্চে, ট্রেন, ইস্টিমার, নৌকা এবং এমন কি পায়ে হেঁটেও লাখো মানুষের ঢল নামে রেসকোর্স মাঠের দিকে। তাদের চোখে মুখে স্বাধীনতার উত্তাল আকাঙ্ক্ষা এবং স্লোগান মাত্র দু-একটা-‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ‘তোমার দেশ/ আমার দেশ/ বাংলাদেশ. বাংলাদেশ’ ‘তোমার নেতা-আমার নেতা-শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’এবং গগণ বিদারী কণ্ঠে‘জয় বাংলা’।

৭ মার্চ সকাল থেকেই রেসকোর্সে মানুষের ঢলের মধ্যে ‘মুজিব একটি নাম-মুজিব একটি ইতিহাস’ নামের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকা বিক্রি হতে থাকে হকারদের হাতে হাতে। পত্রিকাটিতে বড় বড় হেডিংয়ে লেখা ছিল-রেসকোর্সের জনসভায় আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী ঘোষণা করবেন? বেলা ২টার আগেই রেসকোর্স ময়দান কানায় কানায় ভরে গিয়ে জনসমুদ্র ময়দান ছাড়িয়ে আশেপাশে বিস্তৃত হয়ে পরে।

ফেসবুক থেকে মতামত দিন
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com